সিভিল সার্জনের অনিয়ম

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩০ পিএম

জেলা পর্যায়ে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশাসনিক প্রধান জেলা সিভিল সার্জন। জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক হিসেবে এই পদের দায়দায়িত্ব ও এখতিয়ারও অনেক। জেলার স্বাস্থ্যসেবার মান ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে মুখ্য ভূমিকা থাকার কথা সিভিল সার্জনের। দুঃখজনক ঘটনা হলো এ ধরনের কাজে উদ্যমী হওয়া কিংবা কোনো সাফল্যের জন্য দেশের সিভিল সার্জনরা সংবাদ শিরোনাম কমই হন। অথচ বিভিন্ন জেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের নানা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে প্রায়ই সংবাদ শিরোনামে আসে সিভিল সার্জনদের নাম। কিন্তু দুর্নীতি যত বড়ই হোক বা অনিয়মের অভিযোগ যতই সংবাদ মাধ্যমে আসুক সিভিল সার্জনদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত বিরল ব্যতিক্রম বটে। সম্ভবত এ কারণেই কোনো কোনো সিভিল সার্জনের ক্ষমতার দাপট লাগাতার বাড়তেই থাকে আর তাদের অনৈতিক কর্মকা-েরও রাশ টানা যায় না। সম্প্রতি খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের কোনো সুরাহা না হওয়ায় এমনটাই প্রতীয়মান হচ্ছে। 

সুজাত আহমেদ খুলনার সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদান করেন গত বছর ২৪ ডিসেম্বর। এর আগে তিনি কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ছিলেন। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে চলতি বছরের ২ জুলাই ‘সরকারি সুবিধা নিয়ে সিভিল সার্জনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি উল্লেখ করা হয়, কয়রার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা থাকাকালেই তিনি নিজের সরকারি বাসস্থানের একটি কক্ষে নিজস্ব চেম্বার গড়ে তুলে নিয়মিত প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে আসছিলেন। সিভিল সার্জন হওয়ার পরও যার একটুও হেরফের হয়নি। এমনকি করোনা পরিস্থিতিতেও কয়রার চেম্বারে সপ্তাহে তিন দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টাকা নিয়ে রোগী দেখেছেন তিনি। পাশাপাশি পাইকগাছার শাপলা ক্লিনিক ও কয়রার সুন্দরবন ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারও করেন তিনি। সিজারিয়ান ডেলিভারির জন্য ৫-৭ হাজার এবং অন্যান্য অস্ত্রোপচারের জন্য ৪-৫ হাজার টাকা করে নেন। কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর কারণে শাপলা ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হলেও সুজাত আহমেদ সিভিল সার্জন হওয়ার পর সেটি আবার চালু করেন। সুজাত আহমেদ অবচেতনবিদ ছাড়াই নিজ চেম্বারে অস্ত্রোপচারের পর সেই রোগীদের থাকতে দেন কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যায়। অনেক সময় আবার নিজের ব্যক্তিগত রোগীদের জন্য ব্যবহার করেন হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ। ওই রোগীদের ওষুধও দেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে। তবে এজন্য কোনো টাকা জমা হয় না হাসপাতালের তহবিলে। আয়ের পুরো অংশই যায় তার পকেটে। গত এক মাসে তার কাছে অস্ত্রোপচারের পর ২ রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে এসব অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘বদলির নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি খুলনার সিভিল সার্জনের!’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদসহ দেশের ৮ জেলার সিভিল সার্জনকে গত ২৪ আগস্ট একযোগে অন্য জেলায় বদলি করা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি করা সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে ৮ম কর্মদিবস থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবে। কিন্তু বদলি আদেশের প্রায় দুই মাস পার হতে চললেও যেমন সুজাত আহমেদ কর্মস্থল ত্যাগ করেননি, তেমনি তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি মন্ত্রণালয়। তবে সুজাত আহমেদের দাবি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য সচিবের মৌখিক নির্দেশে তিনি খুলনায় দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন। প্রশ্ন হলো এতসব অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও খুলনার সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?

এটা মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশ মারাত্মক পর্যায়ে চিকিৎসক ঘাটতির দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য ১ জন চিকিৎসক থাকতে হয়। সেখানে বাংলাদেশে প্রতি ৩ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র ১ জন। এই হিসাবে দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে চিকিৎসক ঘাটতি প্রায় ৭০ শতাংশ। আবার চিকিৎসকদের বেশিরভাগই শহরাঞ্চলে কর্মরত থাকায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতিতে অপ্রতুল জনবল ও সামর্থ্য নিয়ে জেলার স্বাস্থ্যসেবার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা সিভিল সার্জনদের। কিন্তু তারা নিজেরাই যদি অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন তাহলে দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে কীভাবে? 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত