ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প পাস হয়েছে। একই সঙ্গে ৭ হাজার ৫০৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা খরচে মোট পাঁচটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে সরকার দেবে ৭ হাজার ৪২৬ কোটি ৬১ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৭৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
গতকাল মঙ্গলবার একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-সচিবরা একনেক সভায় অংশ নেন। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিবের তথ্যমতে, অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে চারটিই স্থানীয় সরকার বিভাগ/স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এবং একটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। আর প্রকল্পগুলোর মধ্যে তিনটি প্রকল্প নতুন এবং দুটির সংশোধিত। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে সচিব জানান, করোনাভাইরাস ছাড়াও ২০১৯ ও ’২০ সাল প্রাকৃতিক দুর্যোগে নাকাল। গত বছরের মে মাসে আঘাত হানে বর্তমান শতাব্দীর প্রথম সুপার ঘূর্ণিঝড়। আম্পান নামের সেই ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় এসব অঞ্চল। বর্তমান শতাব্দীর দীর্ঘমেয়াদি বন্যাও এবার দেখেছে বাংলাদেশ। অতিবৃষ্টিও ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন স্থাপনা, ফসলসহ ইত্যাদির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আম্পান, বন্যা ও অতিবৃষ্টির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার ৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা খরচে একটি প্রকল্প হাতে নিল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সচিব জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের ১৪টি জেলার ৬৯টি উপজেলা, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের ২৮টি জেলার ১৮২টি উপজেলা এবং অতিবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগের ২২টি জেলার ১৩৯টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং ব্রিজ-কালভার্ট পুনর্বাসন করা হবে। এর মাধ্যমে পল্লী সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সংরক্ষণ, টেকসই সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পরিবহন ব্যয় ও সময় সাশ্রয় করা, বিভিন্ন পণ্যাদির বাজারজাত ব্যবস্থা সহজ করা, সড়ক অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে কৃষি বা অকৃষি খাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হবে। এজন্য প্রকল্প এলাকায় ২ হাজার ৩৮৮ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক পুনর্বাসন, ২ হাজার ২৭৪ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক পুনর্বাসন, ১ হাজার ৫৩৪ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন, ৭৮ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক পুনর্বাসন, ৪ হাজার ৬৩১ দশমিক ৮৫ মিটার (২৬৮টি) ব্রিজ পুনর্বাসন/পুনর্নিমাণ, ৬৯২ দশমিক ৩৭ মিটার (২৩৯টি) কালভার্ট পুনর্বাসন বা পুননির্মাণ এবং ৩২৮ কিলোমিটার বৃক্ষরোপণ করা হবে।
একনেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘যমুনা নদীর ডান তীরের ভাঙন হতে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলাধীন কাতলামারী ও সাঘাটা উপজেলাধীন গোবিন্দ এবং হলদিয়া এলাকা রক্ষা’ প্রকল্প পাস হয়েছে। এতে খরচ হবে ৭৯৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া ‘খুলনা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পে খরচ হবে ৩৯৩ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তার মধ্যে সরকার দেবে ৩১৪ কোটি ৭২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আর বাস্তবায়নকারী সংস্থা খুলনা সিটি করপোরেশন দেবে ৭৮ কোটি ৬৮ লাখ ১২ হাজার টাকা।
অন্য দুটির মধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প : বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলা’ প্রকল্পের প্রথম সংশোধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ৯৫০ কোটি থেকে সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুনে। এর সময় বাড়িয়ে করা হলো ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত।
আর ‘শেখ হাসিনা সাংস্কৃতিক পল্লী নির্মাণ’ প্রকল্পের সংশোধন আনা হয়েছে। প্রকল্পটির খরচ ১২৬ কোটি ৫৯ লাখ ৯২ হাজার থেকে সংশোধন করে বাড়ানো হয়েছে ২২৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের মার্চে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। সংশোধনীতে এর মেয়াদ বাড়িয়ে করা হলো ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।
একনেক সভায় অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম; শিক্ষামন্ত্রী মো. দীপু মনি; শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন; স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক; বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকসহ সংশ্লিষ্ট সচিব ও সদস্যরা।
