যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ আসবে

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২০, ১০:৪৫ পিএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ তাদের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী জো বাইডেনকে নির্বাচিত করেছেন। ইতিমধ্যেই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পর্যালোচনা লক্ষ করেছি এবং এর একটা বৈশ্বিক গুরুত্ব উপলব্ধি হচ্ছে। মার্কিন নির্বাচন নিয়ে সব সময়ই বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে সবার আগ্রহের মাত্রা অন্যান্য বারের চাইতে বেশি ছিল। আর এই আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এখনো ক্ষমতায় আসীন থাকা রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কেননা তার চার বছরের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছিল। এই পরিবর্তন কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই সংঘটিত হয়নি, উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিতেও অনেক পরিবর্তন এসেছিল। তবে এসব পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক অংশের জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল এবং নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। 

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় চরিত্রে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল, তেমনি তা বহুসংস্কৃতিবাদ দ্বারাও সমৃদ্ধ ছিল। দেশটাকে বলা হতো ‘ল্যান্ড অব ইমিগ্র্যান্টস’। অর্থাৎ বহু দেশ থেকে আগত অভিবাসীরা স্বাধীনভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে দেশটিতে বসবাস করতে পারত। আবার দেশটিকে ‘ল্যান্ড অব অপরচুনিটিস’ও বলা হতো। কারণ এখানে সবারই পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে এবং সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার পথ খোলা থাকত। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা। এবারও প্রথম নারী ও অশ্বেতাঙ্গ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভারতীয় মাতার সন্তান কমলা হ্যারিসের নির্বাচিত হওয়া এর আরেকটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু ট্রাম্পের শাসনামলের চার বছরে আমরা দেখেছিলাম যে যুক্তরাষ্ট্রে কট্টরপন্থা এবং রক্ষণশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমনকি ‘কেকেকে’-এর মতো যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সংগঠনগুলো এতদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ছিল, তারা এ সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে এই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সমর্থন করেছিলেন, তাতে সেখানকার জনগণ একে ‘ইনডালজমেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল।  যখন ট্রাম্পকে এইসব উগ্রবাদী সংগঠনের ব্যাপারে নিন্দা জানানোর কথা বলা হয়েছিল, তখন তিনি নিন্দা তো জানানইনি, উপরন্তু তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছিলেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল। 

এরকম প্রেক্ষাপটে ডেমোক্র্যাট’রাসহ অনেকেই আশা করেছিলেন যে তাদের ভূমিধস বিজয় ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যে ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিন প্রতিযোগিতা তৈরি করেছেন। যেসব ‘সুইং স্টেট’ বা ‘ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেট’ ছিল, সেগুলোতে বাইডেন স্বল্প ভোটে জয়ী হতে চলেছেন। অনেক আগে থেকেই বলা হয়েছিল যে ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবেন না এবং আদালতে মামলা করতে যাবেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সময় দেখা গিয়েছে যে তিনি ঠিকই এই দুটো কাজ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল ‘রিপাবলিকান পার্টি’র অনেক নেতাই তার সুরে কথা বলছেন। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারক-বাহক নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। এর ফলে এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। হোয়াইট হাউজের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার জন্য আর মাত্র ৭০ দিন রয়েছে। এমতাবস্থায়,  ট্রাম্পের এই কর্মকান্ড যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী এবং নজিরবিহীন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণকে নির্বাচনের মাধ্যমে সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছেন। যেটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করেছে। জনগণ জো বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছে। ট্রাম্প যেভাবে প্রশাসনকে নিজের কথামতো পরিচালিত করতে চেয়েছেন, বাস্তবে তা ঘটেনি। এজন্য অনেকে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং অনেককে পদচ্যুত হতে হয়েছে। আমরা লক্ষ করলাম যে, মার্কিন বিচার বিভাগের অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার পর্যন্ত ট্রাম্পের কথা শোনেননি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই নির্বাচনেও আমরা দেখেছি যে, অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখেছে এবং স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর এ ধরনের ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং ফলাফল প্রকাশ করা গিয়েছে।

জো বাইডেন যে বিজয়ী ভাষণ দিয়েছেন, তা এক কথায় খুবই অসাধারণ। তিনি বলেছেন যে ‘রেড স্টেট’ বা ‘ব্লু স্টেট’ বলে কিছু নেই; পুরোটাই একটা দেশ এবং একটা জাতি।  তিনি সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। এটা খুবই ইতিবাচক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্প কভিড-১৯ মোকাবিলায় বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু বাইডেন এ ব্যাপারে প্রথম থেকেই কার্যকর ভূমিকা নিতে চেয়েছেন। তিনি এজন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলেছেন। বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ের অভ্যন্তরীণ সমস্যা দূরীকরণে যেমন সচেষ্ট হওয়ার কথা বলেছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোতেও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সময় যেসব মুসলিম দেশের ব্যাপারে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা প্রত্যাহারের কথা বলেছেন।  ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের উষ্ণতা রোধকল্পে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তি বা ‘কপ-২১’ চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, আর বাইডেন সেই চুক্তিতে পুনর্বার ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে যে ‘ছয় জাতি’র সমঝোতা ছিল, বাইডেনের সময় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে আবার ফিরে যাবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আবার যুক্ত হয়ে করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে আবার একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া তৈরি করবে।  ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন বৈশ্বিক প্রক্রিয়া থেকে নির্বাসিত হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন দেশ ইউনিলিটারেল বা বাইলিটারেল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছিল। সেখানে বাইডেনের বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আবার যেভাবে বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাতে সারা বিশ্বেই এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

ট্রাম্পের সময় চীনের সঙ্গে যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছিল, সেখানে এবার পরিবর্তন আসতে পারে। বাইডেনের সময় রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার আলামত ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছে। বাইডেন ইউরোপে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং জার্মানির মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করবেন।

মধ্যপ্রাচ্যে বাইডেন প্রশাসন ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। ট্রাম্পের সময় যেভাবে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ফিলিস্তিনবিরোধী অবস্থানে যাওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে বাইডেন হয়তো খুব একটা বেশি সরে আসবেন না। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে রাতের আঁধারে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে যেভাবে বাধ্য হয়েছিল, বাইডেন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে এরকম নোংরা কূটনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা সবসময়ে ‘টু স্টেট সলিউশনে’র কথা বলে আসছে। এক্ষেত্রে হয়তো-বা ইরানকে এনগেজড করলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইরাকে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।  সার্বিকভাবে বলা যায় যে, কিছু অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও বাইডেনের সময় সারা বিশ্বই লাভবান হতে পারে। তার সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি, বিশ্ব নিরাপত্তা, বিশ্ব স্বাস্থ্য, বিশ্ব মানবাধিকার সবক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।  জাতিসংঘ আবার তৎপর হবে। ট্রাম্পের সময় জাতিসংঘকে যেভাবে হাস্যকর অবস্থায় ফেলা হয়েছিল, সেখান থেকে এই বিশ্ব সংস্থাটি পরিত্রাণ পাবে। বাইডেনের সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘মাল্টিলিটারেল ডিপ্লোমাসি’ শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা যায়। 

বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে একেবারে ফ্রন্টলাইনে না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থায় যে রয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাই এ ব্যাপারে খুব একটা পরিবর্তন আসবে না বলে মনে হয়। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইতিবাচক ভূমিকা দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বাইডেন প্রশাসন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে তৎপর হবে। কেননা ডেমোক্র্যাটরা মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে সবসময়েই সরব ভূমিকা পালন করে আসছে। সেজন্য তারা মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে পারে। তবে এক্ষেত্রে চীন এবং ভারতেরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা দরকার। কিন্তু কৌশলগত কারণে তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভূমিকা না নিতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পাশে এগিয়ে আসবে। আমাদের দৃঢ় কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এ ভূমিকাকে নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা এখন বাণিজ্য সুবিধা আদায় করতে পারব। আর যেহেতু আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার দ্বার বাইডেনের সময়ে শুধু উন্মুক্তই হবে না, আরও প্রশস্ত হওয়ার অপরিসীম সম্ভাবনা রয়েছে। 

সার্বিকভাবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন তার অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনে সর্বাধিক মনোযোগ দেবে। পাশাপাশি, সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, আগামীতে সেখানে থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা চালাবে। বিশেষ করে ‘ডেমোক্র্যাসি’ এবং ‘সফট পাওয়ার’-এর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা যেভাবে নিম্নগামী হয়েছে এবং এসব বিষয়ে তাদের ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষুণ্য হয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকার দেবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সঙ্গে আরও জোরালো সম্পর্ক স্থাপন করবে।

লেখক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত