প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে বিকাশ প্রতারক চক্র

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২০, ০২:১০ এএম

বিকাশ অ্যাকাউন্টে লেনদেন করতে গিয়ে প্রায়ই গ্রাহকরা প্রতারিত হচ্ছেন। প্রতারক চক্র প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চার গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নিখুঁতভাবে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরিয়ে নিচ্ছে; বিশেষ করে চক্রটি ‘কিং বার্ড’ অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশের হেল্পলাইন নম্বর ১৬২৪৭ থেকে ফোন করে গ্রাহককে বোকা বানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচ্ছে। সেই তথ্য দিয়ে আইফোনের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ক্লোন এবং অনেক ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট সচল করে দেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। চক্রটি নিজেদের পরিচয় গোপনে ব্যবহার করছে ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক)।

এই সার্বিক প্রক্রিয়ায় বিকাশের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম এমন প্রতারণার শিকার কতিপয় গ্রাহকের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এমন তথ্য পেয়েছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার এমনই এক প্রতারক চক্রের হোতাসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতারক চক্র চার গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ করে। প্রথম গ্রুপ গোপনে বিকাশ এজেন্টদের থেকে লেনদেনকারী ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করে। পরে বিকাশ এজেন্ট পরিচয়ে গ্রাহকের নম্বরে ফোন দিয়ে কৌশলে টাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয়। এরপর কিং বার্ড অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশের হেল্পলাইন নম্বর ক্লোন করে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ফোন করে বোকা বানিয়ে তার তথ্য নিয়ে নেয়। পরে আইফোনের মাধ্যমে বিকাশ অ্যাপস ব্যবহার করে ওই গ্রাহকের আইডি ক্লোন করে। সেই আইডি থেকে টাকা দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। টাকা সরাতে চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে ভিপিএন প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ফলে তাদের প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অ্যানড্রয়েড ফোনে বিকাশ অ্যাপসের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে ওই ফোনেই সংশ্লিষ্ট সিমটি সক্রিয় থাকতে হয়। ভেরিফিকেশন কোড অটো সিলেক্ট হয়। কিন্তু আইফোনে ওই সিম না থাকলেও অ্যাকাউন্ট খোলা যায় এবং ভেরিফিকেশন কোড টাইপ করার সুযোগ থাকে। চক্রটি বিকাশের এই প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে কৌশলে তথ্য নিয়ে অ্যাকাউন্ট ক্লোন করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকাশ প্রতারক চক্রের প্রথম গ্রুপ মাঠপর্যায়ে অবস্থান করে বিভিন্ন বিকাশের দোকানে টাকা বিকাশ করার কথা বলে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে আগে লেনদেনকৃত বিকাশ খাতার ছবি তুলে নেয় তারা। পরবর্তী সময়ে ওই ছবি হোয়াটসঅ্যাপে দ্বিতীয় গ্রুপের কাছে স্থান উল্লেখ করে পাঠিয়ে দেয়। দ্বিতীয় গ্রুপ তার কাছে পাঠানো বিকাশ খাতা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন নম্বরে বিকাশ দোকানদার সেজে কল করে এবং জানতে চায় যে তাদের কাছে পাঠানো টাকা তারা পেয়েছেন কি না এবং ক্যাশ আউট করেছেন কি না। যদি বলে পেয়েছেন কিন্তু টাকা তোলেননি বা ক্যাশ আউট করেননি তখন প্রতারকরা তাদের প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার শুরু করে। প্রতারণার ছলে বলতে থাকে, আমার দোকান থেকে একই সময়ে কয়েকটি নম্বরে পাঠানো টাকা নিয়ে অভিযোগ আসায় তাদের নম্বর লক করতে গিয়ে আপনার নম্বরও লক হয়ে গেছে। আপনাকে বিকাশ অফিস থেকে ফোন করে আনলক করে দেবে। এর অল্প সময়ের ব্যবধানে তৃতীয় গ্রুপ বিকাশ কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস অফিসার পরিচয় দিয়ে, অনলাইনভিত্তিক কিং বার্ড অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশ অফিসের নম্বর ক্লোনিং করে ফোন দেয়। ফোন করে বিভিন্ন কথার ছলে ওটিপি ও বিকাশ পিনকোড নিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে গ্রাহকের বিকাশ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে প্রতারক চক্র অ্যাকাউন্ট আনলক করার কথা বলে ভুক্তভোগীর বিকাশ অ্যাকাউন্ট ও প্রতারক চক্রের বিকাশ অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা দিতে বলে। এভাবে হাতিয়ে নেওয়া টাকা মাঠপর্যায়ে থাকা সর্বশেষ অর্থাৎ চতুর্থ গ্রুপের কাছে পাঠানো হয়। যারা বিভিন্ন হাত বদল করে ক্যাশ আউট করে, ফলে প্রতারকদের অবস্থান শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিকাশ প্রতারণার শিকার হয়ে গত ১০ মার্চ অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম রাজধানীর রামপুরা থানায় মামলা করেন। তিনি মায়ের চিকিৎসার জন্য ৫২ হাজার টাকা বিকাশ অ্যাকাউন্টে রাখেন। একটি চক্র তাকে ফাঁদে ফেলে সেই টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে বিকাশ অ্যাকাউন্ট সচল করার কথা বলে তার থেকে আরও ৩৯ হাজার টাকা নেয়।

আবদুল হাকিমের মামলার তদন্তভার পায় ডিবি। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম বিশেষ অভিযান চালিয়ে ঢাকা ও গাজীপুর জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন মডেলের পাঁচটি মোবাইল ফোন, ১০টি সিমকার্ড ও একটি ল্যাপটপ জব্দ করে।

এ ধরনের প্রতারণা রুখতে বিকাশ কর্র্তৃপক্ষ নিজেদের ওয়েবসাইটে বলেছে, কোনোভাবেই প্রতারিত হবেন না। ভুলে টাকা চলে গেছে বলে প্রতারক আপনাকে টাকা পাঠাতে বলতে পারে কিংবা বিকাশ কর্মকর্তা সেজে অ্যাকাউন্ট সচল ও তথ্য হালনাগাদের কথা বলতে পারে। এসব কথায় কান দেবেন না। বিকাশ কখনো অ্যাকাউন্টের পিন, ভেরিফিকেশন কোড বা অন্যান্য তথ্য জানতে চায় না। এ ছাড়া আপনি লোভ, ভয় অথবা ভুল বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মোবাইলে অপরিচিত কাউকে নিজের টাকা বিকাশ করবেন না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত