অধস্তন আদালতে জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং ট্রাইব্যুনালে ১০ থেকে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা ফৌজদারি মামলার তালিকা চেয়েছে হাইকোর্ট। অস্ত্র মামলায় দীর্ঘ ১৭ বছর আদালতে ঘুরে বেড়ানো অশীতিপর রাবেয়া খাতুনকে অব্যাহতি দেওয়া সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশ দেয় বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত বছরের অক্টোবরে এ সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার পর সম্প্রতি ৩৩ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে বলা হয়, “দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় ‘এবিউস অব দ্য প্রসেস অব দ্য কোর্ট’ স্পষ্টত প্রতীয়মান বিধায় ওই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম বাতিল করা হলো। ফলে রাবেয়া খাতুনকে এ মামলায় আর আদালতে আসতে হবে না।”
রায়ের একটি অনুলিপি আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে পাঠানোর নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট বলে, তাদের অধীন জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং ট্রাইব্যুনালে দশ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার প্রতিবেদন সংগ্রহ করে তিনটি তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। প্রথমত, দশ বছর বা তার অধিক এবং ১৫ বছরের কম সময়কাল বিচারাধীন মামলা, দ্বিতীয়ত, ১৫ বছর বা তার অধিক এবং তৃতীয়ত, ২০ বছর পর্যন্ত বিচারাধীন এবং ২০ বছরের অধিককাল বিচারাধীন মামলা। এসব মামলার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ৬ মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে দাখিল করতে হবে। রায়ে অশীতিপর রাবেয়ার দুঃখ-দুর্দশার চিত্র নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের প্রশংসা করে হাইকোর্ট বলে, একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু সংবাদ পরিবেশনই নয়, বরং সত্যকে উন্মোচিত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা। একই সঙ্গে রায়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও আদালতের সহকারীর প্রতি উষ্মা প্রকাশ ও তাদের সতর্ক করে হাইকোর্ট বলে, তাদের অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে মামলাটি এ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যা খুবই দুঃখজনক। রাবেয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আনা এবং অব্যাহতি চেয়ে আবেদনকারী আইনজীবী মো. আশরাফুল আলম নোবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই রায়টি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। অধস্তন আদালতগুলোতে বছরের পর বছর ফৌজদারি মামলা ঝুলে থাকে। রায়ের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনাগুলো কার্যকর হলে মামলা নিষ্পত্তিতে ইতিবাচক ফল আসবে।’
‘অশীতিপর রাবেয়া, আদালতের বারান্দায় আর কত ঘুরবেন তিনি’ শীর্ষক শিরোনামে গত বছরের ২৫ এপ্রিল দৈনিক ‘সমকাল’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী মো. আশরাফুল আলম নোবেল। প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রাখার অপরাধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় রাবেয়ার বিরুদ্ধে ২০০২ সালের ২ জুন মামলা দায়ের হয়। এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ছয় মাসের মতো কারাগারে ছিলেন তিনি। এরপর তাকেসহ আরও দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালের ২৪ মার্চ বিচার শুরু হয়। মামলার সময় রাবেয়া খাতুনের বয়স দেখানো হয়েছিল ৬০ বছর। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে তার জন্মতারিখ লেখা ১৯৩৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। সে হিসাবে রাবেয়ার বয়স ৮৬ বছর। ২০০৩ সালে এ মামলায় অভিযোগ গঠন হলেও ২০০৬ সালে তিনজন ও ২০১৪ সালে তিনজনসহ মোট ছয় জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে। এরপর আর কোনো সাক্ষী হাজির হয়নি। কিন্তু ১৭ বছর ধরে মামলার ধার্য তারিখে রাবেয়াকে আদালতে হাজির হতে হতো। রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে রাবেয়া খাতুনের বিরুদ্ধে করা অস্ত্র আইনের মামলার কার্যক্রম গত বছরের ৩০ এপ্রিল এক আদেশে তিন মাসের জন্য স্থগিত করে রুল জারি করে হাইকোর্ট। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ৩০ অক্টোবর এক রায়ে রাবেয়াকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় হাইকোর্ট।
