যুক্তরাজ্য থেকে ফিরলেই ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:৪০ এএম

যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে ওই দেশ থেকে কেউ বাংলাদেশে এলে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল এ বৈঠকে গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মন্ত্রীরা যোগ দেন।

যুক্তরাজ্যফেরতদের কোয়ারেন্টাইন ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর  হবে। গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘যুক্তরাজ্য থেকে যারা আসবেন তাদের কঠোর কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। লন্ডন থেকে আসা যাত্রীদের ক্ষেত্রে দুটি অপশন ছিল। এর একটি হচ্ছে লন্ডন থেকে যাত্রী আসা বন্ধ করা, অন্যটি হচ্ছে যাত্রীদের কঠোর কোয়ারেন্টাইনে রাখা। শেষ পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। লন্ডন ফ্লাইটে যেই আসুক তার করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট থাকলেও তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। দিয়াবাড়ী ও হজক্যাম্পে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা আছে। কিছু হোটেলের ব্যবস্থা রাখা হবে।’

মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে হোটেলে যেভাবে থাকে সেভাবেই কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘কেউ লন্ডন থেকে সিলেটে এলে তাকে সিলেটে, কেউ চট্টগ্রামে এলে চট্টগ্রামে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। লন্ডন থেকে আসা যাত্রীদের দুটো বিকল্প দেওয়া হবে। দিয়াবাড়ী আর হজক্যাম্পে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে অথবা হোটেলে নিজস্ব খরচে কোয়ারেন্টাইন।’

তিনি আড়াই হাজার মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা সরকারের আছে বলে জানালে এক সাংবাদিক জানতে চান, এ সংখ্যাটা যথেষ্ট কি না? জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এগুলোর সঙ্গে কয়েকটা হোটেল সংযুক্ত করা হবে।

করোনাভাইরাস মহামারীর প্রায় এক বছরের মাথায় যুক্তরাজ্যে ভাইরাসটির নতুন একটি ধরন সম্প্রতি শনাক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশ দেশটির সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের নিয়ে দেরিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে কি না সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা প্রটোকল মানার চেষ্টা করছি।

যুক্তরাজ্যফেরত যাত্রীদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখা ছাড়াও গতকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে হজ ও ওমরাহবিষয়ক আইনের খসড়ার নীতিগত, ‘মহাসড়ক আইন, ২০২০’-এর নীতিগত ‘মহাসড়ক ল্যান্ডস্কেপিং নীতিমালা-২০২০’-এর খসড়া এবং ‘মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২০’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

হজ-ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় আইন হচ্ছে : নীতিমালার পরিবর্তে হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন করছে সরকার। এজন্য ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২০’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, এতদিন পর্যন্ত হজ ব্যবস্থাপনাটা চলত একটা নীতিমালার মাধ্যমে। নীতিমালার মাধ্যমে চলার কারণে কিছু অসুবিধা হতো, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেত না। ব্যবস্থা নিলে হজ ও ওমরাহ এজেন্সি হাইকোর্টে গিয়ে রিট করে এগুলোর বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসত।

২০১১ সালে সৌদি আরব হজ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে। এর আলোকে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আইন করেছে। হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশেরও একটি আইনি কাঠামো দরকার ছিল। ২০১২ সালে মন্ত্রিসভা এ সংক্রান্ত আইন করার নির্দেশনা দেয়। এর আলোকেই ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া করেছে। আইনের উদ্দেশ্য পূরণে হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকবে। সরকার হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনার জন্য সৌদি সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি, সমঝোতা ও সম্মতিক্রমে সৌদি আরবের যেকোনো স্থানে হজ অফিস স্থাপন ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে। এ আইনের অধীনে নিবন্ধন ছাড়া কেউ হজে যেতে পারবেন না।

তিনি জানান, নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ যদি দেখে কেউ অনিয়ম করছে তবে উপযুক্ত তদন্ত ও শুনানি করে হজ ও ওমরাহ এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। সরকার দৈব-দুর্বিপাক, মৃত্যু, দুর্ঘটনা, হজযাত্রীদের আকস্মিক প্রয়োজন পূরণ ও অপ্রত্যাশিত ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি আপৎকালীন তহবিল গঠন করবে। হজের চুক্তি এখানে হওয়ার পর কেউ গিয়ে যদি ওই সৌদি আরবে ঠকায় সেই অপরাধ এখানে করা হয়েছে বলে গণ্য হবে। সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল বা লিগ্যাল বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাকশন নেওয়া যাবে। অনিয়মের জন্য হজ এজেন্সির নিবন্ধন বাতিল করা যাবে এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। ওমরাহ এজেন্সির ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিল ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। ফৌজদারি অপরাধ করলে পেনাল কোড বা অন্যান্য আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আর অপরাধের জন্য কোনো হজ এজেন্সিকে যদি পরপর দুই বছর সতর্ক করা হয় তাহলে লাইসেন্স দুই বছরের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত থাকবে।

গ্যাসলাইনের জন্য টাঙ্গাইলে কাটা পড়বে ১১ হাজার গাছ : গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনের জন্য টাঙ্গাইলে কাটা পড়বে সংরক্ষিত বনের ১১ হাজার ২৪৬টি গাছ। এ গাছ কাটার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ধনুয়া-এলেঙ্গা এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়-নলকা গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য টাঙ্গাইল জেলার ৫৩ দশমিক ১৫ একর বনভূমিতে বিদ্যমান গাছপালা কর্তন এবং অপসারণের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড-জিটিসিএল। সংরক্ষিত বনের মধ্যে গাছ কাটার বিষয়ে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

অনুমতি ছাড়া মহাসড়কে বিলবোর্ড ও তোরণ টাঙালে জরিমানা : মহাসড়ক নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ যান চলাচলের জন্য নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ আইন পাস হলে অনুমতি ছাড়া মহাসড়কে বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড বা তোরণ টাঙালে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। আর মহাসড়কের সংরক্ষণ রেখার মধ্যে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করলে দুই বছরের কারাদন্ডের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এসব বিধান রেখে ‘মহাসড়ক আইন, ২০২০’-এর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘১৯২৫ সালের হাইওয়ে অ্যাক্ট বাদ দিয়ে মহাসড়ক, নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তাবিত আইন করা হচ্ছে। এতে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদে যান চলাচল করতে পারবে। মহাসড়কের ক্ষতি কমিয়ে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং যানবাহন চলাচলের গতিশীলতা নিশ্চিত করতে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মহাসড়কের একটা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড আছে যে কত স্পিডে গাড়ি চলতে পারবে। সে ক্ষেত্রে আমরা যদি নিয়ন্ত্রণ না করি এবং ফ্যাসিলিটিজ মানুষকে না দিই, তাহলে এ মহাসড়ক ব্যবস্থা ঠিকভাবে চালানো সম্ভব হবে না। মহাসড়কে মাঝেমধ্যে আন্ডারপাস করা হবে, সেখান দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সিএনজি, রিকশা চলাচল করতে পারবে। সব জায়গায় আন্ডারপাসের ব্যবস্থা থাকবে না, সে ক্ষেত্রে ওভারপাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। মহাসড়কের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে ফুয়েল স্টেশন এবং বিশ্রামাগার রাখতে হবে।’

গতিসীমার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাইওয়ে করলে ৮৫ কিলোমিটার গতি নিশ্চিত করতে হবে। এটা আইনে বলা নেই, এটা নির্ভর করবে সড়কটি কোন এলাকায় হচ্ছে, তার ওপর। মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলতে পারবে না। পাশের সার্ভিস লেনে সেসব যানবাহন চলবে।’ মহাসড়কগুলোর মাঝখানে ডিভাইডার থাকবে বলে দুর্ঘটনার হার কমবে বলে আশাবাদী মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

তিনি জানান, মহাসড়কের পাশে অবকাঠামো নির্মাণ করলে ফসল, খড় বা পণ্য রোদে দিলে, ক্রসিং এরিয়া বাদে অন্য জায়গা দিয়ে হাঁটলে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। অধিদপ্তরের বিনা অনুমতিতে বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, তোরণ বা এ ধরনের কিছু মহাসড়কে টাঙালে এবং ধীরগতির যানবাহনগুলো নির্ধারিত লেন ছাড়া মহাসড়কে উঠলে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে। মহাসড়কের সংরক্ষণ রেখার মধ্যে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করলে দুই বছরের কারাদ- বা স্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা আর অস্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে অনধিক ৫০ হাজার টাকা দন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।

মহাসড়কের পাশের জমি ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা অনুমোদন : মহাসড়কের পাশের জমির ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার জন্য ‘সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ‘মহাসড়ক ল্যান্ডস্কেপিং নীতিমালা-২০২০’ অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, মহাসড়কের পাশে যে জমিজমা থাকবে সেগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, পরিকল্পনা অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হ্রাস করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এই নীতিমালা।

মোংলা বন্দর পরিচালনায় প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া যাবে

মোংলা বন্দরের স্থাপনা ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রেখে ‘মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২০’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মোংলা পোর্ট অথরিটি অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬-এর পরিবর্তে নতুন এই আইন করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত