করোনা, ভ্যাকসিন রাজনীতি ও জনস্বাস্থ্যর সুরক্ষার প্রশ্ন

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০৬ এএম

বলা হচ্ছে বাংলাদেশেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। প্রথম ঢেউয়ের বিপর্যয় সামাল দিতে না দিতেই আমরা আবারও বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত হয়েছি। সরকারি ভাষ্যেই এখন প্রতিদিন করোনা সংক্রমণে গড় মৃত্যু ৩০-এর অধিক; আর শনাক্ত দেড় হাজারের বেশি। আগামী ক’মাস এই গুরুতর পরিস্থিতি অব্যাহত থাকারই আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এ ধরনের পরিস্থিতির শঙ্কা প্রকাশ করে সরকারকে বারবার সতর্ক করলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সমন্বিত সার্বিক তৎপরতা দেখা যায়নি। দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের পরও দশ মাস পার হয়েছে। কিন্তু করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা এখনো গড়ে তোলা হয়নি। আমাদের উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্য-চিকিৎসার যে অবকাঠামো রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করেই সারা দেশে এই মহামারীজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত; আমাদের ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা সংক্রান্ত টেকনিশিয়ানসহ যে পরিমাণ প্রশিক্ষিত জনশক্তি ছিল তাকেও এ পর্যন্ত যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশে করোনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপগুলো এখনো নেওয়া হচ্ছে প্রধানত রাজনৈতিক বিবেচনায়, প্রশাসনিকভাবে। এ সংক্রান্ত সরকারি পরামর্শক কমিটিগুলোর তৎপরতা ও সুপারিশ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এসব কমিটির  মতামত ও পরামর্শগুলো বিবেচনায় ও আমলে নেওয়া হচ্ছে একরকম কোনো আলামতও দেখা যাচ্ছে না। প্রায় বছর গড়িয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ, পরীক্ষা ও চিকিৎসায় রয়েছে সমন্বয়হীনতা, অব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও সর্বোপরি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এক বেহালদশা। করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসাসহ গোটা ব্যবস্থার ওপরই এখনো রয়েছে এক অভূতপূর্ব গণ-অনাস্থা ও গণনৈরাশ্য। হাসপাতালগুলোকেই এখন বিস্ময়করভাবে অনিরাপদ মনে করা হচ্ছে। একান্ত বাধ্য না হলে বা জীবনাশঙ্কা না থাকলে মানুষ হাসপাতালে যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভুল চিকিৎসা আর ব্যয়বহুল চিকিৎসা। চিকিৎসার এই বিশাল ব্যয়ভারের আতঙ্কেও মানুষ হাসপাতালবিমুখ হয়ে পড়েছে।

দুনিয়ার অন্যান্য দেশের মতো এই মহামারী আমাদের সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভয়ংকর ও দুর্বল ব্যবস্থাকে একেবারে উদোম করে দিয়েছে সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় কতিপয় কথিত হাসপাতালকে লাইসেন্স ছাড়াই করোনা পরীক্ষার অনুমোদন, করোনার হাজার হাজার ভুয়া রিপোর্ট, করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কেনাকাটায় সীমাহীন জালিয়াতি, দুর্নীতি, আইসিইউসহ চিকিৎসা সরঞ্জামাদি নিয়ে প্রায় অবিশ্বাস্যরকম ব্যবসা ও স্বেচ্ছাচারিতা, রাতারাতি কতিপয় হাসপাতাল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রভৃতি অনাচার এখনো আমাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হয়েই আছে। এতসব ঘটনার পরও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়নি; বহাল তবিয়তে আছেন গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ কর্মকর্তারা। আমাদের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে দায় নেওয়ার কোনো সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। করোনা দুর্যোগেও নজিরবিহীন দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার জন্য কাউকে বিশেষ কোনো দায়দায়িত্ব নিতে হয়নি। মিডিয়ায় আলোচিত দুই/তিনটি ঘটনা যে গোটা চিত্রের খন্ডাংশ মাত্র সচেতন যে কেউই তা বুঝতে পারেন।

দেশের আইন প্রণয়ন বিভাগ তথা জাতীয় সংসদের দিক থেকে এসব বিষয় দেখভালের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্বাস্থ্য বিষয়ক সংসদীয় কমিটি রয়েছে। কিন্তু গত ৯ মাসে এই সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির একটি মিটিং করারও প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। কেন তারা একটি বৈঠকও করলেন না, তাহলে এই ধরনের কমিটির উপযোগিতা ও প্রয়োজনটাই বা কী এসব প্রশ্ন কারা উত্থাপন করবে? অনুমান করা যায় এই ব্যাপারে কমিটির সদস্যরা তাদের মাসিক পারিতোষিক নিতে নিশ্চয়ই অনীহা দেখাননি। এত বড় একটি বৈশ্বিক ও জাতীয় দুর্যোগে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি যদি তাদের ন্যূনতম সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে বাকি কমিটিগুলোর কী দশা তা অনুমান করা কঠিন নয়। এখন শুরু হয়েছে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে মাতামাতি। এই মাতামাতি নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় সন্দেহ নেই। ভ্যাকসিনকে কেন্দ্র করে রাজনীতি-রাজনৈতিক অর্থনৈতিক তৎপরতাও প্রবল। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এই ব্যবসা কারা নিয়ন্ত্রণ করবে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান এর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে তা নিয়ে ইতিমধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’ শব্দগুচ্ছও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। ধনী দেশগুলো বিশাল অংকের অর্থ দিয়ে আগেভাগেই ভ্যাকসিন ‘বুক’ করে রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ক’টি দেশে ইতিমধ্যে এর প্রয়োগও শুরু হয়েছে। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে উৎসাহব্যঞ্জক নানা দাবি করা হলেও কার্যকারিতার বাস্তব প্রমাণ পেতে বিশ্বের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আর ভ্যাকসিন কারা আগে পাবে তা নিয়ে স্পষ্টতই রয়েছে শ্রেণিপক্ষপাত আর নানা ধরনের বাছবিচার। মানুষকে কিনে ভ্যাকসিন নিতে হলে স্বল্পআয়ের গরিব মানুষ যে প্রান্তিক অবস্থায় থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই বড় প্রচার যে, শ্রমজীবী-মেহনতি স্বল্পআয়ের মানুষের রয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। এর অর্থ হচ্ছে শ্রমজীবী-মেহনতি সাধারণ মানুষের দেরিতে ভ্যাকসিন পেলে, এমনকি তাদের ভ্যাকসিন না পেলেও বড় কোনো ক্ষতি হবে না এই ধরণের ভয়ংকর মনোভাব।

বাংলাদেশ কীভাবে ভ্যাকসিন আমদানি করবে, ট্রায়াল বা প্রয়োগ করবে এখনো এই ব্যাপারে দেশের নাগরিকদের সুস্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। এই ব্যাপারে রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। অপ্রকাশ্য কোনো চাপ বা দায় থেকে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ারও সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বিশেষ বাস্তবতায় এখানকার আবহাওয়া, পরিবেশ, বিশেষ করে এখানে ভাইরাসের জিনগত বিবর্তন মাথায় রেখে কোন কোন ভ্যাকসিন আমাদের জন্য বেশি উপযোগী হতে পারে- সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত মতামতের মাধ্যমেই এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভ্যাকসিন আমদানি ও বিনামূল্যে সবার জন্য সহজলভ্য করা জরুরি। বাস্তবে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন কবে আমদানি ও ব্যবহার করা যাবে সে অপেক্ষায় থেকে ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় এখনকার জরুরি কাজগুলোকে ছত্রভঙ্গ ও বেহাল অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না। তাহলে আগামী ক’মাসে আমাদের অকালে আরও অসংখ্য প্রাণ হারাতে হবে। বিনামূল্যে জনগণকে, বিশেষ করে স্বল্পআয়ের মানুষকে মাস্ক সরবরাহ করা, বিনা পয়সায় করোনার পরীক্ষার পরিধি বৃদ্ধি, দ্রুততম সময়ে নমুনা প্রদান ও রিপোর্ট দেওয়া, সারা দেশে হাসপাতালে আইসিইউ শয্যাবৃদ্ধি, অক্সিজেন প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসহ চিকিৎসা ও হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার কার্যকর পরিবর্তন ঘটানো জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সংবেদনশীলতা থাকলে তুলনামূলকভাবে স্বল্প সম্পদ ও জনবল নিয়েও যে করোনা মহামারীর মতো দুর্যোগ সফলভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব পাশের দেশ ভারতের কেরালা রাজ্য, ভিয়েতনামসহ আরও কিছু স্বল্প আয়ের দেশ তা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে। এটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, আমাদের আরও বহুদিন কভিড ভাইরাসের সঙ্গে বসবাস করতে হবে। আগামীতে এই ধরনের প্রাণঘাতী নতুন নতুন ভাইরাসের মুখোমুখি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যমান নানা ধরনের রোগবালাই। জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে কীভাবে আমরা এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাব এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সুস্থ মানুষকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাব্যবস্থার দর্শন ও কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবাকে মুনাফার পণ্য হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো। চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিদ্যমান নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতা দূরীকরণে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া।

দুনিয়ার উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও করোনা দুর্যোগ বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থা, বিশ্বমানের আধুনিক হাসপাতালগুলোর অকার্যকারিতা ও অসহায়ত্ব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বাস্তবে করোনা মোকাবিলায় ব্যয়বহুল এসব আধুনিক হাসপাতাল তেমন কোনো কাজে লাগেনি। করোনা মহামারী বিদ্যমান পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার আত্মঘাতী প্রবণতাই কেবল তুলে ধরেনি, একই সঙ্গে তা উগ্র মুনাফালোভী পুঁজিতন্ত্রের গণস্বাস্থ্যবিরোধী নিষ্ঠুর ও অমানবিক চেহারাকেও নগ্ন করে দিয়েছে; খোলাসা করে দিয়েছে বিদ্যমান সভ্যতা ও উন্নয়নের স্ববিরোধিতাগুলোকে। নতুন নতুন ভাইরাসসহ এইসব সংকটের গভীরতা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা, বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান, গণস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত অবকাঠামো সক্রিয় করা এবং সর্বোপরি দেশের প্রত্যেক মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনকে মূল্যবান মনে করে যাবতীয় পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে দেশজুড়ে গণস্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি।

লেখক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত