তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ নির্বাচনে সভাপতি পদে আবারও বর্তমান সভাপতি রুবানা হক প্রার্থী হচ্ছেন বলে সংগঠনটির এক নেতা জানিয়েছেন। ফোরাম নেতা ও বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ফয়সাল সামাদ গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, নির্বাচনে ফোরাম থেকে প্যানেলের নেতৃত্ব দেবেন রুবানা হক। এক্ষেত্রে তিনিই হবেন প্রথম বিজিএমইএ সভাপতি, যিনি পদে থাকাবস্থায় আবারও একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আর তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন সম্মিলিত পরিষদের ফারুক হাসান। তবে রুবানাকে পুনরায় প্রার্থী করার বিষয়টি অবগত নয় বলে জানিয়েছে ফোরামের একটি অংশ।
আগামী মার্চের শেষ সপ্তাহ বা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিজিএমইএ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে আগামী ৭ ডিসেম্বর ভার্চুয়ালি হবে সংগঠনটির বার্ষিক সাধারণ সভা।
এবারের নির্বাচনেও রুবানা হকের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ফোরাম নেতা ফয়সাল সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই করোনাকালে বিজিএমইএ পরিচালনার জন্য রুবানা হক সবচেয়ে যোগ্য বলে আমরা মনে করি। উনি কভিডকালে যেভাবে এই শিল্পকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে অভাবনীয়। উনি আরেকবার থাকলে এই শিল্প ক্ষতির হাত থেকে অনেকটা রেহাই পাবে বলে আমাদের মনে হয়েছে। এজন্য আমরা সবাই মিলে তাকে প্রার্থী করার কথা চিন্তা করেছি। প্যানেলে কারা কারা থাকছেন সে বিষয়ে কাজ চলছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে পাঠানো বার্তায় রুবানা হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে এই মুহূর্তে নির্বাচন নিয়ে ভাবার মতো পর্যাপ্ত সময় নেই। পারভেজ ভাই (আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ) ফোরাম নেতা। তার সঙ্গে কথা বলেন। তিনিই বলতে পারবেন। আমি বর্তমানে সবার সভাপতি। আমি পার্টির অবস্থান ব্যক্ত করার জন্য সুইট্যাবল ব্যক্তি নই।’ তবে ফোরাম নেতা আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল ও মেসেজ দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে রুবানাকে পুনরায় প্রার্থী করার বিষয়টি অবগত নয় বলে জানিয়েছে ফোরামের একটি অংশ। তাকে প্রার্থী করার তথ্য এ প্রতিবেদকের কাছেই প্রথম জানলেন উল্লেখ করে ফোরামের আরেক প্রভাবশালী নেতা শহিদুল হক মুকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সবকিছু আমাদের পাশ কাটিয়ে হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে বলা হয়েছিল আমাদের সঙ্গে বসবে। কিন্তু আগে তো মূল্যায়ন। কে প্রার্থী হচ্ছে তা আমাদের জানানো হয়নি। আমরা ফোরামের কোনো কার্যক্রমে এখন তেমন একটা নেই।’
বিজিএমইএর একেকটি কমিটির মেয়াদ সাধারণত দুই বছর হয়। তবে বিশেষ কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিজিএমইএর আবেদনের ভিত্তিতে এর মেয়াদ বাড়াতে পারে। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৪ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে সম্মিলিত পরিষদ ১০ বার ও ফোরাম ৪ বার বিজিএমইএকে নেতৃত্ব দিয়েছে। নির্বাচনে সংগঠনটির সাধারণ সদস্যরা ৩৫ পরিচালক নির্বাচন করেন। পরে তারা সভাপতি ও ছয়জন সহসভাপতি নির্বাচন করেন।
২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পরিষদ ও ফোরামের সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্দিকুর রহমান পরিষদ থেকে সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই সমঝোতা অনুযায়ী পরবর্তী সভাপতি ফোরাম থেকে হওয়ার কথা ছিল। দুই বছরের মেয়াদে নানা কারণে সিদ্দিকুর রহমান সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী নির্বাচন সমঝোতার ভিত্তিতে করার প্রস্তুতি চললেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীনতা পরিষদ নামে নতুন আরেকটি প্যানেল। ওই প্যানেলের আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচনে নামার ঘোষণা দেন। পরে গত বছরের ৬ এপ্রিল নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে ফোরাম থেকে ১৯ এবং সম্মিলিত পরিষদ থেকে ১৬ জন নির্বাচিত হয়। ওই নির্বাচনের ভোট গণনা নিয়ে অনেক সদস্যেরই প্রশ্ন রয়েছে। তখন বিজিএমইএর প্রথম নারী সভাপতি নির্বাচিত হন রুবানা হক।
গত নির্বাচনে ফোরাম থেকে কে সভাপতি হবেন তা নিয়ে ‘নাটকীয়তা’ হয়। প্রথমে রুপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল ইসলামকে ফোরামের পক্ষ থেকে সভাপতি প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ‘সমঝোতার নির্বাচন’ ভেস্তে গেলে রুবানা হককে সভাপতি প্রার্থী ঘোষণা করে ফোরাম। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। তাদের বড় একটি অংশ এতদিন রুবানা হককে এড়িয়ে চলেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া আগামী নির্বাচনেও শহিদুল ইসলাম ও বর্তমান জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ফয়সাল সামাদসহ আরও বেশ কয়েকজন সভাপতি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে থাকা ফোরামের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন আর ফোরামের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই। এ নিয়ে আমরা কয়েক দফা বৈঠক করেছি। আগামী তিন নির্বাচনে ফোরামের পক্ষ থেকে কে কে নেতৃত্ব দেবেন তার একটি তালিকা করা হয়েছে। সে অনুযায়ীই নির্বাচনে আমরা প্রার্থী দেব। এছাড়া যেহেতু আমরা বোর্ডে আছি তাই প্যানেল দিতে দেরি হলেও (নির্বাচনে) তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।’
অন্যদিকে ফোরামের অপর পক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন তাদের পাশ কাটিয়েই বিজিএমইএ পরিচালনা করছেন রুবানা হক। জ্যেষ্ঠ নেতাদের মূল্যায়ন না করায় তারা এখন দূরে সরে গেছেন। নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে রুবানা হকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তেমন কোনো লাভ হয়নি। বর্তমান বোর্ডের কয়েকজন সদস্য ও ফোরাম নেতা আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ মিলেই সবকিছু করছেন। এছাড়া পরিষদ থেকে নির্বাচিত পরিচালকদের সঙ্গে ফোরামের অনেকটা দূরত্ব রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘পারভেজ ভাই আমাদের ফোরাম প্রেসিডেন্ট। অন্য কারও সঙ্গেও আমাদের কোনো মনোমালিন্য নেই। যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে এগুলো ভিত্তিহীন। দেশ ও ট্রেডের স্বার্থে আমরা মনে করি সবাইকে স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। আমরা বলতে পারি, ফোরাম এক ছিল, আছে। আমরা সবাই মিলেই আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।’
এদিকে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত না স্বাধীনতা পরিষদের আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের চাওয়া ছিল বিজিএমইএতে নির্বাচনের ধারাবাহিকতা ফিরে আসুক। সেটা এসেছে। তাই নির্বাচন নিয়ে এখনো ভাবছি না। অনেকেই বলছেন নির্বাচন করার জন্য। এমনকি ফোরাম ও পরিষদ থেকেও কোয়ালিশন করে নির্বাচনের জন্য বলা হচ্ছে। কোনো সিদ্ধান্তই এখনো নিইনি। করোনায় এমনিতেই অনেক চাপে আছি। এই চাপ সামলানো নিয়েই কাজ করছি। বাকিটা সময় এলে দেখা যাবে।’
