প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানে বড় সুযোগ কৃষি খাতে

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:২১ পিএম

শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরুজ মিয়া। জীবন ও জীবিকার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অন্যের কাছে হাত পাতেন না। কৃষিকাজ করেই পাঁচ সদস্যের পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন। সব বাধা পেরিয়ে ছেলেমেয়েকে পাঠিয়েছেন বিদ্যালয়ে। সুরুজ ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার সুতিপাড়া ইউনিয়নের বালিথা গ্রামের বাসিন্দা। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া একখন্ড জমিতে সবজি চাষ করে তিনি এখন সফল কৃষক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি হতে পারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে বড় খাত। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রতিবন্ধীবান্ধব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত করার বিষয়টি জোরালোভাবে ভাবতে হবে।

সম্প্রতি ধামরাই উপজেলার সুতিপাড়া ইউনিয়নের বালিথা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সুরুজ মিয়া একখন্ড জমিতে মুলার চাষ করেছেন। নিজেই করেন প্রায় সব কাজ। তিনি বলেন, কৃষিকাজ করে সংসার চলে তার। জন্মগতভাবে ডান পায়ের চেয়ে বাম পা খাটো। শারীরিক অক্ষমতার জন্য ভারী কোনো বস্তা মাথায় তুলতে পারেন না। ফলে শস্যের খাঁচা বা টুরকি মাথার ওপর নিতে পারেন না। তবে কোমরে ভর দিয়ে সার, বীজ, শস্য আনা-নেওয়া করতে পারেন। এভাবেই বাড়ির পাশের ১ পাকি (৩০ শতাংশ) জমিতে এই শীতে চাষ করেছেন মুলা, ধনে। নিজে খাওয়ার জন্য আইলের পাশে কিছু অন্য সবজিও চাষ করেছেন। দেখা গেল সারিবদ্ধ আখের ছোট চারাও। মুলা, ধনে তোলার পর জমিতে আখ বেড়ে উঠবে। এসব বিক্রি করেই চলবে তার সংসার।

জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, অনেক কৃষক বিনামূল্যে সার, বীজ পান। কিন্তু এ পর্যন্ত আমি কোথাও থেকে এসব কিছু পাইনি। তবে সহজে চালানো যায় এমন কীটনাশক ছিটানো, ধান মাড়াই কিংবা কাস্তেজাতীয় যন্ত্রপাতি পেলে কারও সহায়তার দরকার হবে না। আমি নিজেই পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারব।  

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. মীর্জ্জা এবি আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের বিষয়টিও ভাবতে পারে। প্রতিবন্ধী সহায়ক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা যেতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যন্ত্রপাতি কেনার জন্য তাদের বিনা জামানতে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য এমন ঋণ এখন দেওয়া হচ্ছে। একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, কৃষি একটি বিশাল খাত। এখানে সহজেই শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

এই গ্রামের আরও একজন প্রতিবন্ধী কৃষক মো. জসিম। তিনি জমিতে কচু ও সবজির চাষ করেছেন। এর সঙ্গে আখের চারাও রয়েছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। কিন্তু কৃষক হিসেবে অন্যরা যেসব সুবিধা পায়, তা আমি পাই না। কারণ ওসব (সার-বীজ) পেতে হলে বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধী বলে তা আমি পারি না।

এ প্রসঙ্গে সুতিপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, সরকারিভাবে যখন যে সহযোগিতার দরকার, সেটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমার ইউনিয়নের বেশির ভাগ প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় রয়েছে।

গত বছরের সমাজসেবা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ২১ লাখ ৪৬ হাজার। এর মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রায় ১০ লাখ। তবে কৃষি খাতে কতজন প্রতিবন্ধী রয়েছে এমন কোনো তথ্য নেই।  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) আলাদা করে কোনো শুমারি করেনি। এ প্রসঙ্গে বিবিএসের অ্যাগ্রিকালচার ইউংয়ের প্রধান ও কৃষি শুমারি প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) আলাউদ্দীন আল আজাদ বলেন, দেশে কতজন প্রতিবন্ধী কৃষক রয়েছেন, এই মুহূর্তে তার সঠিক ডেটা নেই। একই তথ্য জানান ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুল হাসান।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কৃষিতে যদি প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের আলাদা সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, সেটা দেশ ও জাতির জন্য ভালো। এ ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। কেউ উদ্যোগ নিলে আমরা সার্বিক সহায়তা করব। একই কথা জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। তিনি বলেন, সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্তকরণে আলাদা উদ্যোগের বিষয়টি ভাবা হয়নি। ভবিষ্যতে বিষয়টি ভেবে দেখা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত