রাতের সড়কে যাত্রী ‘বিক্রি’ বাসচালক-হেলপারদের!

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২০, ০৪:৩৪ এএম

সাভার ও নবীনগরে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রী তোলে সাইনবোর্ড-বাইপাইলগামী মৌমিতা পরিবহন। কিন্তু নির্দিষ্ট গন্তব্যে না নামিয়ে রাজধানীর গাবতলী গরুর হাটের প্রবেশপথের সামনেই সব যাত্রী নামিয়ে দেন বাসটির চালক ও হেলপার। সাভার পরিবহন নামে আরেক বাসের চালকের সঙ্গে চুক্তি করে সেই বাসে তুলে দেওয়া হয় যাত্রীদের। ঘটনাটি ঘটে গত পহেলা নভেম্বর রাত পৌনে ১২টার দিকে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে না গিয়ে মাঝপথে নামিয়ে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে মৌমিতা বাসের চালক ও তার সহকারী (হেলপার) নাম-পরিচয় না জানিয়ে বলেন, ওই কয়জন (৭ জন) যাত্রী নিয়ে সাভারে গেলে তেলের টাকাও উঠবে না, তাই না গিয়ে ৭ যাত্রীকে ২০ টাকা করে ১৪০ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন আরেক বাসের সুপারভাইজারের কাছে। আর শুধু মৌমিতা বাস নয়, সাইনবোর্ড টু চন্দ্রা, মতিঝিল টু নবীনগর ও গুলিস্তান হয়ে আসা সাভারগামী অধিকাংশ বাসের চালক ও হেলপাররা রাতের বেলায় যাত্রাপথের বিভিন্ন পয়েন্টে এভাবে যাত্রী ‘বিক্রি’ করে থাকেন। নির্দিষ্ট গন্তব্যের নির্ধারিত ভাড়া আদায় করেও সেই গন্তব্যে যাত্রী না পৌঁছে দিয়ে ভিন্ন বাসে আরও কমদামে যাত্রী ‘বিক্রি’ করেন তারা। এতে পরবর্তী বাসে আরও হয়রানির মধ্যে পড়েন যাত্রীরা। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানী ঢাকা থেকে নবীনগর ও চন্দ্রাগামী লাব্বাইক, ওয়েলকাম, এমএম লাভলি ও সাভার পরিবহনসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে সরেজমিন এমন চিত্র দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সাভার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নবীনগর, বাইপাইল ও কালিয়াকৈর রুটে নিয়মিত চলাচল করে থাকে লাব্বাইক,ওয়েলকাম, এমএম লাভলি, মৌমিতা, ঠিকানা ও সাভার পরিবহন নামের বাসগুলো। এছাড়া মানিকগঞ্জগামী নীলাচল ও  বিআরটিসি বাস ভিন্ন গন্তব্যে না নামালেও  অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে থাকে। এসব গণপরিবহন চালুর শুরুতে ডাইরেক্ট (সরাসরি)  ও  সিটিং সার্ভিস ( না দাঁড়িয়ে ) এর কথা বলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু করে। কিন্তু কিছুদিন পরই পাল্টে যায় এসব বাসের সেবার চিত্র। ডাইরেক্ট ও সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলেও দাঁড় করিয়ে যাত্রী বহন করছে। এছাড়া পথে চলতে চলতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো যাত্রী ইশারা করলেই হঠাৎ ব্রেক কষে যাত্রী তোলেন চালক-হেলপাররা।

এসব অনিয়মের কারণ জানতে চাইলে ওয়েলকাম পরিবহন কোম্পানির এক বাস মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে যাত্রী পাওয়া যায় না। তাই দৈনিক জমা ভিত্তিতে নির্দিষ্ট টাকায় চালক ও হেলপারদের কাছে বাস তুলে দেওয়া হয়। এতে চালক ও হেলপাররা খেয়ালখুশি মতো যাত্রী তুলেন, ভাড়া আদায় করেন। দিনশেষে বাস মালিককে ভাড়ার টাকা দিয়ে যান তারা। যাত্রীসেবা দেখভালের দাায়িত্ব তাদের নয়।

লাব্বাইক পরিবহনের রফিক নামের এক হেলপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাস মালিকের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিতে বাস নেওয়া হয়। এতে যতবেশি উপার্জন হয়, ততই চালক, হেলপার ও চেকারের লাভ। এছাড়া লাইন খরচ হিসেবে অনেককেই টাকা দিতে হয়। তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী বহন করলেও সিটিং সার্ভিসের ভাড়া আদায় করতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মতিঝিল হয়ে নবীনগর কিংবা চন্দ্রা রুটের কয়েকটি পয়েন্টে যাত্রী গুনে ওয়েবিলে স্বাক্ষর করেন সংশ্লিষ্ট বাসের চেকাররা। সেসব পয়েন্ট ছাড়া অন্য কোথাও থেকে যাত্রী তোলার নিয়ম নেই। কিন্তু এসব চেকার টাকা নিয়ে যাত্রী কম দেখিয়ে ওয়েবিলে স্বাক্ষর করে থাকেন। ফলে যাত্রী হয়রানি আরও বাড়ে। এই রুটের একাধিক যাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মতিঝিল থেকে সাভার পর্যন্ত তিন থেকে চারটি স্টপেজ থেকে যাত্রী তোলার নিয়ম থাকলেও এখন সারাপথেই যাত্রী তোলা হয়। আর শুধু তাই নয়, রাতের বেলায় প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকেন বাসের কর্মীরা। এক জায়গার কথা বলে যাত্রী তুলে আরেক জায়গায় নামিয়ে দেন তারা। টাকা ফেরত চাইলে সুপারভাইজার বা হেলপারকে খুঁজে পাওয়া যায় না। যার কারণে অন্য বাসে পুনরায় ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়। ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান, বাস মালিক সমিতি বিভিন্ন গন্তব্যের ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেমন বাংলামোটর থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিকগেট পর্যন্ত ভাড়া ৪০ টাকা। এসব পরিবহন চালকরা রাতের বেলায় ঠিকই ৪০ টাকা ভাড়া আদায় করলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যাত্রীদের সাভারে নামিয়ে দেন। এতে ভিন্ন বাসে আরও ১০টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় যাত্রীদের।  মতিঝিল থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যাওয়ার কথা বলে যাত্রী তুলে কখনো গাবতলী আবার কখনো হেমায়েতপুরে নামিয়ে দেওয়া হয়। এতে যাত্রীরা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মধ্যে পড়েন। কেউ কেউ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও চালক ও হেলপাররা একজোট হয়ে চড়াও হন যাত্রীদের ওপর। এ কারণে তাদের অনিয়ম অনেকেই নীরবে সহ্য করে যান।

এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন,  ‘এই রুটে কোনো বাস মালিক ব্যক্তিগতভাবে বাস পরিচালনা করতে পারেন না। নামকাওয়াস্তে কিছু শর্ত পূরণ করে অসাধু লোকজন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে কিছু কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। এসব কোম্পানির অধীনে থেকেই বাস মালিকরা তাদের বাস পরিচালনা করেন। এক্ষেত্রে বাস মালিকরা দৈনিক ভাড়া হিসেবে প্রতিদিন আড়াই হাজার টাকা থেকে তিন হাজার টাকা করে পান। বাকি টাকা চলে যায় কোম্পানির পেটে। আর কিছু টাকা পান চালক ও হেলপাররা। এছাড়া প্রকৃত চালক ও হেলপার নিয়োগ না দিয়ে এসব কোম্পানি কম খরচে অদক্ষ চালকদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। এই ধরনের কোম্পানির অনুমোদন যতদিন না বন্ধ হবে, ততদিন সড়কের অরাজকতা দূর হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীতে চলাচলকারী কোনো বাসই ডাইরেক্ট বা সিটিং সার্ভিস নামে নিবন্ধিত নয়। এটা যারা বলে থাকেন তারা প্রতারণা করেন।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাত্রী যতজনই থাকুন না কেন, নির্দিষ্ট রুটের নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়া কোনো বাসচালক বা হেলপার যাত্রীদের মাঝপথে নামিয়ে দিতে পারেন না। অতিরিক্ত টাকাও দাবি করতে পারেন না। এসব সম্পূর্ণ অন্যায়। এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত