মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আত্মাহুতির হুমকি তাজরীনের আহত শ্রমিকদের

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২০, ০৩:৫০ এএম

ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার দাবিতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তাজরীন ফ্যাশন কারখানার অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর আহত ২৫ শ্রমিক জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি গতকাল রবিবার ৪৫ দিনে গড়িয়েছে। কর্মসূচি পালনরত অবস্থায় ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ৮ শ্রমিক। এ পরিস্থিতিতে গতকাল শ্রমিকরা সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থা তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শ্রমিকরা শ্রম আইন সংশোধন করে বাস্তবতা অনুসারে ক্ষতিপূরণ, সম্মানজনক ও আত্মাহুতির হুমকি তাজরীনের আহত শ্রমিকদের

বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সুচিকিৎসার ৩ দফা দাবি তুলে ধরে আগামী ২৪ নভেম্বরের মধ্যে সরকারকে এগুলো মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন, কর্মসূচির প্রথম সপ্তাহেই শ্রম মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএতে স্মারকলিপি দিলেও এখনো শুধু আশ্বাস ছাড়া কিছু পাননি তারা। এমনকি সরকার ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে কিছু আদৌ ভাবছে কি-না তাও জানেন না শ্রমিকরা। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাবেন তারা।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি দল গত ১৯ অক্টোবর কর্মসূচিতে থাকা শ্রমিকদের দাবির ন্যায্যতা বিষয়ে তদন্ত করে। এরপর গত ২৯ অক্টোবর তারা তদন্ত প্রতিবেদন পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেদনে শ্রমিকদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দিতে ইতিবাচক সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, অবস্থানরত শ্রমিকরা একেবারেই টাকা পাননি তা নয়। তবে সেই টাকা অনুদান হিসেবে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার তরফ থেকে পেয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের আট বছর পরেও এই ২৫ শ্রমিক কেন শ্রম আইন অনুসারে ক্ষতিপূরণ পেলেন না তা ভাববার বিষয়। দপ্তরের পরবর্তী সভাতেই এই প্রতিবেদন উত্থাপিত হবে।

 ২৪ নভেম্বরের মধ্যে দাবি মেনে না নেওয়া হলে শ্রমিকরা আত্মাহুতি দেবেন উল্লেখ করে গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকদের আর পেছনে ফেরার রাস্তা নেই। রাস্তায় আত্মাহুতি দিতে আমরা প্রস্তুত।’

দাবি আদায় না হলে পরবর্তী কর্মসূচি প্রসঙ্গে এই শ্রমিকনেত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা করব। হয় দাবি আদায় করব নতুবা মরব। যার পেটে ক্ষুধা, যে টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে তার মৃত্যুর ভয় নেই।’

কলকারখানা অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের উপমহাপরিচালক একেএম সালাউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি জটিল। এ ধরনের ভুয়া দাবিও মাঝে মাঝে দেখা যায়। তাই সত্যতা যাচাই করতে আমাদের তদন্ত দল প্রেস ক্লাবে গিয়ে শ্রমিকদের খোঁজ নিয়েছে। পরে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। এখন বাকি তারাই দেখবেন।’

শ্রমিকদের দাবির ন্যায্যতা প্রসঙ্গে এই উপমহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকরা কেউ কেউ দেড় লাখ থেকে উনিশ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন আবার কেউ কেউ কিছুই পাননি। যারা পেয়েছেন তাদের কাছে টাকা গেছে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার অনুদান হিসেবে। আমরা প্রতিবেদনে শ্রমিকদের কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পক্ষেই সুপারিশ করেছি। এছাড়া অন্যান্য কিছু তহবিল থেকেও তারা কিছু হয়তো পেতে পারেন। সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

অবস্থান কর্মসূচিতে থাকা শ্রমিক জরিনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের পরপর ক্রেতা সংস্থাসহ অনেকেই তখন আমাদের সুচিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে অগ্নিকা-ের প্রায় ৪ বছর পর আমাদের দেওয়া হলো সামান্য অনুদান বা আর্থিক সহায়তা। যে পরিমাণ টাকা তখন অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়, তার চেয়েও বেশি খরচ হয়ে যায় আমাদের চিকিৎসা ও বিভিন্ন হাসপাতালে আত্মীয়-স্বজনকে খুঁজে পেতে।’

পরবর্তী কর্মসূচি প্রসঙ্গে জরিনা দেশ রপান্তরকে বলেন, ‘শ্রম আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী ও উপযোগী ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘমেয়াদি সুচিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের দাবিতে আমরা গত দেড় মাস যাবৎ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে যে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি তা আমরা মরণপণ সংগ্রামের কর্মসূচিতে পরিণত করতে বাধ্য হব।’

সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনের দায়িত্ব জরিনা বেগমের ওপর থাকলেও তিনি অসুস্থ থাকায় তার পক্ষে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ বক্তব্য পাঠ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক কাফী রতন, জাতীয় গণতান্ত্রিক শ্রমিক ফেডারেশনের আহ্বায়ক শামীম ইমাম, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সবুজ, গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লালটু, সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণের সাধারণ সম্পাদক বিথী ঘোষ প্রমুখ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত