পুলিশে বিভাগীয় পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনে ক্ষোভ

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২০, ০১:২৯ এএম

পুলিশে বিভাগীয় পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে পিএলভুক্ত (ফিট লিস্ট) পরিদর্শকদের (নিরস্ত্র) বাদ রেখে ২০১৬ সালে পিএলভুক্ত সশস্ত্র পরিদর্শক, শহর ও যানবাহন পরিদর্শকদের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে পদোন্নতি দেওয়ায় বঞ্চিত অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা এটিকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা নিয়মের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, কোটায় ২০১৬ সালের পিএলভুক্তদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে অন্যদেরও পদোন্নতি হবে। তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতা দাবি করছেন, কোটা চালু হয়েছে ২০১৫ সালে। সে ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের আগে পিএলভুক্তদের পদোন্নতি শেষ হওয়ার পরই ২০১৬ সাল কিংবা পরের পদোন্নতিতে কোটা কার্যকর হবে। কিন্তু এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিএম ফরমান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদোন্নতি নিয়ে কারও কারও মধ্যে ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে কাউকে পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়নি বরং কোটায় সশস্ত্র পরিদর্শক, শহর ও যানবাহন পরিদর্শকদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।’

রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় কর্মরত এক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১২ সালে পিএলভুক্ত হওয়ার আট বছরেও তিনি পদোন্নতি পাননি। অথচ ২০১৬ সালে পিএলভুক্ত সশস্ত্র পরিদর্শকরা পদোন্নতি পেয়েছেন। সশস্ত্র পরিদর্শকরা কনস্টেবল হিসেবে পুলিশে আসার পর ছয়টি পদোন্নতি পাচ্ছেন। তারা কনস্টেবল থেকে নায়েক, নায়েক থেকে হাবিলদার, হাবিলদার থেকে এএসআইএবি, আর্মড এসআই, পরিদর্শক (সশস্ত্র) ও এএসপি হয়েছেন। সশস্ত্র পরিদর্শকরা সাধারণত পুলিশ ট্রেনিং কলেজে প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকেন, মামলা তদন্ত করতে হয় না। কিন্তু একই সময় কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক হওয়া নিরস্ত্র পরিদর্শকরা বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে, প্রত্যেক পরীক্ষায় ৬০ শতাংশ বা তারও বেশি নম্বর পেয়ে মাত্র তিনবার পদোন্নতি পাচ্ছেন। তারা কনস্টেবল থেকে এএসআই, এএসআই থেকে এসআই ও এসআই থেকে পরিদর্শক হতে পারছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক পরিদর্শক জানান, পুলিশ বাহিনীতে সবচেয়ে পদোন্নতিবঞ্চিত উপপরিদর্শক (এসআই) পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তরা। অথচ তারাই মামলা তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তারসহ পুলিশের মূল ফোর্স হিসেবে কাজ করেন। বঞ্চনা এতই প্রকট যে, অনেক এসআই তার ২০-২৫ বছরের চাকরিজীবন শেষ করেন মাত্র একবার পদোন্নতিতে পরিদর্শক হয়ে। পুলিশের পলিসি গ্রুপসহ বিভিন্ন মহলে দেন-দরবার করে, দীর্ঘদিনেও এসআইরা কোনো সুরাহা পাননি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সালে পুলিশ পলিসি গ্রুপের মাধ্যমে এসপি পদের পদায়নে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য ৩৩ শতাংশ (সশস্ত্র ১৭ ও সার্জেন্ট ১৩ শতাংশ) নির্ধারণ করা হয়। বাকি ৭০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয় নিরস্ত্র পরিদর্শকদের জন্য। নিরস্ত্রদের ক্ষেত্রে কনস্টেবল থেকে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ছয় বছর চাকরির পর পরীক্ষা দিয়ে এএসআই; এএসআই পদে চার বছর চাকরির পর এসআই এবং এসআই হওয়ার পর সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এসআইদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ সমন্বয় করে ৬০০ নম্বরের পরীক্ষা দিয়ে ৬০ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণের পর তারা পরিদর্শক হতে পারেন।

একাধিক পরিদর্শক জানান, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এসআইরা এক বছরের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে জেলায় দুই বছর প্রবেশনারি হিসেবে কাজ করার পর স্থায়ী হন। স্থায়ী হয়ে এসআই পদে চার বছর কাজ করার পর ৬০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৬০ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। পরিদর্শক পদোন্নতি পাওয়ার পর তিন বছর সন্তোষজনকভাবে চাকরি করার পর প্রভিশনাল ডিক্লিয়ার হয়। সেখান থেকে এএসপি হওয়ার জন্য পিএলের তালিকাভুক্ত হতে হয়। পুলিশ সদর দপ্তর প্রতি জোড় সালে একবার পিএল তালিকা করে এবং পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে এসএএসপি পদোন্নতি দেওয়া হয়।

এক পরিদর্শক বলেন, ‘বিসিএস পুলিশে এক বছরের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ছয় মাস বাস্তব প্রশিক্ষণের পর পাঁচ বছরের মধ্যে এসএএসপি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদোন্নতি পান। চাকরির ১০ বছরের মধ্যে পুলিশ সুপার পদোন্নতি পান। অথচ এসআইরা ২০ বছরেও এএসপি পদোন্নতি পান না। এ ধরনের বঞ্চনার কারণে বাহিনীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে।’

বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ‘সরাসরি এসআই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ও ২০১২ সালে পিএলভুক্ত সিনিয়র পরিদর্শকদের পদোন্নতি না দিয়ে ২০১৬ সালের জুনিয়র সশস্ত্র, শহর এবং যানবাহন পরিদর্শকদের পদোন্নতির ঘটনা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডে ব্যাঘাত ঘটেছে। যথাসময়ে পদোন্নতি না পেয়ে অনেকে হতাশ।’

পুলিশের নিম্ন পদ থেকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ সদর দপ্তর যেসব নতুন পদ্ধতি চালু করেছে, সেখানে পরিদর্শক নিরস্ত্রদের পদোন্নতি আরও বিলম্ব হবে বলে আশঙ্কা অনেকের। বিষয়টি নিয়ে সময়ক্ষেপণ ও নানা টালবাহানায় জুনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যেও ক্ষোভ এবং হতাশা দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের এক আদেশে এএসপি পদের সংখ্যা থেকে ২৫৩টি এসএএসপি পদ বিলুপ্ত করে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বিভাগীয় কোটায় ৮৪টি এসএএসপি পদ কমিয়ে দেওয়া হয়। ওই ২৫৩টি এসএএসপি পদের মঞ্জুরি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে স্থানান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে এসএএসপি পদে পরিদর্শক পদোন্নতির সুযোগ রহিত করা হয়। এসএএসপি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি এবং অবসরের কারণে সৃষ্ট শূন্য পদের ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কোটায় মনগড়া নিয়ম চালু করা হয়। এর ফলে মোট ৬ হাজার ৮৬৯ পরিদর্শকের পদোন্নতির হার মাত্র ৬ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে আসে।

পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানান, বিভাগীয় পুলিশে পদোন্নতি জটিলতা নিরসনে জেলা পুলিশে কোর্ট এএসপি পদ সৃষ্টি করে পরিদর্শকদের (নিরস্ত্র) পদোন্নতির মাধ্যমে পদায়ন করা যেতে পারে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) এএসপি পদের মঞ্জুরি নেই। গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত এবং দক্ষ ও নিপুণ তদন্তের স্বার্থে পিবিআইতে এসএএসপি পদ সৃষ্টি করে বিভাগীয় এসএএসপিদের পদায়ন করা যেতে পারে। জেলাপর্যায়ে টিআই পদ থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে এসএএসপি (ট্রাফিক) পদে পদায়নের মাধ্যমেও জটিলতা দূর করা যেতে পারে বলে জানান তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত