রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত বৃহস্পতিবার বাস পোড়ানোর ঘটনায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা করেছে পুলিশ। এতে শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতাসহ দলটির অন্তত ৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বাস পোড়ানোর ঘটনায় তদন্তে নেমে তাদের কাছে অডিও রেকর্ডসহ কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ হাতে এসেছে, যেসবের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। একইভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বাসে অগ্নিসংযোগের জন্য বিএনপিকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অগ্নিসংযোগের ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এজন্য সরকারের এজেন্টদের দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, উপনির্বাচনে কারচুপি ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে আজ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপি বিক্ষোভ-সমাবেশ করব। এছাড়া আগামীকাল রবিবার সারা দেশে জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ-সমাবেশ করা হবে।
অন্যদিকে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গতকাল এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘হঠাৎ নাশকতা প্রমাণ করে বিএনপি তাদের চিরাচরিত সন্ত্রাসী পন্থা পরিহার করতে পারেনি।’
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রদল। এর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে গুলিস্তান, শাহবাগ, মতিঝিল, জাতীয় প্রেস ক্লাবসংলগ্ন সচিবালয় ও শাহজাহানপুর এলাকায় পাঁচটি বাসে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে নয়াবাজার, কারওয়ান বাজার ও ভাটারা এলাকায়ও তিনটিসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আরও পাঁচটি বাসে অগুন দেয় দুষ্কৃতকারীরা।
এসব বাস পোড়ানো ও বিস্ফোরণের ঘটনায় ইতিমধ্যে রাজধানীর আটটি থানায় ১৩টি মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বাস ভাঙচুর ও ১০টি বাস পোড়ানোর অভিযোগে ১১টি এবং বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় চারশোর বেশি নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল পর্যন্ত এসব মামলায় অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত বিভিন্ন মেয়াদে ২৬ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি দিয়েছে। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাশুকুর রহমান মাশুক, নির্বাহী কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেন, যুবদলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম নিরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামলসহ অনেকের নাম রয়েছে।
এসব মামলাকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে ইশরাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে আমি অসুস্থ থাকায় বাসায় আইসোলেশনে আছি। বাসা থেকে একেবারেই বের হচ্ছি না। আইসোলেশনে থেকেও মামলার প্রধান আসামি হয়েছি আমি!’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি গণতন্ত্রের রাজনীতি করে। আমরা আন্দোলন করি রাজপথে। আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না। যখন বিএনপি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালীরূপে মাঠে নামা শুরু করছে, ঠিক তখনই সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোসহ নাশকতার মতো ঘটনা ঘটিয়ে দমন-পীড়নের জন্য ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে যাচ্ছে।’ ইশরাকের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে ঢাকা-৬ আসন এলাকায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মশাল মিছিল করেছেন।
পুলিশ ও আদালতসংশ্লিষ্টরা জানান, শাহবাগে দুই মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সবাইকে তিন দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া তুরাগ থানায় করা মামলার আসামি হিসেবে একজনকে গ্রেপ্তার করে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কলাবাগান থানায় করা মামলার আসামি হিসেবে দুজনকে গ্রেপ্তার করে দুদিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি মিলেছে। পল্টন থানার এক মামলায় সাতজনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে ও আরেক মামলায় দুজনকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মতিঝিলে একজনকে দুদিনের রিমান্ডে, সূত্রাপুরে চারজনকে তিন দিনের রিমান্ডে, বংশালে দুজনকে দুদিনের রিমান্ডে ও উত্তরায় এক পোলিং এজেন্টসহ নয়জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন থানায় হওয়া ১৩টি মামলার মধ্যে দুটি বিস্ফোরক আইনে ও ১১টি বাস পোড়ানোর অভিযোগে করা হয়েছে। এসব মামলায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বাসে আগুন দেওয়ার পরপরই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতেই ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গতকাল সকাল পর্যন্ত আরও নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে শাহবাগ থানা ছয়, পল্টন থানা নয়, বংশাল থানা দুই, কলাবাগান থানা দুই ও মতিঝিল থানা পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া এজাহারে নাম থাকা অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশের একাধিক টিম।
বিভিন্ন থানায় পুলিশের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে পল্টন থানাধীন বিএনপির পার্টি অফিসের উত্তর পাশে কর অঞ্চল-১৫-এর পার্কিং করা সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এরপর ১টার দিকে মতিঝিল থানাধীন মধুমিতা সিনেমা হলের সামনে অগ্রণী ব্যাংকের স্টাফ বাসে, ১টা ২৫ মিনিটে রমনা হোটেলের সামনে চলতি গাড়ি ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনে, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে দেড়টার দিকে দেওয়ান পরিবহনে, ২টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশ সচিবালয়ের উত্তর পাশে রজনীগন্ধা পরিবহন এবং বংশাল থানাধীন নয়াবাজার এলাকায় ২টা ২৫ মিনিটে দিশারী পরিবহনে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়া ২টা ৪৫ মিনিটে পল্টন থানাধীন পার্কলিংয়ে জৈনপুরী পরিবহন, বিকেল ৩টায় মতিঝিল থানাধীন পুবালী পেট্রলপাম্পসংলগ্ন দোতলা বিআরটিসি বাসে এবং ভাটারা থানাধীন কোকা-কোলা মোড়ে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
জানা গেছে, উপনির্বাচনের তথ্য সংগ্রহের জন্য গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান দপ্তরের সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তার সঙ্গে কার্যালয়েই ছিলেন সহসাংগঠনিক সম্পাদক খোন্দকার মাশুকুর রহমান। সংবাদ সম্মেলন শেষে কার্যালয় থেকে বের হয়ে বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে রিকশায় ওঠেন তিনি। তখনই পুলিশ তাকেসহ দলের অন্তত ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে।
তিনি বলেন, সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিএনপির কার্যালয় ঘিরে রাখেন। এ কারণে কার্যালয়ে ও বাইরে নেতাকর্মী খুব একটা ছিল না। তাই আমার ধারণা, সরকারসংশ্লিষ্ট কেউ বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। আর বরাবরের মতো বিএনপি নেতাদের ফাঁসানোর জন্য মামলা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলকে আসামি করা হয়েছে। অথচ তিনি সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্ত হয়ে নিজের বাসায় আইসোলেশনে আছেন। এছাড়া ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আসামি করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
তবে গতকাল এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীর বেশ কয়েকটি জায়গায় হঠাৎ বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় একটি কল রেকর্ড পেয়েছি আমরা। সেটি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যারা কথা বলেছেন, তাদের পরিচয় জানতে কাজ করা হচ্ছে। তবে এ কল রেকর্ড মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এভিডেন্স হিসেবে কাজ করবে। কল রেকর্ড আর আগুনের ঘটনার সঙ্গে কথোপকথনের মিল রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু আগুন দেওয়ার সময় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি, সেহেতু কারা আগুন দিয়েছে তা তদন্ত করে জানা যাবে। তবে বিএনপি ও ছাত্রদল বসুন্ধরা এলাকায় মিছিল করেছে, গাড়ি ভাঙচুরের সময় দুজনকে আটক করা হয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও নয়াপল্টন এলাকায়ও মিছিল করেছে। এরপরই মূলত আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাই বিএনপি নেতাকর্মীরা জড়িত থাকতে পারে। তদন্তের পরই সবকিছু পরিষ্কার হবে।’
সরকারের এজেন্টরা আগুন দিয়েছে বলে দাবি ফখরুলের : বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘রাজধানীতে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ন্যক্কারজনক। এ ধরনের ঘটনা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সাহায্য করে না, ক্ষতিগ্রস্ত করে। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় একটি টিভি চ্যানেলেও খবর প্রকাশ হয়েছে যে, সরকারি দলের ছাত্রলীগের এক ছেলেকে গতকালের (বৃহস্পতিবার) ঘটনায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছে এবং সে বলেছে যে তাকে পয়সা-টয়সা দিয়ে নিয়ে এসেছে আওয়ামী লীগের লোকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ খবরটি প্রকাশ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যে উপনির্বাচনটা হলো এটা একেবারেই নির্বাচন হয়নি। এটা একটা পাতানো ও জালিয়াতির নির্বাচন হয়েছে, সেটা থেকে জনগণের দৃষ্টি দূরে রাখার জন্য এ বাস পোড়ানোর ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে সরকারের একটা পরিকল্পনা যে নির্বাচন প্রক্রিয়াটা ধ্বংস করা এবং দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, তারই নমুনা আমরা দেখতে পারছি।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দলের ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর যে ফোনালাপের কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তা বানোয়াট।
