স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:২৯ এএম

প্রতি বছর ১২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শক্তিশালী, সবার জন্য সমান ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস’ পালন করা হয়। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বলতে এটা বোঝায় যে, সব ব্যক্তি ও সম্প্রদায় কোনো আর্থিক ভোগান্তি ছাড়াই মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবে। এ কারণেই সবার জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।  

২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১২ ডিসেম্বরকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।  এই বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে এই দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য : সবাইকে রক্ষা করুন’। করোনা মহামারীর এই সংকটটি শেষ করতে এবং একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ গড়তে আমাদের অবশ্যই এমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে যা আমাদের সবাইকে রক্ষা করে।

বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ মহামারী করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এই বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়টি খুবই প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি এমনই একটি বিষয় যেটা নিশ্চিতকরণের দ্বারা আমরা কাক্সিক্ষত বিশ্ব লাভ করতে পারব। এই ক্ষেত্রে শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে হলে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

জাতিসংঘ কর্তৃক যে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য গৃহীত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান করা। বিশে^র শীর্ষ স্বাস্থ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংগঠনগুলো মনে করে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মারাত্মক দারিদ্র্যের অবসান ঘটানো, জলবায়ু সংক্রান্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করা এবং মারাত্মক মহামারীর অবসান ঘটানো প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কিত, কারণ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে উক্ত বিষয়গুলো অর্জন করা সম্ভব। ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবার সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।     

স্বাস্থ্য অধিকার হচ্ছে মানবাধিকার। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে সবার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির পথ সুগম হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংবিধানে উল্লেখ আছে, সর্বোচ্চ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি হচ্ছে মানবাধিকার। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাদের জাতীয় সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অর্থ হলো উন্নত স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন অর্জন করা, কেউ যাতে অসুস্থতাজনিত কারণে দারিদ্র্যের কবলে না পড়ে সেটা প্রতিরোধ করা এবং মানুষকে স্বাস্থ্যবান ও অধিকতর উৎপাদনশীল জীবন-যাপনে সহায়তা করা। বলা হয়ে থাকে যে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিনিয়োগ করা হলে ব্যাপক সুবিধা অর্জিত হয়। সহজে প্রাপ্তিসাধ্য ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবার অভাবে পরিবার ও জাতি দারিদ্র্যের কবলে পড়ে।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার তৃতীয় লক্ষ্যটিতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আর্থিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা, মানসম্মত, কার্যকর ও সহজে পাওয়া যায় এমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। যেসব দেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে, তারা এর উপকারিতা লক্ষ করেছে। তারা অধিকতর স্বাস্থ্যবান সম্প্রদায় ও অধিকতর শক্তিশালী অর্থনীতি অর্জন করেছে। 

স্বাস্থ্যসেবায় সাফল্য অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত অনেক সমস্যা রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে আমরা এখনো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সুরক্ষার বাইরে রয়েছে এখনো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে এবং তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর অসুস্থতার কারণে ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে। 

বাংলাদেশে জনপ্রতি স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারিভাবে ৩৭ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজন ৮৫ থেকে ১১২ ডলার। অথচ পাশের দেশগুলোয় এটি অনেক বেশি। এই বিষয়ে সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে, অন্যথায় সব মানুষকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে না। লন্ডনভিত্তিক মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটের এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতের অদক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী। স্বাস্থ্য জনবলের (চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান) ৯৪ শতাংশই অদক্ষ। অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের গ্রামাঞ্চলে কর্মক্ষেত্রে ধরে রাখা কঠিন। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ধারণায় ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে চিকিৎসা পেতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় এর ৬৭ শতাংশই রোগীকে বহন করতে হচ্ছে।

আমরা যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারি তবে ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি (আয়ুর্বেদ ও ইউনানি) সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পৃৃথিবীর প্রাচীন ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির অন্যতম হচ্ছে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্র। আয়ুর্বেদ এখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতিও বটে। আয়ুর্বেদকে আরও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এগিয়ে এসেছে। অতি সম্প্রতি তারা ঘোষণা দিয়েছে, আয়ুর্বেদ ওষুধের বৃহত্তর গবেষণা কেন্দ্র হবে ভারতে। 

দেরিতে হলেও আমাদের এই উপমহাদেশের জন্য এটি আশাব্যঞ্জক খবর। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতিনির্ধারক মহল ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে এলে ঐতিহ্যগত এই চিকিৎসা পদ্ধতি অসুস্থ, বিশেষ করে অসংক্রামক ব্যাধিতে (এনসিডি) আক্রান্ত জনগণের কল্যাণে অগ্রদূত হতে পারে। অনেক আধুনিক ওষুধই প্রাকৃতিক এই ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি ও ভেষজ রীতি অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য এই ভেষজভিত্তিক ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

ঐতিহ্যগত এই চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহারের একটি সুবিধা হলো এই যে এই পদ্ধতিতে ব্যয়বহুল বিদেশি ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে পারি আমরা। আর স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেরাই কম খরচের ওষুধ তৈরি করতে পারি। এই চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে যে বিভিন্ন রোগের আরোগ্য করা সম্ভব সে বিষয়ে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন। যদি এই ধারা সাফল্যজনকভাবে অব্যাহত থাকে তাহলে এর মাধ্যমে অল্প খরচে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এটা দেশের স্বাস্থ্যখাত ও ওষুধ শিল্পে একটি বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে।

আমরা ভারত ও চীনের দিকে তাকালে দেখতে পাই, এই দুটি দেশ তাদের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে ঐতিহ্যগত পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তানেও এই চিকিৎসা পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ভারত তার কমিউনিটি স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। ভারতে আয়ুষ ও শ্রীলঙ্কায় বিকল্প চিকিৎসা বিষয়ে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশ যেসব স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলা করছে এক্ষেত্রে বলা যায় যে, আমাদের এখন দেশীয় এসব চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্বেষণ ও উন্নয়ন করা জরুরি।

দেশে ডাক্তার, নার্স ও মিডওয়াইফের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার কর্মীবাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাস্থ্যখাতে এ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারি। আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুন্স) ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে কাজ করে আসছে। আয়ুন্স মনে করে, এই খাতে উন্নয়ন সাধন করা গেলে আমরা স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে পারব।

কিন্তু  এই খাতে আমাদের দেশে বেশ কিছু সমস্যা আছে যেগুলো দূর করতে পারলে আমরা এই খাতে উন্নতি অর্জন করতে পারব। নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিতে পারলে আমরা কাক্সিক্ষত ফলাফল আশা করতে পারি এই খাতে সরকারের তরফ হতে অধিক পৃষ্ঠপোষকতা আসা দরকার, যেসব ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসক গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন তাদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগদানের ব্যবস্থা করতে হবে। উক্ত ডিগ্রিধারীদের জন্য উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে আয়ুর্বেদ ও ইউনানি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও প্রতিটি জেলায় ভেষজ বাগান তৈরি করতে হবে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ যাতে মানসম্মতভাবে তৈরি করা হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তদারকি করার জন্য বিএমডিসির মতো স্বতন্ত্র একটি কাউন্সিল গঠন করা দরকার।

আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ গরিব। তাই তাদের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা চালানো দুরূহ ব্যাপার। ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিতে একজন মানুষ অল্প খরচেই চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। প্রাকৃতিক পদ্ধতি হওয়ায় আয়ুর্বেদ ও ইউনানি পদ্ধতিতে চিকিৎসার তেমন কোনো নেতিবাচক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই, যা কি-না আধুনিক পদ্ধতিতে লক্ষ করা যায়।

সংশ্লিষ্ট সবাই যদি এগিয়ে আসেন এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন, তাহলে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি করোনা মোকাবিলাসহ আমাদের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই প্রাকৃতিক চিকিৎসা তথা আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসা বিষয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা দরকার এবং এই চিকিৎসা পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

লেখক ভাইস চেয়ারপারসন ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত