রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের ‘টি-গ্রোয়েন’ লাগোয়া বাবলাবন বধ্যভূমিতে একাত্তরের ২৫ নভেম্বর হত্যা করা হয় ১৭ জন খ্যাতনামা ব্যক্তিসহ অজানাসংখ্যক মুক্তিকামী মানুষকে। এত দিন সেখানে ছিল না কোনো স্মৃতিসৌধ। শুধু একটি স্মৃতিফলকই সাক্ষ্য দিত কলঙ্কিত সেই গণহত্যার। তবে এবার সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ।
সোমবার সকালে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এই স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।
উদ্বোধনের পর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি অপর্ণ করেন রাসিক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশাসহ বীর মুক্তিযোদ্ধারা। পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
এরপর বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণি-পেশার মানুষ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে সেখানে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ‘মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে এলজিইডি রাজশাহী। এ বছরেরই মার্চে কাজ শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল স্মৃতিসৌধ চত্বরে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাত্তরের বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা রাজশাহীতে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তার অন্যতম সাক্ষী পদ্মাপাড়ের টি-গ্রোয়েন লাগোয়া বাবলাবন বধ্যভূমি। বিজয়ের পরপর ৩১ ডিসেম্বর রাজশাহীর পদ্মাচর শ্রীরামপুর এলাকার এই বধ্যভূমি থেকে একই দড়িতে বাঁধা ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। বধ্যভূমির বেশির ভাগ অংশ এখন পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। তারপরও সেখানে ছুটে যান মুক্তিযোদ্ধা ও স্বজনহারা মানুষ।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ১৯৯৫ সালের ২৫ নভেম্বর বাবলাবন বধ্যভূমি স্মৃতিফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মীর আব্দুল কাইয়ুমের স্ত্রী অধ্যাপক মাসতুরা খানম। এরপর ২০১১ সালে এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কথা জানানো হয়। অবশেষে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ডা. আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজশাহী মহানগরজুড়ে যেসব বধ্যভূমি রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণের জন্য আমরা অনেক কথা বলেছি। কিন্তু আগের কোনো সরকার সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য আমরা খুশি। আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। আশা করি, রাজশাহী শহরের অন্য বধ্যভূমিগুলোও যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
