নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদ শিরোনাম নিহত ১২৫ জন বাংলার এলিট। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকা। ঢাকার বাইরে যে সব নিহত মানুষের সন্ধান পাওয়া গেছে তাদের অন্তত ১২৫ জনই চিকিৎসক, অধ্যাপক, লেখক, শিক্ষক। এই মানুষগুলোর হাত পিঠের পেছনে বাঁধা ছিল, তাদের ওপর বেয়নেট চার্জ করা হয়েছে, শ্বাসরুদ্ধ করা হয়েছে কিংবা গুলি চালানো হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্য ও স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত তাদের সমর্থকদের হাতে যে ৩০০ বুদ্ধিজীবী নিহত হয়েছেন, তারা এর মধ্যে রয়েছেন। পাকিস্তানপন্থি অনিয়মিত সৈন্য এই রাজাকাররা পাকিস্তানের আত্মসমর্পণে দরকষাকষি করার সুবিধার জন্য তাদের জিম্মি করেছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। তাদের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডারদের আত্মসমর্পণের দু’দিন আগে তারা এই হত্যাকা- চালিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কাছাকাছি এলাকার অধিবাসীরা জানিয়েছেন বহু সংখ্যক বাঙালিকে নিকটবর্তী একটি কারখানার ভেতরে নিয়ে হত্যা করে জলাশয়ে ফেলে দেয়। রাজাকাররা এখনো সেই কারখানা তাদের দখলে রেখে প্যাট্রলরত ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। ধরাপড়া দুজন রাজাকার বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কথা স্বীকার করেছে, পরে এই রাজাকারদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। শহরের বাইরের জলাশয়ে নিহতদের সন্ধান পাওয়া যায়, পানি রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে আর আঘাত ও ক্ষতের কারণে তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
রাজাকারদের দখলে থাকা ইটখোলার ৪০০ গজ দূরে ইট তৈরির জন্য মাটি তোলা জলাশয়ের দিকে নিহতদের ক্রন্দনরত সহস্র আত্মীয়স্বজন ছুটে যাচ্ছে। শোকার্ত মানুষ যখন তাদের নিহত স্বজনের মৃতদেহ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে তখন নিকটবর্তী একটি মসজিদ থেকে রাজাকাররা তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে।
বাংলাদেশে আটক পরাজিত পাকিস্তানি সৈন্যরা পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় কাল থেকে নিজ নিজ সামরিক ক্যাম্পে অস্ত্র সমর্পণ করতে শুরু করবে।
বেয়নেটে নিহত গলাকাটা কয়েকজনকে শহরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ঢাকা শহরে প্রায় ২৫০০০ পাকিস্তানি সৈন্য রয়েছে। চারদিন আগে তারা প্রতিরক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর হাতে বিচ্ছিন্ন হওয়া পূর্ব পাকিস্তানের গ্যারিসনগুলোতে আরও ২০০০০ সৈন্য আটক রয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী বলেছেন, আকাশ যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর অধিকতর দক্ষতার কারণে তারা বিনা চ্যালেঞ্জে তাদের হেলিকপ্টার অপারেশন চালিয়ে যেতে পেরেছে আর সেটাই যুদ্ধের নিয়তি নির্ধারণ করে দিয়েছে।
তিনি বলেছেন, ভারতীয় বাহিনীর গতিশীল অপারেশন পাকিস্তানি বাহিনীর ‘লাইন অব কমিউনিকেশন’ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তাদের যুদ্ধের জন্য কৌশলগত আয়োজন বাধা প্রদান করে। তিনি অনুমান করছেন পূর্বাঞ্চলে ৫ থেকে ৬ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে এবং ৫ হাজার ধরা পড়েছে। ঢাকা স্টেডিয়ামের কাছে মুক্তিবাহিনীর মুক্তির উৎসব উদযাপনে ৮ হাজার মানুষ যোগ দিয়েছে, সেখানে বাঙালি গেরিলা নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের কারাবন্দি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মুক্তি দেওয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে দাবি জানিয়েছেন, অন্যথায় তারা পশ্চিম পাকিস্তান আক্রমণের জন্য ভারতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইবে। গেরিলাদের হাতে তিনজন তরুণ কয়েদির বেয়নেটবিদ্ধ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উপযাপনের যবনিকা নেমে আসে।
দুজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা আজ (কলকাতা থেকে) ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। একজন রুহুল কুদ্দুস, তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের নেতৃত্ব দেবেন, আবদুল খালেক নতুন সরকার গঠনে পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে কাজ করবেন।
পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর এম এ মালিকসহ মন্ত্রীদের সামরিক বেষ্টনী ক্যান্টনমেন্টে না গিয়ে রেডক্রসের নিরপেক্ষ ঘোষিত এলাকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করতে হচ্ছে। আগামীকাল থেকে এই নিরপেক্ষ জোনের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাবে।
জনতার একটি দল বোমা বিধ্বস্ত ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিস অফিসে যায় এবং সেখানকার আমেরিকান পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের দাবি জানায়। আমেরিকানরা তাদের কথামতো বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।
পিটার হ্যাজেলহার্স্ট দ্য টাইমস-এ লিখেছেন, বড় গর্তগুলোর পাশে যেখানে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গলিত দেহ আবিষ্কৃত হয়েছে সেখানে স্বামীর দেহটি শনাক্ত করতে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার পাশার স্ত্রী মোহসিনা পাশা। আরও অনেকের মতোই, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দুদিন আগে অধ্যাপক পাশাকে তুলে নেওয়া হয় এবং পাঠানো হয় রাজাকারদের এই বধ্যভূমিতে। তার আরও দুজন সহকর্মী ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক রাশিদুল হাসান এবং ইতিহাসের অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্যকেও সেই সকালেই রাজাকারদের একই দল বাসা থেকে ধরে নিয়ে আসে। পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিরা বলে যাচ্ছে, এই নৃশংসতা সম্পর্কে তাদের কিছুই জানা নেই। কিন্তু এখন সাক্ষ্য উঠে আসছে যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশেই রাজাকাররা দায়িত্ব পালন করেছে। একটি পত্রে একজন ভিকটিমের নাম ছিল নিজামউদ্দিন, পাশে মন্তব্য উদ্দেশ্যপ্রবণ কাহিনী, নিজামউদ্দিনের নামের পাশে কাটা দাগ।
সানডে টাইমস-এর নিকোলাস টোমালিন লিখেছেন, আকস্মিক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এবং নিবিড় পরিকল্পনার আওতায় বাঙালি এলিট নিধনের অংশ হিসেবে এই হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। এটা অবশ্যই কমান্ডিং অফিসার জেনারেল নিয়াজিসহ পাকিস্তান হাইকমান্ডের পূর্ণ জ্ঞাতসারে ঘটেছে।
এসব মৃতদেহের আবিষ্কার ঢাকা শহরে উত্তেজনা বাড়াতে পারে, পাল্টা হত্যাকা- ও দাঙ্গার জন্ম দিতে পারে, এমনকি মুক্তিবাহিনীর গেরিলা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যেও সংঘর্ষের সৃষ্টি করতে পারে। ঢাকার মূল শহরের পাশে রায়েরবাজারে কতগুলো বিচ্ছিন্ন গর্তে নিহত বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। আমি নিজে ৩৫টি গলিত দেহ দেখেছি। আপাতদৃষ্টে মনে হয়, তারা চার-পাঁচ দিন আগে নিহত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি হবে। ঢাকায় অপহরণ করা এ ধরনের লোকের সংখ্যা অন্তত ১৫০ হতে পারে।
ইউপিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রধান হৃদরোগ চিকিৎসক ফজলে রাব্বী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান মুনীর চৌধুরী রয়েছেন। ঢাকার মধ্যবিত্ত এলাকা ধানম-ির বাইরে একটি ইটখোলাকে বধ্যভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। যদিও কচুরিপানার নীল-সাদা ফুল কর্দমাক্ত জলাশয়ে শোভা পাচ্ছে।
দেহগুলো এখনো সেখানে শায়িত, কাদা ও বালুতে মাখা, গলতে শুরু করেছে। ঢাকার কুকুরগুলো নাটকীয়ভাবে একটি দেহের কঙ্কাল তুলে এনে বাঁধের ওপর ফেলে রেখেছে। এই কাদার মধ্যেই বাঙালি জনতা অদ্ভুতভাবে শক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে না এখানে তারা ক্ষুব্ধ। কিন্তু অন্যত্র তারা ক্ষিপ্ত। এখানে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিড়বিড় করে কথা বলছে, যেন তারা একটি গির্জা দেখতে আসা পর্যটক।
