গুলশান-বনানীর ৩১ প্লটের খোঁজে দুদক

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০২:৩১ এএম

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ৩৯টি মূল্যবান প্লট বাগিয়ে নিতে মরিয়া শতাধিক প্রভাবশালী চক্র। গুলশান-বনানী এলাকায় থাকা এমন ৭-৮টি প্লট এরই মধ্যে হাতছাড়াও হয়েছে সংস্থাটির। রাজউকের নথিপত্রে প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের একেকটি প্লটের দাবিদার ৩ থেকে শুরু করে ৭ জন। আবার কেউ কেউ প্লট দখলে রেখে নতুন নতুন মালিক বানিয়ে এর বৈধতা পেতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এক প্লটের একাধিক মালিক হওয়ায় রাজউকের পক্ষ থেকে এসব প্লট ‘বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত করেও রক্ষা করা যাচ্ছে না। রাজউকের নথিতে বিতর্কিত ৩৯টি প্লটের মধ্যে সম্প্রতি ৩১টি চিহ্নিত করে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকেও একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রভাবশালীদের সঙ্গে আঁতাত করে শতকোটি টাকা মূল্যের প্লটের মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান, সদস্য (এস্টেট), পরিচালক (এস্টেট), সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক ফেঁসে যেতে পারেন।

জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদকের চিঠি পেয়ে ৩১টি প্লটের বিষয়ে বিস্তারিত খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছি। এ কমিটি ইতিমধ্যে কাজও শুরু করেছে। সেখানে সব বিষয় উঠে আসবে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজউকের এই ৩১টি প্লট নিয়ে দুদকের সচিব মুহাম্মদ দিলওয়ার বখত পূর্ত সচিবকে একটি চিঠি দেন। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব মো. হেমায়েত হোসেনকে আহ্বায়ক ও রাজউকের পরিচালক (এস্টেট) মোহাম্মদ নূরুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. জিল্লুর রহমান ও উপসচিব মো. মাহবুবুর রহমান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান মো. সাঈদ নূর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের মালিকানাধীন ৩১টি প্লট নিয়ে দুদকের নির্দেশনার পর মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন আছে তাই এর বেশি মন্তব্য করতে চাই না।’

কমিটির সদস্য সচিব ও রাজউকের পরিচালক (এস্টেট) মো. নূরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে একাধিক সভা করেছি। ফাইল টু ফাইল কাজ করা হচ্ছে। তদন্তে সব কিছু উঠে আসবে।’

রাজউক কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান-বনানীতে একটি প্লট যেন ‘সোনার হরিণ’। মূল্যবান এসব প্লট বাগিয়ে নিতে সব সময়ই স্বার্থান্বেষী মহল তৎপর। তারা ষাটের দশকে বরাদ্দ দেওয়া প্লটগুলোকে লক্ষ্য করে তা হাতিয়ে নিতে নানামুখী তৎপরতা চালায়। এসব প্লটের বেশির ভাগের মালিক পাকিস্তানের নাগরিক। ফলে এসব প্লট নানাভাবে বেদখল থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সেখানে কেউ বহুতল ভবন বা স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করতে সাহস দেখায় না। একপর্যায়ে গত ১০-১২ বছর আগে রাজউক এমন ৩৯টি প্লটকে বিতর্কিত তালিকাভুক্ত করে। যেগুলোর মালিক একাধিক ব্যক্তি। তবে বেশির ভাগ প্লটের দাবিদারই ভুয়া। এর মধ্যে দুদক ৩১টি প্লট নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে রাজউকের হাতছাড়া হওয়া প্লটগুলোও বের হয়ে আসবে।

যেসব প্লটের খোঁজে দুদক : গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার ৩১টি প্লটের খোঁজে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। এগুলো হলোÑ রোড ১৪ এসডব্লিউ (সি) ১৩; রোড ৩ এনই (এ) ১; রোড ৫০ এনডব্লিউকে ১১; রোড ৪৪ সিডব্লিউএন (বি); রোড ৪৯ এনডব্লিউই-২, রোড ২/১ এসডব্লিউএইচ; রোড ১ সিডব্লিউএন (এ); গুলশান অ্যাভিনিউ ১১৩ সিডব্লিউএন (বি); বনানী রোড ১৩ ব্লক ডি/৪৭, রোড ৫৩ এনডব্লিউ (আই) ৬, রোড ৭৯ সিডব্লিউএস (এ) ২৯; ১১ গুলশান অ্যাভিনিউ এসডব্লিউএ ২৯; রোড ১৬/২১ সিডব্লিউএস (সি) ৫; রোড ১১৬ সিইএস (৩)৪৭; রোড ৮৭ এনইএস ৪; রোড ৩ ব্লক আই (আই) ১৪; রোড ৪৭/৪৮ সিডব্লিউএনএ ১৮ এ/বি; রোড ৬ ব্লক সি (সি) ৯৪; রোড ১১ এসডব্লিউ (এ) ৩০; রোড ৪৯ সিডব্লিউএন ২; রোড ৭ ব্লক জি ৩১; রোড ৯ এনইবি ১; গুলশান অ্যাভিনিউ (ঘ) সিইএস (এফ) ২; রোড ১০৮ ১৮ সি ও ১৮ ডি; রোড ১০৯ সিইএন (এইচ) ৪; রোড ১৭/এ/১২ ব্লক ই-৩৮; রোড ৪৬/৫২ জিএনসি/এ ৪৫; রোড ৯৩/৯৬ সিএন (বি)-১৭; গুলশান অ্যাভিনিউ (ঘ) সিডব্লিউএন (সি) ৩; রোড ৪১ সিডব্লিউএন (এ) ৪৩ এবং রোড ৫৪ এনডব্লিউ (আই) ৩।

রাজউক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুলশান জিএস সি/এ ৪৫ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয় মো. নাঈমের নামে। বরাদ্দ দেওয়ার পর থেকেই প্রায় শতকোটি টাকার এ প্লটটি দখলে রেখেছেন তৃতীয় এক ব্যক্তি। গত ১০ বছর ধরে প্লটটি হাতিয়ে নিতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে কয়েকটি চক্র। মূল বরাদ্দ গ্রহীতা মো. নাঈমকে মৃত দেখিয়ে তার ওয়ারিশ দাবি করে আবদুল কাইয়ূম নামে একজন নামজারির আবেদন করেন। তার ওই আবেদন যখন রাজউক আমলে নিচ্ছিল তখন মো. নাঈমের আরেক ‘প্রকৃত’ ওয়ারিশ দাবিদার আবদুল কুইয়াম তার নামে নামজারির আবেদন করেন। এ নিয়ে কর্র্তৃপক্ষ যখন হিমশিম খাচ্ছিল তখন মূল বরাদ্দ গ্রহীতা মো. নাঈমই নিজেকে ‘জীবিত’ দাবি করে আরেকটি আবেদন করেন। এ নিয়ে রাজউক কর্র্তৃপক্ষ রীতিমতো বেকায়দায় পড়ে। একাধিক ঠিকানায় আবেদন করা এসব চক্রের পক্ষে প্রভাবশালী মহলের চাপ আছে বলেও জানা যায়।

তারা আরও জানিয়েছেন, গুলশান ৫৯ নম্বর রোডের লেকপাড়ে ২০ কাঠা আয়তনের এনডব্লিউ (ই)-২ নম্বর প্লটটির বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্লটটি বরাদ্দ দেয় হাফিজা বেগমকে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কয়েক বছর পর বরাদ্দপ্রাপ্ত হাফিজা বেগমের অস্তিত্ব নিয়ে সৃষ্টি হয় বিতর্ক। এর আগে একটি চক্র তাকে কখনো ‘মৃত’ আবার কখনো ‘জীবিত’ দাবি করে প্লটটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। হাফিজা বেগমকে মৃত দেখিয়ে ফজলুল হক মোড়ল নামে এক ব্যক্তি প্লটটি নিজের নামে নামজারি করিয়ে নেন। তার দাবি, হাফিজা বেগমের কাছ থেকে ১৯৬৯ সালে প্লটটি কিনেছেন তিনি। একই প্লটের বিপরীতে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আসিফ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি হাফিজা বেগমকে ‘মৃত’ দেখিয়ে নিজেকে তার ওয়ারিশ (নাতি) বলে দাবি করেন। তখন আরেকজন নিজেকে মূল বরাদ্দ গ্রহীতা ‘জীবিত’ হাফিজা বেগম দাবি করে অন্যদের জালিয়াত উল্লেখ করে রাজউকে আবেদন করেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এসব বিতর্কের মধ্যেও মহামূল্যবান এ প্লটটি বছর দুয়েক আগে প্রভাবশালী মহল কৌশলে নিজেদের কবজায় নিয়ে গেছে। বিতর্কিত এ প্লটটি নিয়েও তদন্ত চলছে।

রাজউকের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুলশানের এসডব্লিউসি বা প্লট নম্বর ১৩ বরাদ্দ দেওয়া হয় ফাতেমা জোহুরা নামে এক নারীকে। ১৬ কাঠা আয়তনের প্রায় ৮০ কোটি টাকা মূল্যের এ প্লটটির দাবিদার বর্তমানে তিনজন। বিভিন্ন সময়ে রাজউকে আবেদনকারী এ তিনজনই নিজেকে ‘প্রকৃত’ ফাতেমা জোহুরা বলে দাবি করেন। কিন্তু একাধিক ফাতেমা জোহুরা থাকায় এ প্লট নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারেনি রাজউক। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ প্লটটিও যেকোনো সময়ে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত