নানা কারণে অর্থনীতির সার্বিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো খাত পুনরুদ্ধার হচ্ছে, কোনো কোনো খাতে হচ্ছে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, অসাম্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে করোনার প্রভাবগুলোর জন্য সমান্তরাল পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। অন্যদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। এক্ষেত্রে এখনই সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। যেন করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কম হয়।
গতকাল শনিবার সানেম নেটিজেন ফোরামের নবম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের পরিচালনায় আলোচনায় জুমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থীসহ প্রায় ৫০ জন ব্যক্তি এই পর্বে অংশ নেন। এ ছাড়া সানেম টিমে ছিলেন সানেমের গবেষণা পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা এবং সানেমের রিসার্চ ইকোনমিস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মাহতাব উদ্দিন।
পাথ টু ইকোনমিক রিকভারি বা ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথ’ শীর্ষক এই ভার্চুয়াল আলোচনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কভিড-১৯ মহামারী বর্তমানে কতটুকু প্রভাব ফেলছে, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কি-না বা দাঁড়ালেও নিকট ভবিষ্যতে এই অর্থনীতির স্বরূপ কী দাঁড়াবে, ভারত ও বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপির পার্থক্য, কৃষি খাতে বিদ্যমান প্রবণতা ইত্যাদি আলোচিত হয়।
অনুষ্ঠানে ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, উৎপাদনশীল কাজের কারণে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু তা কীভাবে হচ্ছে? তা কি অন্তর্ভুক্তিমূলক? প্রবৃদ্ধির গুণগত মান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পাচ্ছে কি না তা নিয়ে আলোচনা হতে হবে। মানুষের কর্মসংস্থান, আয়, দারিদ্র্য, অসাম্য এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধির দিকে লক্ষ না রেখে অন্তর্ভুক্তির দিকে বেশি লক্ষ রাখতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে। প্রবৃদ্ধি ছাড়াও অন্যান্য সূচক, যা দেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরে, সেগুলো বিবেচনায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রবাসী আয় এবং পোশাকশিল্প। এই দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত ভালো অবস্থানে আছে। আইএমএফের প্রাক্কলন রয়েছে যে ভারতের তুলনার বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বেশি হবে। ভারতের অর্থনৈতিক আকার, জনসংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে সার্বিক চিত্রটি দেখতে হবে, শুধু একটি-দুটি সংখ্যা তুলনা করলে হবে না।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে আরও আলোচনা করতে গিয়ে ড. বিদিশা বলেন, বৈশ্বিকভাবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউটি আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। সরকারের সহায়তা তৃণমূল পর্যায়ে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে, তা নিশ্চিত করবে প্রণোদনা প্যাকেজের সঠিক বাস্তবায়ন, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনানুষ্ঠানিক খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে, করোনা সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এজন্য প্রস্তুতি নিতে হবে যেন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে আর প্রভাবিত করতে না পারে। এ ছাড়া আমাদের রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ, সেটিও মোকাবিলা করতে হবে।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, কোনো কোনো খাত পুনরুদ্ধার হচ্ছে, কোনো কোনো খাতে হচ্ছে না; অর্থাৎ সার্বিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি সামাজিক পুনরুদ্ধার সমান্তরালভাবে হচ্ছে কি-না সেটি খেয়াল রাখার ওপর জোর দেন তিনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, অসাম্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে করোনার প্রভাবগুলোর জন্য সমান্তরাল পুনরুদ্ধার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে প্রবাসী আয় ও পোশাক খাত এই দুটি প্রভাবশালী খাতের ধনাত্মক প্রভাবের কারণে। তবে এই প্রভাব অর্থনীতির অন্য খাতগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছে কি-না, সেটি দেখার সময় এসেছে।
মাহতাব উদ্দিন বলেন, নগদ প্রণোদনা কতটা কার্যকর হতে পারে এই মুহূর্তে, সেটিও একটি প্রশ্ন। নগদ প্রণোদনা ছাড়া অন্য বিকল্পগুলোও ভাবা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ঋণ গ্রহণের কার্যকরী চাহিদা কমে গেছে, তারল্য অনেক বেশি এখন। অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোকে আনুষ্ঠানিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে মাহতাব উদ্দিন বলেন, এ বিষয়ে কিছু মাত্রায় নীতিমালা শিথিল করা প্রয়োজন, যাতে করে অনানুষ্ঠানিক খাতগুলো আনুষ্ঠানিক খাতে অন্তর্ভুক্ত হতে উৎসাহ পায়। তবে এজন্য যথাযথ পরিকল্পনা প্রয়োজন, অপরিকল্পিত অন্তর্ভুক্তি কাম্য নয়।
