পুরনো জেএমবির নব্য দস্যু বাহিনী গঠনচেষ্টা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৫১ এএম

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর পুরনো অংশের সদস্যরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা সংগঠনের শীর্ষ নেতা সালাহউদ্দিন সালেহীন বিভিন্ন মাধ্যমে তার অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সাংগঠনিক দুর্বলতা ও আর্থিক অনটন কাটাতে সংগঠনটি নতুন করে দস্যু বাহিনী গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও তথ্য মিলেছে। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালী থেকে পুরনো জেএমবির সক্রিয় সদস্য ও সংগঠনটির দস্যু বাহিনীর অন্যতম সদস্য মোজাফফর আলী ওরফে শাহীন (৩৫) গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য জানতে পেরেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানান, পুরনো জেএমবির ডাকাত দলের সদস্য শাহীন গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা পলাতক সালাহউদ্দিন সালেহীনের অবস্থান শনাক্তকরণের পাশাপাশি বর্তমান কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য সরবরাহ করলেও শীর্ষ জঙ্গি নেতার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য সরবরাহ করেনি শাহীন। পরে গত বৃহস্পতিবার মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি কর্মকান্ড অনুসরণকারী ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, জেএমবির পুরনো ডাকাত দলের অন্যতম সদস্য শাহীন দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ডাকাতি ও ছিনতাই কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। ডাকাতি ও ছিনতাই করা অর্থ সাংগঠনিক কাজে ব্যয় করত। সংগঠনটির শীর্ষপর্যায় থেকেই ডাকাতির নির্দেশনা দেওয়া হতো। তবে ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে জেএমবির তিন দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরই অধিকাংশ নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যায়। অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ দেশের পার্বত্য এলাকার গহীন পাহাড় ও জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, শাহীনের ছোট ভাই আল-আমিন প্রিজন ভ্যানে হামলা করে জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় দায়ের মামলার অন্যতম আসামি। বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। শাহীন মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন লোক মারফত ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলত। এছাড়া শাহীনের সঙ্গে পলাতক একাধিক শীর্ষ নেতার যোগাযোগ ছিল। তাদের নির্দেশনাতেই প্রায় চার বছর রাঙ্গামাটির পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকে। তারও আগে প্রায় দেড় বছর রাজধানীর পাশে আমিনবাজারে লুকিয়ে ছিল। সম্প্রতি সাংগঠনিক নির্দেশনায় সে রাঙ্গামাটি পার্বত্য এলাকা থেকে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করে। এরপর একাধিক সঙ্গীকে নিয়ে আবারও ডাকাত দল গঠনের কার্যক্রম শুরু করে।

তারা আরও জানান, পুরনো জেএমবির নতুন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি তার সঙ্গী অন্তত চারজনের নাম পারিচয় প্রকাশ করেছে জিজ্ঞাসাবাদে। যাদের সমন্বয়ে নতুন করে দস্যু বাহিনী গঠনের চেষ্টা করছিল। গ্রেপ্তারের স্বার্থে এ জঙ্গিদের নাম প্রকাশে রাজি হননি সিটিটিসির কর্মকর্তারা।

সিটিটিসির উপকমিশনার (ডিসি) সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরনো জেএমবির ডাকাত দলের সদস্য মোজাফফর আলী ওরফে শাহীনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। যাদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, শাহীনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরনো জেএমবির পলাতক আমির সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তাদের ধারণা, সালেহীন ভারতে পালিয়ে আছে।

পুরনো জেএমবির কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিভিন্ন সময়ে পুরনো জেএমবির অন্তত ১৫ জন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। যারা সবাই সংগঠনটির ডাকাত দলের সদস্য ছিল। মাঝে কিছুদিন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকলেও আবারও এ সংগঠনের সদস্যরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশে ভাস্কর্যবিরোধী নানা ধরনের অপতৎপরতার সুযোগ নিয়ে সংগঠনটির পলাতক ডাকাত দলের সদস্যরা নতুন করে দস্যু বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে শাহীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া পুরনো জেএমবির সক্রিয় সদস্য হিসেবে আরও একাধিক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ধারণা, শাহীন গোপনে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে তাদের প্রত্যেকেই এই ডাকাত দলের সদস্য। তাদের অন্তত চারজনকে খোঁজা হচ্ছে।

পুরনো জেএমবির কর্মকান্ড অনুসরণকারী সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদ কখনই নিঃশেষ হওয়ার নয়। একই ধারাবাহিকতায় পুরনো জেএমবির অনেক সদস্য এখনো সক্রিয়। দেশে ও দেশের বাইরে থেকে তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। আমরাও বিভিন্ন কৌশলে তাদের কর্মকা- বিশ্লেষণ করে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

কাউন্টার টেররিজম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের আরেক কর্মকর্তা জানান, শাহীন ২০০৯ সালে এ সংগঠনে যোগদান করে দাওয়াতি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও শারীরিক প্রশিক্ষণ নেয়। সংগঠনে যোগদানের পর থেকে রিক্রুটমেন্ট এবং অর্থ সংগ্রহের কাজ শুরু করে। জেএমবির অর্থ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সময় ডাকাতি ও ছিনতাই শুরু করে। ২০১৪ সালে জেএমবির সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল ত্রিশালে পুলিশের প্রিজন ভ্যানে হামলা করে জেএমবির তিন নেতা সালাহউদ্দিন সালেহীন, বোমা মিজান ও হাফিজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর থেকেই শাহীন আত্মগোপনে চলে যায়। ঢাকার আমিনবাজার ও রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থান করে গোপনে জেএমবি সংগঠনের হয়ে কাজ করছিল।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের মুখে পুরনো জেএমবির অধিকাংশ নেতাকর্মী ধরা পড়ে। অনেকের সাজা হয়। অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে নব্য জেএমবির কার্যক্রম শুরু হয়। গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার মধ্য দিয়ে তাদের সাংগঠনিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রকাশ ঘটে। পরে এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা র‌্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের শেষের দিকে জেএমবির নতুন আমির আবু রায়হান ওরফে মাহমুদ ওরফে আবদুল হাদিসহ তিন জঙ্গি নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য দুজন হলো হাবিবুর রহমান ওরফে চাঁন মিয়া ও রাজিবুর রহমান ওরফে রাজিব ওরফে সাগর। হাবিবুর ২০১৮ সালে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় এক পীরের বাসায় ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া মুন্সীগঞ্জে শাহজাহান বাচ্চু হত্যাকাণ্ডেও তার সম্পৃক্ত ছিল। এ সংগঠনের বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন আমির রয়েছে। জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ, জামা’আতুল মুজাহিদীন ভারত বা জামা’আতুল মুজাহিদীন পাকিস্তান নামে বিভিন্ন দেশে তাদের আমির নির্বাচিত হয়ে থাকে। তারই অংশ হিসেবে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আমির বা প্রধান হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্বে ছিলেন সালাহউদ্দিন সালেহীন। তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর নব্য জেএমবিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি আমিরের দায়িত্ব পালন করলেও পুরনো জেএমবির আমির হিসেবে সালেহীন এখনো বহাল রয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত