দাবি মেনে আন্দোলন নিষ্ক্রিয় করছে সরকার

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৪৫ এএম

দেশে অস্থিরতা চায় না বলেই কোনো আন্দোলনকে বড় হতে দিতে চায় না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলটির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হচ্ছে। তাই দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে দিতে চায় না সরকার। কোনো চাপও নিতে চায় না তারা। সেজন্য ২০১৪ সালের পর থেকে দেশে যে কটি অরাজনৈতিক আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে তার বেশিরভাগ দাবিই মেনে নেওয়া হয়েছে। দুয়েকটি দাবির ন্যায্যতা নিয়ে সরকারকে সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল সেই সমালোচনাকে আমলে নেয়নি।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জনমতকে গুরুত্ব দিই বলেই দাবিগুলো মেনে নিই।’ তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক সংকট চলছে দেশে। ফলে এখন আর রাজনৈতিকভাবে কোনো সংকটই মোকাবিলা করা হয় না। ফলে সংঘবদ্ধভাবে কেউ রাজপথে নামলে তা মেনে নেওয়ার একটি প্রবণতা সরকারের ভেতরে তৈরি হয়েছে। সেখানে দাবির ন্যায্যতা বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে কোটা সংস্কার ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনেও আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। আর এ নিয়ে প্রাচীন ও দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তারা বলছেন, যৌক্তিক-অযৌক্তিক অনেক দাবিই সরকার সহজে মেনে নিচ্ছে। কোনো আন্দোলনই রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কোনো কৌশল গ্রহণ করছে না আওয়ামী লীগ। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বাসচাপায় ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় সারা দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। পরে শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবি তুলে ধরলে ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয়। এতে মোটরযান দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষ হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড এবং বেপরোয়াভাবে চালিয়ে হত্যা করলে ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে একই বছর ১৯ সেপ্টেম্বর আইনটি সংসদে পাস করা হয়।

‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে পুরোপুরি কোটা প্রথা তুলে দিয়ে সরকার সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে। সর্বশেষ ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর আইনে সংশোধনী এনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে সমালোচনাকে আমলে নেয়নি সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতারা। বরং মাঠেঘাটে সভা-সমাবেশে সরকারের মন্ত্রী ও দলীয় নেতারা বলছেন, জনমত ও গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জনমতের বাইরে নই। জনগণ থেকে কোনো দাবি উঠলে তাই সহজে মেনে নেওয়া হয়।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অরাজনৈতিক আন্দোলন হোক আর রাজনৈতিক আন্দোলনই হোক তা বেশিদূর যেতে দিতে চায় না। এটাই সরকারের কৌশল। হিতে-বিপরীত হতে পারে এ আশঙ্কায় আপাতত রাজনৈতিক কৌশলও গ্রহণ করা হয় না। ওইসব কেন্দ্রীয় নেতা আরও বলেন, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকারীরা বসে নেই, তারা সুযোগ পেলেই দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায়। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তাদের সুযোগ দেবে না বলেই আন্দোলনকারীদের দাবি দ্রুত মেনে নেওয়া হয়।

ক্ষমতাসীন দলের ওইসব নেতা আরও বলেন, দেশে কোনো আন্দোলন হলেই সরকারবিরোধী দেশি-বিদেশি একটি অংশ সরকার পতনের স্বপ্ন দেখে। আর শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়ে চাপমুক্ত থাকেন। এটা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত। তবে বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করায় ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক দুর্বলতা বলে দাবি করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইতিহাসের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। একটি কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় আওয়ামী লীগেরও ক্ষতি হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক-সামাজিক সংকটগুলো রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হয় না। তিনি আরও বলেন, এর জন্য রাজনৈতিক পরিশোধন দরকার। তাহলে সংকটগুলো রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা যাবে। শূন্যতার কারণেই একটু কিছুতেই সরকার চাপ মনে করে। তাই রাজপথে কিছু গড়ালেই তড়িগড়ি করা হয়।

ঢাবির সাহিত্যের প্রবীণ অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, এ দাবিগুলো মেনে নেওয়ার মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। সত্যিকার অর্থে, আন্তরিকভাবে কাজ করে। শুধু মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য মেনে নেওয়া না হয়। তিনি বলেন, অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেন হয় না?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার সেফ সাইডে থাকতে চায়। হয়তো তাই এসব বিষয়গুলো বেশি দূর যেতে দিতে চায় না।’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব আন্দোলন ইতিমধ্যে হয়েছে একেকটি আন্দোলন একেক রকমভাবে মূল্যায়ন করি। নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলন একরকম। কোটাবিরোধী আন্দোলন আরেক রকম। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন আরেক রকম। প্রত্যেকটা আন্দোলনকে একভাবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি আরও বলেন, কিছু আন্দোলন ত্বরিত সিদ্ধান্ত দাবি করে। এর ভালো-মন্দ দেখার সুযোগ থাকে না। এসব ক্ষেত্রে এমনটাই হতে পারে। একটা যুগের একেক রকম হাওয়া থাকে। বৈশ্বিক প্রবণতা দেখা যায় এ ধরনের আন্দোলন দানা বেঁধে বিস্ফোরণ ঘটে। এ ধরনের হিসাবও থাকতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত