তিতাস, হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডে সাতটি কূপের ওয়ার্কওভার কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। চলতি বছরে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির (বিজিএফসিএল) এ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। গত মে মাসে ওয়ার্কওভার অপারেশন পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে জনবল ও রিগ প্রস্তুত করতে শুরু করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। কিন্তু বিদেশি পরামর্শকের অভাবে কাজ শুরু করা যায়নি। কারণ মালয়েশিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কভিড-১৯ মহামারীর কারণে পরামর্শক পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করে। এ অবস্থায় দেশীয় পরামর্শক দিয়ে কাজ শুরু করতে চায় বাপেক্স। এজন্য প্রকল্পও সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় না বাড়লেও প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিজিএফসিএল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কূপ খননের ওয়ার্কওভার কার্যক্রম আবারও শুরুর জন্য তৃতীয় পক্ষীয় প্রকৌশল ঠিকাদারের জনবল ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক মোবিলাইজ করার নোটিস দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পের পরামর্শ সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ার এডব্লিউটি ইন্টারন্যাশনাল (এশিয়া) বাংলাদেশে কভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরামর্শক পাঠাতে অস্বীকৃতি চিঠিতে বিজিএফসিএলকে জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) ৭ জুলাইয়ের সভায় প্রকল্পের অবশিষ্ট দুটি কূপের (তিতাস-৭ ও তিতাস-১৩) ওয়ার্কওভার কাজে স্থানীয় পরামর্শক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। সভায় বিজিএফসিএল জানায়, স্থানীয় পরামর্শক দিয়েই প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করা হবে। কিন্তু করোনার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরামর্শকসহ বিভিন্ন অঙ্গে (কম্পোনেন্ট) ব্যয় সমন্বয় ও বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবে আপত্তি তুলে তা নাকচ করে দেয়। তবে মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানোর পক্ষে মত দেয়।
তারা আরও জানান, প্রকল্পটি ৩৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার লক্ষ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরে প্রকল্পটির আন্তঃঅঙ্গ ব্যয় সমন্বয় প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। সর্বশেষ প্রকল্পের সংশোধনী এনে ব্যয় কমিয়ে ৩৪৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা করা হয়। ২০২০ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য লক্ষ্য ধরা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে তিতাস ফিল্ডের চারটি কূপ, নরসিংদী ফিল্ডের একটি কূপ থেকে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস উৎপাদন, হবিগঞ্জ ১নং কূপ ও বাখরাবাদ ১নং কূপকে পুনঃউৎপাদনে আনয়ন, ওয়ার্কওভার পরবর্তী ৫টি কূপ থেকে বিদ্যমান উৎপাদন হার (দৈনিক ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট) বজায় রাখা ছাড়াও অতিরিক্ত আরও দৈনিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন এবং সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা দুটি কূপ থেকে দৈনিক ১০-১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রকল্পটি হতে নেওয়া হয়।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সমস্যা সমাধানে দিকনির্দেশনা গ্রহণের জন্য সভা আহ্বান করা হয়। ওই সভায় বিজিএফসিএলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাতটি কূপের ওয়ার্কওভারের লক্ষ্যে বিজিএফসিএল ও বাপেক্সের মধ্যে ২০১৯ সালের মে মাসে চুক্তি হয়। ইতিমধ্যে হবিগঞ্জ-১, বাখরাবাদ-১, তিতাস-৬, নরসিংদী-১ এবং তিতাস-৯ নং কূপের ওয়ার্কওভার কার্যক্রম শেষে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তিতাস-১৩ কূপের ওয়ার্কওভার কার্যক্রম বাপেক্সের রিগ দ্বারা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়। তবে ওয়ার্কওভারের নামে কূপটিকে অকার্যকর (কিল) করা হয়। কূপটির ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চলাকালে কেজিং ডিফর্ম (প্রক্রিয়া) হওয়ায় ড্রিল বিটসহ ড্রিল পাইপ কূপের অভ্যন্তরে আটকে যায়। এটি উদ্ধারে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। পরে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে বিজিএফসিএল ও বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বৈদেশিক পরামর্শকের সমন্বয়ে একটি কারিগরি সভা হয়। সভায় কূপটির ওয়ার্কওভার আপাতত স্থগিত রেখে তিতাস-৯ ও তিতাস-৭ কূপের ওয়ার্কওভার কাজ সম্পন্নের সিদ্ধান্ত হয়। ওই দুটি কূপের ওয়ার্কওভার সম্পাদনের পর শিগগিরই বিজয়-১১ রিগ দ্বারা তিতাস-১৩ কূপ ওয়ার্কওভার করার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী তিতাস-৯নং কূপের ওয়ার্কওভারের কাজ শেষ করা হয়। বিদেশি পরামর্শক না আসায় স্থানীয় পরামর্শকের মাধ্যমে ওয়ার্কওভার কাজ শেষ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গত সেপ্টেম্বর থেকে আবারও তিতাস কূপের ওয়ার্কওভার শুরু করা হয় এবং বর্তমানে তা চলমান।
সভায় পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রকল্পটিতে বৈদেশিক পরামর্শকের পরিবর্তে স্থানীয় পরামর্শক নিয়োগ করায় পরামর্শকের কর্মপরিধি পরিবর্তিত হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পটি সংশোধন করা প্রয়োজন হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিজিএফসিএল জানায়, স্থানীয় পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি কোম্পানির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করা হচ্ছে এবং এ অর্থ প্রকল্প দলিলে প্রদর্শন করা হবে না।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যার কথা জানতে চাইলে সভায় জানানো হয়, বর্তমানে তিতাস-৭ নং কূপের ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চলমান। কূপটিতে সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে ওয়ার্কওভার করা হয়। যেসব টিউবিং উত্তোলিত হয়েছে তা অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত। ফলে টিউবিং উত্তোলনকালে যখন পূর্ণ লোড অ্যাপ্লাই করা হয় তখন পাইপগুলোর বডি ওই লোড বেয়াব (ধারণে অক্ষম) করতে না পারার কারণে টিউবিংগুলো বারবার ছিঁড়ে যাচ্ছে। এ কারণে ওই প্রোডাকশন টিউবিং উত্তোলনে অনেক সময় ব্যয় হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে পকিল্পনা কমিশনের শিল্প শক্তি বিভাগের সদস্য মো. মামুন আল রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে। কারণ নতুন করে প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধি বা সংশোধনসংক্রান্ত প্রস্তাব ভবিষ্যতে আর বিবেচনা করা হবে না। প্রকল্পটির মেয়াদ ৬ মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যয় বাড়ানো হয়নি।’
