বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নতি সাধনও আবশ্যক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের সমাজে এখনো শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব, দুর্বল-সবল, সরকারি-বেসরকারি, নারী-পুরুষ ইত্যাদি নানারকম বিভাজনে সর্বস্তরে সুযোগ-সুবিধার প্রকট বৈষম্য বিরাজমান। সমাজব্যবস্থাকে আমরা এখনো ন্যায়পরায়ণতায় সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে পারিনি, বৈষম্য ও বিভক্তির দেয়াল আমাদের ঘিরে রেখেছে। অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল অনেক ক্ষেত্রেই আজও শহরকেন্দ্রিক এবং উচ্চবিত্তকেন্দ্রিক, ফলে উন্নতি সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারছে না।
সমাজ ও রাষ্ট্রে এমন বৈষম্যের একটি বড় ক্ষেত্র স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা খাত। যা শহর-গ্রাম এবং ধনী-গরিবের বিভাজনে চরমভাবে বিভক্ত। স্বাস্থ্যবীমা এই সংকট উত্তরণে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। এখন থেকেই এ বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা, পথনির্দেশনা ও কর্মসম্পাদনের পথে হাঁটতে শুরু করলে শক্তিশালী জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালুর লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহজ হবে। এক্ষেত্রে জাপানের উদাহরণ অনুসরণ করা যেতে পারে। জাপানে কর্মজীবীদের স্বাস্থ্যবীমা এবং অন্য সব জনসাধারণের জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণের সুস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসাসেবা সুনিশ্চিত করা হয়। এমনকি দেশটিতে তিন মাসের বেশি অবস্থান করা সবাইকেই স্বাস্থ্যবীমার আওতায় থাকতে হয় এবং বীমার কেবল ৩০ ভাগ ব্যয় ব্যক্তিকে বহন করতে হয়। বাকি খরচ স্বাস্থ্যবীমা থেকে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থী, স্বল্প আয়ের জনগণ অথবা ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যয় যত বেশিই হোক না কেন, পুনরায় ছাড় দেওয়ার ফলে একটা নির্দিষ্ট অংশ বহন করতে হয়। স্থানীয় সরকারের কাছে প্রত্যেকের আয়-ব্যয়ের তথ্য থাকে বলে সহজেই তারা সমন্বয় করে নিতে পারে। শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়েই নয়, আবাসিক রোগীদের দেখাশুনা করার সবরকম দায়িত্ব হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ নিয়ে থাকেন। সেখানে রোগীর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সময় ছাড়া সাক্ষাতের নিয়ম নেই, তাই কাছের মানুষজনকে মানসিক চাপে পিষ্ট হতে হয় না। এখানে সবার জীবনের মূল্য সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়; গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে রাষ্ট্রপ্রধান সবাই একই নিয়মের আওতায় পড়েন। ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ বহনের মতো সাধ্য যে সবার আছে তা নয়, কিন্তু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় সর্বাধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেমে থাকে না। জাপানে শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র, কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কোনো বৈষম্য নেই।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নয়নের জন্য ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা ‘কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের’ প্রয়োজন। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র জনগণের সামগ্রিক কল্যাণে আত্মনিয়োগ করে থাকে, সরকার ও জনগণের যৌথ উদ্যোগে সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও অধিকার সংরক্ষিত থাকে, সরকার জনজীবনে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, আইনের মাধ্যমে শান্তিশৃঙ্খলা বিধান করে ও সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করে। আর সমাজ প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার রাষ্ট্রকে যথাসময়ে যথাযথ মাত্রায় জোগান দিয়ে দায়িত্ব পালন করে। স্বচ্ছ ধারণা পেতে হলে কানাডা, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে ইত্যাদি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের দিকে তাকানো যেতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই ব্যথিত চিত্তে দেখতে পাই যে, খ্যাতিমান ব্যক্তিদেরও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার দরুন চিকিৎসার খরচের জন্য সরকারের কাছে ব্যক্তিগত সাহায্যের আবেদন করতে হয়। পরিবারের সদস্য, নিকটজন বা সহপাঠী-সহকর্মীরা চিকিৎসা ব্যয়ভার বহনের জন্য অর্থসহায়তার আবেদন-আকুতির কাজটি করে থাকেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন সেটা থাকলেও বিপুল পরিমাণ চিকিৎসাব্যয় বহনের মতো সাধ্য আমাদের সমাজের একটা বড় অংশেরই নেই বলে এমনটা ঘটে। অথচ সংবাদ মাধ্যমে আমরা জানতে পারি এখন ৮৬ হাজারের ওপর কোটিপতি আমানতকারী আমাদের দেশে! অনেকে ভাবতে পারেন ব্যক্তি হিসাবে সবাইকে সাহায্য করার সামর্থ্য না থাকলেও সবাই মিলে কাউকে না কাউকে সাহায্য কিন্তু আমরা করতেই পারি।
কিন্তু মুশকিল হলো রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কার না হলে কোনোদিনই ব্যয়বহুল চিকিৎসার ভার বহনে অক্ষম মানুষদের এই কান্না থামবে না। কল্যাণরাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের কল্যাণের কথা ভাবে তখন সে পুরো স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করে। সবার জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করে অথবা চিকিৎসার একটা বড় অংশ রাষ্ট্র নির্বাহ করে। ফলে নাগরিকরা স্বাস্থ্যসুবিধা ভোগ করে। মৃত্যু অনিবার্য হলেও চিকিৎসাবিহীন না ফেরার দেশে চলে যাওয়া আমাদের কারও কাম্য নয়। একটা কল্যাণরাষ্ট্রে জনগণের আয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট হারে কর ধার্য করা হয়। সচ্ছলদের তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির হিসাবে বেশি কর ধার্য করে এবং কম সচ্ছলদের ওপর কম কর ধার্য করে অসহায় ও দুস্থদের মাঝে সাহায্য ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় জাপানে ব্যক্তিগত আয়কর ৫৫.৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে, আবার আইভরি কোস্টের জনগণ ৬০ শতাংশও আয়কর দিয়ে থাকেন (ট্রেড ইকোনমিক্স,২০২০)।
বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য কর বিভাগ, স্বাস্থ্য খাতসহ অন্যান্য বিভাগকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি নীতিমালায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, পুরো স্বাস্থ্য খাতের পরিচালনা পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ করা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, সর্বোপরি আমূল পরিবর্তনের জন্য একটি ‘স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশন’ গঠনের প্রয়োজন। আর তা অবশ্যই যোগ্য নেতৃত্বে বিজ্ঞ অধ্যাপকমণ্ডলী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয়ে হওয়া বাঞ্ছনীয়। যোগ্য ব্যক্তিদের দেশের স্বার্থে যোগ্য স্থানে রেখে সমাজের সবাই মিলে এই পরিবর্তন আনতে হবে, দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে হবে। দেশে কীভাবে সর্বস্তরে অবসরভাতা চালু করা যায়, জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু করে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায় সেসব উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। একজন দিনমজুর যেমন সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির দাবিদার তেমনি একজন শিল্পী বা লেখক কেন রাষ্ট্রের কাছ থেকে অবসরভাতা পাবেন না সেটাও ভাবা জরুরি।
স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে চলুন আমরা সবাই দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে খুশিমনে নির্ধারিত আয়কর দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, সমাজের উন্নতির জন্য সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ হারে কর প্রদান করি, শুধুমাত্র নিজ মঙ্গলের কথা না ভেবে সবাই মিলে ভালো থাকার চেষ্টা করি।
আর একইভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও যথাযথ ব্যবহারের জন্য সম্পদের সঠিক বণ্টনের বিষয়ে সরকারের কাছে জবাবদিহির দাবিতে সোচ্চার হই।
আমাদের সময় হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে, ভেদাভেদ ভুলে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আর কালবিলম্ব না করে অর্থনীতির উন্নয়নের ধারাকে সঙ্গী রেখে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্কারে মনোযোগ দিয়ে কল্পনায় ধারণ করা বৈষম্যহীন সোনার বাংলাদেশ গঠনের। বহুদূর স্বপ্নকল্পের মতো মনে হলেও এখন উদ্যোগ গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিলে অবশ্যই তা সম্ভব।
লেখক : ফার্মাসিস্ট ও গবেষক তয়ামা প্রিফেকচারাল ইউনিভার্সিটি, জাপান
