একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেশব্যাপী ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উদযাপন করেছে আওয়ামী লীগ। গতকাল বুধবার দিনটি উপলক্ষে আনন্দ ও বিজয় শোভাযাত্রা, সমাবেশ এবং আলোচনা সভাসহ দিনভর নানা কর্মসূচি পালন করেছে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো। এসব কর্মসূচিতে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশের ‘উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা’ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গতকাল বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বিএনপি। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করে দলটি। এ সময় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০২১ সালে সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশায় জনঐক্যের সংকল্প ব্যক্ত করেন। গতকাল সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র উন্নয়নের ইতিহাসে একটি বিজয়ের মাইলফলক। জনগণের পবিত্র ইচ্ছার প্রতিফলন সংবিধান রক্ষার দিন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তি দুর্নীতি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকদের আস্ফালন আর সহিংস রাজনীতির কালো ছায়া কাটিয়ে গণতন্ত্রের নবতর অভিযাত্রায় অগ্রসর হয় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।’ সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ দিবসটি পালন উপলক্ষে গতকাল বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করে। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। আগামী নির্বাচনের আগেই পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচল করা যাবে। এ কথা জানতে পেরে দেশের বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র শুরু করেছে স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত শক্তি।’ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, সদস্য আবদুল আউয়াল শামীম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নুরুল আমিন রুহুল, শহীদ সেরনিয়াবাত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ কামাল, মহিউদ্দিন মহি, দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ, সদস্য অপু বড়ুয়া প্রমুখ।
কৃষক লীগের শোভাযাত্রা : ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ সমাবেশ ও বর্ণাঢ্যা শোভাযাত্রার মাধ্যমে উদযাপন করেছে কৃষক লীগ। গতকাল সকালে শোভাযাত্রাটি ২৩, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে শুরু করে নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জাতীয় প্রেস ক্লাব হয়ে পুনরায় ২৩, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এসে শেষ হয়। কৃষক লীগের সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ ও সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি এমপি গণতন্ত্রের বিজয় দিবসের শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব প্রদান করেন।
যুবলীগের সমাবেশ : ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উপলক্ষে আওয়ামী যুবলীগের উদ্যাগে আনন্দ সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। আনন্দ মিছিল-পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন প্রেসিডিয়াম সদস্য হাবিবুর রহমান, এনামুল হক খান, মোয়াজ্জেম হোসেন, তাজউদ্দিন আহমেদ, জসিম মাতুব্বর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মাজহারুল ইসলাম, ডা. হেলাল উদ্দিন, জহির উদ্দিন খসরু, মশিউর রহমান চপল, শামীম আল সাইফুল সোহাগ প্রমুখ।
স্বেচ্ছাসেবক লীগের আলোচনা সভা : ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবক লীগ। রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমার মিলনায়তনে আলোচনা সভাটি হয়। সংগঠনের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান।
ছাত্রলীগের আনন্দ র্যালি : ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উপলক্ষে আনন্দ ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বেলা সাড়ে ১১টায় শোভাযাত্রাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে কলাভবন, ভিসি চত্বর, টিএসসি, রাজু ভাস্কর্যসহ ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব প্রদান করেন।
সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশায় জনঐক্যের সংকল্প মির্জা ফখরুলের : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গতকাল বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বিএনপি। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করে দলটি। এ সময় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০২১ সালে সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশায় জনঐক্যের সংকল্প ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘২০২০ শেষ হচ্ছে। আগামী বছরের আসুন আমাদের সবার একটাই সংকল্প হবে, শপথ হবে ঐক্য। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দানবীয়, স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করি।’
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এ বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। সকাল ১০টায় নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে হাজির হন। পুলিশ মৎস্য ভবন, তোপখানা সড়কের মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে নেতাকর্মীদের আসতে বাধা প্রদান করে। সমাবেশ উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের চারপাশ বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে সন্ধ্যায় দলটির সহ-দপ্তর সম্পাদক বেলাল আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে পুলিশ বিএনপির ৫০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া ৭০ নেতাকর্মীকে পুলিশ পিটিয়ে আহত করেছে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করেছেন মির্জা ফখরুল।
সমাবেশে সরকারবিরোধী অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এখন আমাদের এক হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন এ গণতন্ত্রকে উদ্ধারের যে সংগ্রাম, এ সংগ্রাম শুধু একা বিএনপির নয়। সব রাজনৈতিক দল, সব মানুষকে আজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এ সরকারকে সরিয়ে সত্যিকার অর্থেই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অবশ্যই একটা জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
সমাবেশে আসার পথে বিভিন্ন স্থানে দলের নেতাকর্মীদের পুলিশি বাধা প্রদান ও গ্রেপ্তারের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের খুব দুঃখ হয়, লজ্জায় হয় যখন দেখি আমাদের আজকের এ সমাবেশ আসতে বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। যখন দেখি এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে অসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আর লজ্জায় হয় যখন দেখি এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলছেন যে, “তারা গণতন্ত্র দিয়েছেন বলেই নাকি দেশ খুব ভালো চলছে”।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের এ দিনটি হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় একটি দিন। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য। সেই আকাক্সক্ষা সেই চেতনাকে ধ্বংস করে দিয়ে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে একটা প্রশাসনের জোরে নির্বাচন করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে। এ দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার ও কলঙ্কের একটা দিন।’
বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। সভা পরিচালনা করেন দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার ও উত্তরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলীম নকি। বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
রাজধানীতে ছাত্রদলের মিছিল : জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে মিছিল করেছে ছাত্রদল। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। এ সময় তারা ভোট ডাকাতির প্রতিবাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
