গত আগস্টে ৬০ পূর্ণ করেলেন নন্দিত অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। কিন্তু তাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই জীবনের এতগুলো বসন্ত পার করে ফেলেছেন। ছোট ও বড়পর্দায় তাকে প্রতিনিয়ত দর্শক এত বিচিত্র চরিত্রে দেখেন যে বাস্তবের বাবুর বয়স নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। ভক্তরা শুধু চান, তিনি যেন বছরের পর বছর এভাবেই চমকিত করে যান। যে শিল্পীর অভিনয়ই একমাত্র শক্তি, তিনি তো স্বীকৃতি পাবেনই। হ্যাঁ, সবাই এরই মধ্যে জেনে গেছেন এ বছরও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পাশর্^ অভিনেতা হিসেবে পুরস্কৃত হচ্ছেন সবার প্রিয় এই অভিনেতা। এ নিয়ে চতুর্থবার জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন তিনি। অনুভূতি নতুন না হলেও বিশেষ তো বটেই! শোনা যাক তার মুখে, ‘এটা এমন এক ধরনের স্বীকৃতি যেটা যতবারই পাই না কেন, আকাক্সক্ষা কমে না! হ্যাঁ, অনুভূতি হয়ত প্রথমবারের মতো নয়, তবে অবশ্যই ইউনিক। জুরি বোর্ডের প্রতি কৃতজ্ঞতা। এখন মনে হচ্ছে এতবার আমার কাজকে সম্মান জানানো হচ্ছে, তাহলে আমাকে আরও ভালো কাজ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে স্বীকৃতি বলি আর কাজের অভিজ্ঞতা বলি, একটা সময় মনে হলো সব কাজ করা ঠিক নয়। এজন্য নাটকের গড়পড়তা কাজ একেবারেই কমিয়ে দিয়েছি। এখন সিনেমা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। আমি ভাগ্যবান যে, সিনিয়র নির্মাতা যাদের সঙ্গে অনেক দিনের পরিচয়, তারাসহ একেবারে নতুন একজন নির্মাতাও আমাকে নিয়ে কাজ করছেন। কোনো চ্যালেঞ্জিং চরিত্র হলে আমার কথা তাদের মাথায় আসছে। এটা না হলে হয়ত নিজের মেধার প্রমাণ বারবার দিতে পারতাম না।’
তৌকীর আহমেদের ‘ফাগুন হাওয়ায়’ সিনেমায় এক হতদরিদ্র পিতার বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলে এবার জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন বাবু। সিনেমার প্রেক্ষাপট বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। বাবু সে সময় অচ্ছুত শ্রেণি বলে বিবেচিত মেথরের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেন। এ ধরনের আনইউজুয়াল চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার জন্য কী করেছিলেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। নিজেকে তো কখনো তারকা ভাবি না, এত জনপ্রিয়তা এসেছে সেটাও চাইনি। শুধু ভালো কাজ করতে চেয়েছি। তাই সবার সঙ্গে তাদের মতো করেই মিশতে পারি। এজন্যই হয়ত নানা ধরনের মানুষের বেসিক সম্পর্কে ধারণা আছে। আর ‘ফাগুন হাওয়ায়’র চরিত্র প্রসঙ্গে বলতে গেলে, আমি ছোটবেলায় গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে মেথর শ্রেণিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তাদের কাউকে কাউকে আমি চিনতামও। তখন থেকেই তাদের ভাষার যে বিশেষ টোন, সেটা আমার আয়ত্তে চলে আসে। এমনকি তাদের মানসিক অবস্থান কোন পর্যায়ে থাকে সেটিও আমি জানি। তাই এই চরিত্রটি আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিল না।’
জীবনের এই লগ্নে এসে অনুভূতি কেমন? জানতে চাইলে বাবু আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বলেন, ‘আমি ইদানিং পেছনে ফিরে যাই। ভাবি, জীবনের এতগুলো বছর পার করলাম, কিন্তু কী করলাম? শিল্পী হিসেবে, মানুষ হিসেবে কতটুকু করতে পারলাম? এই হিসাব হয়তো আরও পরে মিলবে। কিন্তু এখন এটুকু মনে হয় যে, আমি চেষ্টা করেছি জীবনকে সার্থক করতে। এমন কিছু কাজ করতে যা নতুন প্রজন্মের কাছে আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।’
বৈশাখী থিয়েটারের মাধ্যমে অভিনয়ে যাত্রা শুরু বাবুর। এরপর আরণ্যকে। মোট ৩৭ বছর ধরে অভিনয় করছেন তিনি। থিয়েটার, নাটক, সিনেমা যেখানেই কাজ করেছেন তাতে জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্রেই দেখা গেছে তাকে। বাবুর ভাষায়, ‘শুধু বিনোদন দেওয়ার জন্য কাজ করতে চাইনি। তাই জীবনবিবর্জিত কাজ আমি খুব একটা করিনি। আমার করা চরিত্রগুলো মানুষের কথা বলে, জীবনের কথা বলে। এ জন্যই হয়তো দর্শক আমাকে এত ভালোবাসে। তবে অভিনয়কে শুধু শিক্ষণীয় বিষয় বললেও ভুল হবে। এটি প্রধানত বিনোদনমাধ্যম। তাই দর্শককে নির্মল বিনোদন দিতে নিত্যদিন চেষ্টা করি অভিনয়কে আরও সমৃদ্ধ করতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থ বা জনপ্রিয়তার জন্য কখনো কাজ করিনি, যা পেয়েছি সবই বাড়তি প্রাপ্তি। অভিনয় করতে এসেছি ভালোবাসা থেকে। শিল্পীর দায়িত্ববোধ নষ্ট হয় এমন কাজ কখনো করতে চাইনি।’
ফজলুর রহমান বাবু অভিনীত চয়নিকা চৌধুরীর সিনেমা ‘বিশ্বসুন্দরী’ মুক্তি পাবে আর মাত্র তিন দিন পর। এ ছাড়া মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘নোনা জলের কাব্য’, ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ‘পায়রার চিঠি’ ও গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘পাপ-পুণ্য’ সিনেমাগুলো। আর শ্যুটিং বাকি আছে জয়া আহসানের ‘ফুড়ুৎ’, শিশু একাডেমির ছবি ‘উড়াল’, মীর সাব্বিরের পরিচালনায় সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ছবি ‘রাত জাগা ফুল’সহ কলকাতার আরও দুটি ছবি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শ্যাম বেনেগালের ছবিটির শ্যুটিং আগামী মাসের শুরুর দিকে মুম্বাইয়ে শুরু হওয়ার কথা।
