শান্তি নিকেতনে হিন্দুত্ববাদের অশুভ ছায়া

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৫৪ এএম

ভরতপুরের পাখিরালয়ের খ্যাতি দুনিয়াজুড়ে। রাজস্থানের ছোট্ট শান্ত এই জায়গা আজ বিখ্যাত হয়েছে পাখি অন্ত সালিম আলীর জন্য। পাখির প্রতি এমন ভালোবাসা ছিল সালিম আলীর যে এক দাপুটে মন্ত্রীকে একবার মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন, ‘তুমি বাপু যেই হও এক্ষুনি এখান থেকে বিদায় হও। তোমার লোক-লস্করের দাপাদাপিতে আমার পাখিরা খুব কষ্ট পাচ্ছে।’

এই ঘটনার সঙ্গে কয়েকদিন আগের ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের শান্তি নিকেতন সফরের আপাত কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি মাটির মানুষ। বঙ্গ সংস্কৃতিকে বড্ড ভালোবাসেন। তাই গেছেন রবীন্দ্রনাথের তীর্থ দেখতে। কত যতেœ মিডিয়া দেখাচ্ছিল একালের ‘লৌহমানব’ কেমন চোখ বন্ধ করে বাউল গানের সুরে তাল দিচ্ছিলেন।  ঠিক মনে নেই কবে থেকে শান্তি নিকেতন যাচ্ছি। চল্লিশ বছর তো বটেই। ট্রেন যত বোলপুরের কাছে আসত ততই যেন অন্য এক জগৎ ধরা দিত। এমনিতেই বীরভূমের প্রকৃতি খুব সুন্দর। কেমন উদাসী বাউলের মতোই সর্বত্যাগী। লাল মাটির এই রাঢ় বাংলা কেমন নিমেষে মায়ায় বেঁধে ফেলে। অজানা বাউল একতারাতে সুর ধরেছে। নির্নিমেষে তাকিয়ে আছি বাইরের পৃথিবীর দিকে। একের পর এক পার হচ্ছি ঝাপটের ঢাল, নো আদার ঢাল, ভেদিয়া...

অজয় পার হলেই বীরভূম। কখনো কখনো মনে হতো শান্তি নিকেতন যেন বীরভূমের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। তার চলনে যাপনে সংস্কৃতিতে মূলধারার বীরভূমের কোনো মিল নেই। সে বড় বেশি আলাদা। কাছের বোলপুরের সঙ্গেও তার সাংস্কৃতিক ব্যবধান চোখে পড়ার মতো। স্নব শান্তি নিকেতন যখন কিছুটা আহত করত তখন চলে যেতাম মুলুক, পালিতপুর, থুপসরা, রায়পুর বা মীর্জাপুর। শান্তি নিকেতনকে বেড় করে ঘিরে রেখেছে চমৎকার সব ছোট ছোট জনপদ। প্রান্তিক, গোয়ালপাড়া, রুপপুর।  ইলমবাজারের শালের জঙ্গল লাগোয়া এগারোমাইল খুব সুন্দর। চল্লিশ বছর আগে শ্যামবাটি হয়ে প্রান্তিক ছিল ধু ধু প্রান্তর। ছোট্ট এক চায়ের দোকানের চপ না খেলে মন খারাপ হয়ে যেত। আমার স্ত্রীর সঙ্গে শান্তি নিকেতনের সম্পর্ক আশৈশব। ফলে ওর চোখ দিয়ে দেখতে দেখতে শান্তি নিকেতন কবে কীভাবে যেন আমার কাছেও হয়ে গেল সব থেকে আপন। শান্তি নিকেতন কখনো নিছক দেখার নয়। অনুভবের। কত কত গরমে বর্ষার দিনে ও রাতে শান্তি নিকেতনকে আবিষ্কারের চেষ্টায় ঘুরে বেড়িয়েছি। কখনো চীনা ভবনে, কখনো কাচ মন্দির বা নাট্য ভবনে বা কলাভবনে।  কল্পনা করেছি প্রখর রোদে খালি গায়ে রামকিঙ্কর বেইজ আপন মনে গড়ে তুলছেন সাঁওতাল পরিবার। দরবেশের ঝোল্লা গায়ে দরবেশ ভেবে রবীন্দ্রনাথকে পয়সা দিচ্ছেন সংগীত ভবনের প্রায় কিশোর ভা-রকর। অনাদি দস্তিদার গান ধরেছেন ‘এ দিন আজি কোন ঘরেগো খুলে দিলে দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হলো কার...’

শৈলজারঞ্জন মজুমদার বড় যতেœ গান শেখাচ্ছেন তার আদরের মোহর, কনিকা বন্দ্যোপধ্যায়কে। বর্ষার বিকেলে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এক তরুণী ভিজতে ভিজতে গলা ছেড়ে গান গাইছে তা কখনো ভোলার নয়। সেন্ট্রাল অফিসের পাশের সরু গলিতে অজস্র অমলতাস। চাঁদনি রাতে ওর কাছেই পুরনো কবরখানায় গেলে গা ছমছমে ভূতের ভয়। মেলার মাঠের একদিকে পদ্ম ভবন। সেই মেলার মাঠ যা জেলখানার মতো পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন হিন্দুত্ববাদের গডফাদার সাভরকরের ভাবশিষ্য হালের উপাচার্য। সর্বত্রই এখন চিত্র বিচিত্র পাঁচিল। এ নাকি শান্তি নিকেতনের জমি যাতে দখল না হয় তার সতর্কতা। শান্তি নিকেতন এখন বড় বেশি স্ট্রাকচারাল।  আঁটোসাঁটো কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বন্ধ পাঁচিলের ওপারে রহস্যজনক কারণে ঘণ্টা তলার বেদি ও প্রাচীন গাছ কোনো অজ্ঞাত কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আসার আগে তছনছ  হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে। অনেক দূর থেকে এসে আপনি এক মিনিট রবীন্দ্র বাসভবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন কি দাঁড়াননি রে রে করে তেড়ে আসবে প্রাইভেট সিকিউরিটির মাইনে করা লোকজন। শোনা যায় প্রতিদিন দু লাখ টাকা তাদের পেছনে খরচ হয় বিশ্বভারতীর। আপনি বলতেই পারেন যে বদল অনিবার্য।  শান্তি নিকেতনেরও পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। চল্লিশ বছর কিংবা আরও পুরনো শান্তি নিকেতন হয়তো বেঁচে থাকবে স্মৃতিচারণ ও বিবিধ আখ্যানে। কিন্তু এখন যে শান্তিনিকেতন এদেশের কেন্দ্রীয় শাসকরা গড়তে চাইছেন তার সঙ্গে রবীন্দ্র ভাবাদর্শের বহুত্ববাদী ভাবনার কিছুমাত্র মিল নেই। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ভুলে গিয়েছে যে শুধু শান্তি নিকেতন নয়, সমগ্র বীরভূমের অলিগলিতে, মাঠে-ময়দানে সমন্বয়ের ভারত প্রবলভাবে জীবন্ত। সিয়ামে গেলে মকদুম শা’র মাজার পাবেন।  পাথরচুপরি জেগে ওঠে ফকিরের গানে। বাউল সুরে মাতোয়ারা হয় পৌষের সকাল বিকেল। পৌষমেলা এলেই মিলনের উৎসব। ঐতিহ্যবাহী সেই মেলা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে করোনাকালে দূরত্ব বজায় রাখার অজুহাতে। অথচ স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করছেন মাস্ক ছাড়া। কয়েক শ সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দাপটে ঘুরছেন আশ্রম প্রাঙ্গণে। ব্রাহ্ম ভাবধারার আশ্রমে মুহুর্মুহু আওয়াজ উঠছে জয় শ্রীরাম।

এ কোনো ধর্মীয় স্লোগান নয়। এ পুরোপুরি রাজনৈতিক চিৎকার। যে ধ্বনি ভারতের ১৪ শতাংশ মুসলমানের বুকের রক্ত হিম করে দেয়। আমার নিজে দেখা এই আওয়াজ দিতে দিতে কীভাবে গুজরাটে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়েছিল সংঘপরিবারের সন্ত্রাসীরা। রাজনীতির লোক শান্তি নিকেতন যাবেন এ খুব অস্বাভাবিক নয়। গান্ধীজি শান্তি নিকেতনে যেতে ভালোবাসতেন। পন্ডিত নেহরু তো আদরের ইন্দিরাকে পড়তেই পাঠিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন রাজীব গান্ধী শান্তি নিকেতন গিয়ে একবার কালো পতাকা দেখার পরেও ছাত্রদের পিঠে স্নেহের হাত রেখেছিলেন। আর এবার অমিত শাহ যাওয়ার কারণে জেড ক্যাটাগরিতে মুড়ে দেওয়া হলো রবীন্দ্রনাথের সাধের আশ্রম। উর্দিধারীদের দাপাদাপিতে শান্তি বিঘ্ন হলো শান্তি নিকেতনের। শাহেনশার নিরাপত্তায় উদ্বেগ এতটাই যে গৃহবন্দি করে রাখা হলো দুই ছাত্রকে। রাস্তার নাম বদলে করা হলো বিবেকানন্দের নামে। যার সঙ্গে সমসাময়িক হলেও কোনো সম্পর্ক ছিল না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ও তার মতাদর্শের। রবীন্দ্রনাথ আদ্যন্ত ছিলেন ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিপক্ষে। উগ্র জাতীয়তাবাদ নয়, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন আন্তর্জাতিকতাবাদে।

অস্ত্রের ঝঙ্কারে বহুত্ববাদী ভারতকে যারা হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান করে তুলতে সক্রিয়, তাদের জায়গা আর যাইহোক শান্তি নিকেতন হতে পারে না। হতে পারে সালিম আলীর মতো খুব কম লোক এখন আছেন যারা মেরুদণ্ড সোজা করে প্রভাবশালী মন্ত্রীকে বলতে পারেন ‘বাপু হে তুমি যেই হও এখান থেকে যাও’। এখনকার শাসকরা এমন সংবেদী নন বললেই তারা নীরবে চলে যাবেন। ফলে তাদের ভাষাতেই তাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মনে রাখবেন রবীন্দ্রনাথের কথা ‘শতাব্দীর সূর্য আজি রক্ত মেঘ মাঝে অস্ত গেল, হিংসার উৎসবে আজি বাজে অস্ত্রে অস্ত্রে মরণের উন্মাদ রাগিণী ভয়ংকর’।

লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত