রাজধানী শহরের বাইরের একটি স্কুলের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে যেতে সম্মত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। সেই স্কুলে শেরে বাংলা এবং সোহরাওয়ার্দীও গিয়েছেন। ১৯৯৭-এর এপ্রিলের সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কিছু কঠিন ও কড়া কথা বলেছিলেন, কিন্তু ২৩ বছরের বেশি সময় পেরোলেও কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করেননি। বলেননি, মহামান্য আপনি ঠিক বলেননি কিংবা আপনি অতি সরলীকরণ করে ফেলেছেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন : শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররা মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করে এবং একে অন্যকে হত্যা করে। তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের কর্মী হিসেবে কাজ করে। ফলে শিক্ষার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে। অনেক ছাত্রকে দেখা যায় যে, তারা রাজনীতির ফলে ভালো লেখাপড়া না করেই সোজাসুজি এমপি/মন্ত্রী হয়ে যায় বা বিরাট সম্পদের অধিকারী হয়। কল-কারখানার মালিক হয়ে যায়। তা-ই যদি হয়, অন্য ছাত্ররা কষ্ট করে লেখাপড়া করতে যাবে কেন? এ অবস্থা চলতে থাকলে সারা জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। যখন তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন তখন তিনি ‘প্রেসিডেনশিয়াল ইনডেমনিটি’ ভোগ করতেন। তার বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা করার সুযোগ ছিল না। তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়েছেন ১৯ বছর আগে, ১৪ নভেম্বর ২০০১; ক্ষমতাহারা রাষ্ট্রপতির জেলখাটার নজির তো বাংলাদেশেই আছে। পদহীন সাহাবুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে আমরা কেউ টুঁ শব্দটি করার সাহস পেলাম না বলতে পারলাম না আপনি এমপি/মন্ত্রী সম্পর্কে ভয়ংকর অবমাননাকর কথা বলেছেন, তারা জনপ্রতিনিধি। তিনি ছাত্রদের নকল প্রবণতার জন্য শিক্ষকদের দায়ী করেছেন। বলেছেন, তারা পড়ান না, টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষকসমাজও বলেনি আপনি ভুল বলেছেন। একাধিকবার ছাত্রদের সংগঠনগুলোকে বলেছেন, বড় রাজনৈতিক দলের লেজুড়, কোনো দল কখনো প্রতিবাদ করেনি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গিয়ে বলেছেন, উচ্চশিক্ষার নামে বাণিজ্য হচ্ছে, শোষণ করা হচ্ছে। একটি বিশ^বিদ্যালয় থেকেও কেউ টুঁ শব্দটি করেননি। কারণ একটিই তিনি বানিয়ে কিছু বলেননি, নিত্যদিনের সত্যটাকেই তুলে ধরেছেন। সার্টিফিকেট বেচা শিক্ষা কিংবা সার্টিফিকেট কেনা শিক্ষায় জাতির কখনো মঙ্গল হতে পারে না। তার কথার সামান্যতম প্রতিবাদ করার যে নৈতিক শক্তি তা রাজনীতিবিদ, শিক্ষক প্রশাসক অনেকেরই নেই।
১৯৯৭-এর এপ্রিলেই একটি সরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন : সন্ত্রাসী তৎপরতা মাঝে মাঝে এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, বিশ^বিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ছাত্ররা মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করে।... প্রতিপক্ষের সভা ভ-ুল করা, নিজস্ব রাজনৈতিক দলের সভা সফল করা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা, হল দখল করা, প্রতিপক্ষ ছাত্রদের হল থেকে বহিষ্কার করা যেন এসব ছাত্র সংগঠনের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।... ছাত্রদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আগে ও পরে তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সলা-পরামর্শ করতে দেখা যায়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, রাজনৈতিক নেতারা তাদের লালন করেন, তাদের অপরাধকে প্রশ্রয় দেন, তাদের রক্ষা করেন। লোক দেখানো বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা রক্ষার অঙ্গীকার করেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকা- সীমিত থাকছে সনদ প্রদানের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে। ১৯৯৭-এর মে মাসে আবার একটি বিশ^বিদ্যালয়ের সমাবর্তনে হাজির হয়ে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দলের পাওয়ার গেমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ফেলে তাদের জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে। তিনি আল্লাহর দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক নেতার বলেছেন যেন তারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনটা নষ্ট করে দিয়ে তাদের জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎ টেনে না আনেন।
বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার সমস্যা নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে তিনি দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা দেখে বড়ই কষ্ট হয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নাম নিয়ে যে বিশ^বিদ্যালয়ের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কটি বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় থাকার কথা, সেখানে এমনকি এশিয়ার পঞ্চাশটি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হদিসই নেই। তার ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি : বাংলাদেশে শিক্ষার মান এত নিচে নেমে গেছে যে, দুনিয়ার কোনো কোনো দেশে এখানকার ডিগ্রি বা ডিপ্লোমাকে কেউ স্বীকৃতি দেয় না। এর কারণ সর্বজন স্বীকৃত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার পরিবেশ নেই। প্রায় সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে অরাজকতা, সন্ত্রাস, বোমাবাজি ও দলীয় রাজনীতি। অনেকেই বলে থাকেন, মুষ্টিমেয় ছাত্র ও ছাত্র নামধারী রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বাহিনী শিক্ষাঙ্গনকে জিম্মি করে রেখেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ছাত্রদের এই কর্মকা-ের আগুনে ঘি ঢালছেন দলবাজি করা শিক্ষকরা। এই আচরণ ও চর্চা অব্যাহত থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকবে ইমারত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। থাকবে না কেবল শিক্ষা। সারা বিশ্বে আমরা তখন অত্যন্ত নীচু স্তরের মানুষ হিসেবে পরিগণিত হব। ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার জন্য, সিনেট সদস্য হওয়ার জন্য, শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতির জন্য, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বাণিজ্যের মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য, প্রতিবাদী ছাত্র বা শিক্ষককে দমন করার জন্য, বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের ছাত্রনেতাদের ওপর নির্ভর করতে হয় কেবল পদ পেতে এবং পদে টিকে থাকতে ভিসিকে তাদের সঙ্গে একের পর এক সমঝোতা করে শেষ পর্যন্ত বিশ^বিদ্যালয়ের ওপর কালো মেঘের মতো অবস্থান করতে হয়। এ ধরনের ভিসির সঙ্গে শিক্ষার কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়।
সার্টিফিকেট-সর্বস্ব বিদ্যা : জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা হাইস্কুল ১৯৯৭ সালে শতবর্ষ উদযাপন করেছে। ১৯১২ সালে এই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেছেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ। পিংনাতে বসে ‘মহাশ্মশান’ কাব্য রচনা করেছেন কায়কোবাদ। ১৯৩৯ সালে স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমউদ্দিন এবং মৌলবী তমিজউদ্দিন খান। শতবর্ষের অনুষ্ঠানের ভাষণে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আক্ষেপ করেন, পাঠ্যবই থেকে নীতিশিক্ষা উধাও হয়ে গেছে এবং নৈতিকতার অবহেলা শিক্ষিতজনের মধ্যে বেশি বলে তিনি মনে করছেন। ‘ছেলেরা এখন মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া না করে নকল করে পরীক্ষা পাস করার চেষ্টা করে। এই খারাপ অভ্যাস এতদূর গড়িয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় নকল করার অধিকার চাই, এরূপ দাবি ওঠে। পরীক্ষার পরিদর্শকের বুকে ছুরি মেরে সে অধিকার আদায়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে প্রচুর।’ তিনি নকল প্রবণতার জন্য শিক্ষকদেরও দায়ী করেন ‘তারা যদি সর্বান্তঃকরণে স্কুলের মধ্যে ছাত্রদের ভালো করে পড়ান, হোমটাস্ক দেন, ঘন ঘন পরীক্ষা গ্রহণ করেন আর নিজেদের প্রাইভেট টিউশনি বাদ দেন, তাহলে ছেলেদের নকল করার দরকার হবে না। আমাদের সময়ে স্কুলের ছাত্ররা খুব কমই প্রাইভেট শিক্ষক রাখত। তখন একটা ধারণা ছিল যে কেবল মেধাহীন ছাত্ররাই প্রাইভেট পড়ে।’ অপর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রজতজয়ন্তী সভায় তিনি বলেছেন, শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান অশান্ত পরিস্থিতিই সেশনজট সৃষ্টির কারণ, এতে ঝরে যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের জীবনের মূল্যবান বছরগুলো, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবক, গোটা জাতি তাদের কাছ থেকে সেবা পাওয়ার বদলে তাদের ভার বহন করছে। জাতীয় উৎপাদন প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির এটাও কারণ। ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে সীমাহীন বৈষম্য সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করে চলেছে।
রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার : ৫ জানুয়ারি ১৯৯৭ জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে বিরাজমান অবস্থার একটি বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন : অতীতে আমাদের অধিকাংশ রাজনৈতিক আন্দোলনে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে সহিংসতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।... কয়েক যুগ ধরে বিশ^বিদ্যালয়সহ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ আর নেই। কারণ ছাত্রদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে তাদের সুশিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, বইয়ের পরিবর্তে ছাত্রদের হাতে আজ আমরা দেখছি অস্ত্র। ফলে প্রায়ই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রছাত্রীদের অল্প সময়ের নোটিসে হল, ছাত্রাবাস ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়। তাদের বিবেকবান উন্নত চরিত্র-বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে তাদের অনেককেই চাঁদাবাজ, মাস্তান, সন্ত্রাসী বানানো হয়। এর পরিণতি ভয়াবহ। একটি সভ্য জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব হবে বিপন্ন। তাই আমি বলব, এখনো সময় আছে, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে অনুরোধ করেন, শিক্ষার্থীদের যেন আর ক্ষুদ্র, হীন, নীচ, দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা না হয়। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন হয়তো জানতেনই এ তার অরণ্যে রোদন!
সন্ত্রাসীদের হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জিম্মি : ভৈরবে হাজী আসমত আলী কলেজের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রধান অতিথি। যে যুগে শিক্ষা বিস্তারে মুসলমান উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল আঙুলে গুনা, সে সময় হাজী আসমত আলী ব্যাপারীর অর্থানুকুল্যে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কালে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া প্রতিষ্ঠান গড়া কষ্টকর। শিক্ষিত ও সমর্থ মানুষের উদ্যোগহীনতার জবাবদিহি আগামী প্রজন্মের কাছে করতেই হবে। ভাষণে তিনি বলেন : বর্তমান সময়ে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় চলছে, শিক্ষাঙ্গনেও তার প্রতিফলন ঘটছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নেই। সন্ত্রাসীদের হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা জিম্মি হয় পড়েছেন। এই দুঃসহ অবস্থার পরিবর্তন না হলে শিক্ষা ও জাতির অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কেউ বলতে পারে না। ছাত্ররাজনীতি যত দিন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে এবং যত দিন ছাত্ররা রাজনৈতিক দলের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করবে, তত দিন শিক্ষাঙ্গন কলুষমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাসমুক্ত করার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পথভ্রষ্ট ছাত্রসমাজ : ১৯ এপ্রিল ১৯৯৮ নড়িয়া সরকারি কলেজের রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তার সতর্কবার্তা পুনরায় উচ্চারণ করেন : আমি শিক্ষাঙ্গনের অশান্ত পরিবেশ এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে বারবার বলে যাচ্ছি এবং রাজনৈতিক নেতারাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে যাচ্ছি। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি এ যাবৎ লক্ষ করা যাচ্ছে না। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে ছাত্রসমাজ দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছে, সেই ছাত্রসমাজ আজ পথভ্রষ্ট। সন্ত্রাস, ছিনতাই, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, খুন ইত্যাদি জঘন্য অপরাধের সঙ্গে ছাত্র নামধারী কতিপয় ব্যক্তি জড়িত হয়ে পুরো ছাত্রসমাজের নাম কলুষিত করছে অপরাধীরা কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে তাদের অপকর্ম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ভুল তো কিছু বলেননি। ১৯৯৮-এর ২৯ এপ্রিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, রাজনীতি ছাত্রদের হাতের বই সরিয়ে অস্ত্র তুলে দিয়েছে। ছাত্রদের সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করছে বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সন্ত্রাসমুক্ত হতে পারছে না। ছাত্ররা পিতৃসম শিক্ষকদের কথা শোনে না ও উপদেশ গ্রহণ করে না, কারণ শিক্ষকরা নিজেরাই রাজনীতিতে জড়িয়ে আছেন। লাল, সাদা, সবুজ, নীল, হলুদ ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের পরিচিতি নিশান দিয়ে তারা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করছেন। সব রাজনৈতিক দল যদি একত্র হয়ে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ করেন এবং শিক্ষকদের দলাদলি করতে নিষেধ করেন, তবেই শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসবে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এখনো বেঁচে আছেন। পেছন ফিরে তাকিয়ে তার এই অরণ্যে রোদনের স্মৃতির কথা মনে করছেন কি না, কে জানে।
লেখক সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট
