কভিড সনদের পাকে বিপদে অভিবাসী নারী শ্রমিকরা

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:১৮ এএম

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন রেকর্ড গড়ে তখন সবাই বাহবা দেয় অভিবাসী শ্রমিকদের। কিন্তু তারাই যখন বিদেশ-বিভুঁইয়ে বিপদে পড়ে তাদের সান্ত¡না দেওয়ারও কেউ থাকে না। প্রবাসী শ্রমিকদের বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজাল থেকে বের করতে শর্ত শিথিলের প্রস্তাব এক মন্ত্রণালয় থেকে আর এক মন্ত্রণালয়ে ঘুরতে থাকে। এই প্রস্তাবের মতো অভিবাসী নারী শ্রমিকদের ভাগ্যও ঘুরতে থাকে।

বাংলাদেশের প্রায় দুই লাখ নারী সৌদি আরবে কাজ করেন। সৌদির আশপাশের বিভিন্ন দেশ জর্ডান, ওমান বা লেবাননেও নারীশ্রমিকরা রয়েছেন। এসব শ্রমিকের অনেকেই ফিমেইল ডিপোর্টেশন সেন্টার বা বিভিন্ন সেইফহোমে অবস্থান করছেন। চাকরি হারিয়ে তারা এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা বাংলাদেশে ফেরার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছেন। করোনাভাইরাসের কারণে গত এপ্রিল মাস থেকে দফায় দফায় লকডাউন ও কারফিউ দেয় সৌদি আরব। এসময় বিমান চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় ফিমেল ডিপোর্টেশন সেন্টার ও সেইফ হোমে আশ্রয় নেওয়া নারীশ্রমিকরা দেশে ফিরতে পারেনি। সম্প্রতি বিমান চলাচল কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ার পর তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু যখনই তারা দেশে ফিরতে শুরু করলেন তখনই নিয়ম করা হলো নন-কোভিড সার্টিফিকেট না থাকলে তারা দেশে ফিরতে পারবেন না।

এই অবস্থায় গত ৩ ডিসেম্বর সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জানায়, লকডাউন বা কারফিউ প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশের অসহায় নারীকর্মীরা আশ্রয়ের জন্য নিয়মিতভাবে দূতাবাসে আসতে শুরু করেছেন। সৌদিআরব পরিচালিত সেইফ হোমেও বাংলাদেশি নারীশ্রমিকরা আশ্রয় নিচ্ছেন। এসব বাংলাদেশি নারী ১ মাসের বেশি সময় কোথাও কোথাও ৩ থেকে ৬ মাস ফিমেল ডিপোর্টেশন সেন্টার ও সেইফহোমে আবস্থান করছে। এসময় তারা মেডিকেল চেকআপের মধ্যেই ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে কোয়ারেন্টাইনে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশগামী বিমানে আরোহণের পূর্বে তাদের পিসিআর পরীক্ষা না করার জন্য দূতাবাস প্রস্তাব দেয়।

বাংলাদেশ দূতাবাস আরও জানায়, এসব বাংলাদেশি নারীর কোনো কাগজপত্র নেই। এ কারণে সৌদি সরকার নারীশ্রমিকদের সে দেশের সরকারি হাসপাতাল থেকে পিসিআর পরীক্ষা করতে অপারগতা জানিয়েছে। সৌদি আরবের বেসরকারি ক্লিনিক থেকে তাদের পিসিআর পরীক্ষার জন্য এক থেকে দুই হাজার সৌদি রিয়াল প্রয়োজন, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৬ হাজার টাকা। এত টাকা পরিশোধ করার সামর্থ্য এসব গৃহকর্মীর নেই। এ বিষয়ে সরকারি কোনো বরাদ্দও নেই।

সেইফহোম বা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণকারী নারীকর্মীরা গত মাসেও দূতাবাস থেকে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রত্যয়নপত্র নিয়ে পিসিআর পরীক্ষা ছাড়াই বিমানে আরোহণ করেছেন। করোনার কারণে দীর্ঘদিন আটকে থাকা নারীকর্মীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে ভিডিও প্রচার করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দূতাবাস। এতে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে বলে দূতাবাসের পত্রে উল্লেখ করা হয়। সৌদি দূতাবাস প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতেই নারীকর্মীদের দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এই ব্যবস্থা কার্যকর করা না গেলে টাকা বরাদ্দের অনুরোধ করেছেন তারা।

সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব দেওয়ার পর তারা গত ৬ ডিসেম্বর প্রস্তাবটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জানায়নি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মনিরুছ সালেহীন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ নারীশ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশে কর্মরত নারীশ্রমিকদের যদি কভিড টেস্ট করাতে হয় সেই খরচ অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে। আমাদের এসব শ্রমিক যাওয়ার সময় কল্যাণ ফান্ডে যে টাকা দিয়েছে, নিয়মিত রেমিট্যান্সে পাঠিয়ে যে উপকার করেছেএরপর কভিড টেস্টের খরচ শ্রমিকের নিকট থেকে নেওয়া উচিত নয়। কল্যাণ ফান্ডের টাকা থেকে এই টেস্ট করতে হবে। দেশে ফিরিয়ে আনার পর আইসোলেশনে মর্যাদার সঙ্গে তাদের রাখা উচিত। মর্যাদা দিতে হবে, কারণ এই মহামারীর সময় অর্থনীতির যে পিলার তা তারা শক্ত অবস্থায় রেখেছে। আর যেসব শ্রমিক জেলখানায় আছে তাদের দায়িত্ব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে। কারণ এই শ্রমিক পাঠিয়েই এজেন্সি ব্যবসা করেছে। কাজেই এর দায়িত্ব এজেন্সিকেই নিতে হবে। আগামীকাল (আজ শুক্রবার) আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। এই দিবসকে সামনে রেখে প্রতিটি বিপন্ন অভিবাসীকে আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রত্যয় থাকতে হবে। চার হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার পরও গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছেন না। এই অবস্থায় প্রবাসী শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

সুমাইয়া ইসলাম বলছেন, বাংলাদেশের নারীশ্রমিকরা সৌদি আরব যেতে চান কারণ বড় একটা অংশ যারা লেখাপড়ার সুযোগ পায়নি, যাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা অনেক বেশি দুর্বল, তারা কায়িক পরিশ্রম করে টাকা আয় করতে চায়। বাংলাদেশের গরিব অসহায় নারীদের জন্য যদি আমি শ্রমবাজার চিন্তা করি, তাহলে সেটা সৌদি শ্রমবাজার।

সুমাইয়া ইসলাম আরও বলেন, এই সেক্টরেও সরকার সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু সেটা শ্রমবান্ধব নয়। ৭০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর একটা বড় অংশ ছাড় হয়নি। এই টাকা দিয়ে কী করা যাবে তা নিয়ে যথাযথ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা জানেই না যে, তাদের জন্য ঋণের টাকা আছে। সরকারের সহায়তাটা শ্রমবান্ধব হতে হবে বলে জানিয়েছেন সুমাইয়া ইসলাম।

গত বছর সুমি আক্তার নামে পঞ্চগড়ের একজন নারী সৌদি আরব থেকে লুকিয়ে ভিডিও কল করে তাকে উদ্ধারের জন্য আকুল আবেদন জানান। সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশে বেশ তোলপাড় হয়েছে। এরপর হবিগঞ্জ জেলার আরও এক নারী একইভাবে সাহায্য চেয়েছেন। সৌদিফেরত নারীশ্রমিকদের কাছ থেকে নির্যাতনের এরকম বেশ কিছু কাহিনী প্রকাশিত হওয়ার পর সে দেশে আর নারীদের পাঠানো উচিত কি না সে নিয়ে বিতর্ক জোরদার হয়েছে।

অভিবাসন সম্পর্কে গত প্রায় তিরিশ বছরের হিসাব পাওয়া যায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে এই সময়কালে নারীশ্রমিকদের ৪০ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য জর্ডান। ২০১৫ সালে দীর্ঘদিনের কড়াকড়ি তুলে নেওয়ার পর সৌদি আরবে অনেক বেশি বাংলাদেশি নারীশ্রমিক যেতে শুরু করে। বাংলাদেশ সরকার গৃহশ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল, যার শর্ত ছিল একজন নারীশ্রমিক পাঠানো হলে দুজন পুরুষ শ্রমিক নেওয়া হবে। বলা হচ্ছে, লিখিত হলেও এই চুক্তি এখন আর মানা হচ্ছে হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস আজ

আজ আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সব সদস্যভুক্ত দেশ এ দিবসটি পালন করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর দিনটি বিশ্বব্যাপী উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যাপক হারে অভিবাসন ও বিপুলসংখ্যক অভিবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে ঘিরেই এ দিবসের উৎপত্তি। ১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদ অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং তাদের পরিবারের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রস্তাব আকারে গ্রহণ করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত