বাজারে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ওঠায় সরবরাহ সংকট দূর হয়েছে। সপ্তাহ ব্যবধানে দামেও বিস্তর ফারাক এসেছে। ভালো দাম ও সরকারি প্রণোদনায় উৎসাহ নিয়ে কৃষকরা শীতকালীন পেঁয়াজ বুনছেন। এরই মধ্যে ভারত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় প্রায় সাড়ে ৩ মাস পর গতকাল শনিবার থেকে দেশটির পেঁয়াজ বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করেছে। ভরা মৌসুমে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বিবেচনা করে কৃষি মন্ত্রণালয় আমদানি অনুমোদন (আইপি) দিতে চাইছে না। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আজ রবিবার সচিবালয়ে বৈঠক করবে তারা। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মন্ত্রণালয় সরবরাহ পরিস্থিতি যাচাই করতে চাইছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন মুড়িকাটা দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করেছে। দামও কমছে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সরবরাহ বাড়বে। মার্চে শীতকালীন পেঁয়াজও বাজারে আসবে। এমন অবস্থায় পেঁয়াজ আমদানির কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। এতে দেশের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ (গতকাল) থেকে যেসব পেঁয়াজ আসছে, সেগুলো পুরনো আইপির অধীনে। রবিবারের বৈঠকে আমরা আমদানি না করার পক্ষে মত দেব। বাকিটা সরকারের বিষয়।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পচনসহ বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা আনুমানিক ৩৫ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হয়েছিল ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়, যার অধিকাংশ ভারত থেকে আসে। গত দুই বছরে ভারত অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকট দেখিয়ে পূর্বঘোষণা ছাড়া পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এরই প্রভাবে দেশীয় বাজারে পণ্যটির দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম চড়েছিল ২৬০ টাকা পর্যন্ত। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা ছাড়ালে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার মিয়ানমার, চীন, তুরস্ক ও মিসর থেকে জরুরি ভিত্তিতে আমদানি করে। খোলাবাজারেও পেঁয়াজ বিক্রি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
ভারতের এমন আচরণে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। এরই অংশ হিসেবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৯ লাখ ৪৬ হাজার পেঁয়াজ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ৩ লাখ টন পেঁয়াজ বেশি আসবে। বাকি প্রায় ১ লাখ টন আসবে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে। এ জন্য ৫০ হাজার কৃষককে সরকার ২৫ কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছে।
বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসার পর তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ায় খুশি কৃষকরা। এরই মধ্যে হঠাৎ ভারতের পেঁয়াজ আমদানি নিয়ে তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ভর করেছে। ফরিদপুরের পেঁয়াজচাষি মন্টু মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের কেজি এখন ২৬-২৭ টাকা। খুচরায় ৪০ টাকাই পাওয়া যায়। এই দাম তো বেশি না। তাইলে কেন আমদানি করতে হবে? ভারতের পেঁয়াজ বাজারে ঢুকলে ২০১৯ সালের মতো আমাদের ৬-৭ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হবে।’
বাজারে পেঁয়াজ সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন রাজধানীর সবচেয়ে বড় আড়ত শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, আমদানি হবে এমন খবরেই কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম পাইকারিতে ২৮ টাকায় নেমে এসেছে। আমদানি পেঁয়াজ বাজারে ঢুকলে দাম আরও কমবে। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ জন্য আগামী জুলাই পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা অথবা অতিরিক্ত শুল্কারোপের কথা জানান তারা।
এই বাজারের বণিক সমিতির সহসভাপতি আবদুল মাজেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে এখন এত পেঁয়াজ, ক্রেতা পাচ্ছি না। ২৮ টাকা করে পাইকারিতে বিক্রি করতেছি। আর কত দাম কমাব? তাইলে তো কৃষক মরে যাবেন। এখন থেকে জুলাই পর্যন্ত পেঁয়াজ আনার কোনো দরকার নাই। তারপরও সরকার চাইলে আনতে পারে। কিন্তু তাতে কৃষকের অনেক বড় ক্ষতি হবে।’
নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসায় দাম কমার পরও আমদানির প্রয়োজন ছিল কি না, জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। আমরা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্য। চাইলেই আমদানি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারি না। আগে বাজারে সরবরাহ কেমন আছে, সেটা দেখব। ভারতে কেমন সরবরাহ আছে, সেটিও দেখব। আমার ধারণা, তাদেরও তেমন মজুদ নাই। রবিবার এ নিয়ে একটি বৈঠক করব। বুঝেশুনেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
দেশে এসেছে ভারতীয় পেঁয়াজ: গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর বন্দরে আটকে থাকা কিছু পেঁয়াজ দেশে আসে। নতুন করে ভারত কোনো রপ্তানি করেনি। গত সোমবার ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর এক আদেশে বলেছে, ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরনের পেঁয়াজের ক্ষেত্রে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলো।
এ সিদ্ধান্তের পর গতকাল থেকে দিনাজপুরের হিলি, সাতক্ষীরার ভোমরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা গত ৩ মাসে যেসব আইপি অনুমোদন দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ভারতীয় পেঁয়াজ নেই। মূলত সেপ্টেম্বরের আগে যেসব আইপি ছিল, সেগুলোর অধীনে পেঁয়াজ আসছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে গতকাল বিকেলে পেঁয়াজের প্রথম চালান আসে। এদিন মোট ৪ ট্রাক পেঁয়াজ এসেছে, আরও কয়েকটি ট্রাক ভারতের অংশে অপেক্ষায় রয়েছে। রবিবার এগুলো আসবে।
দিনাজপুরের হাকিমপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ১৯ টন পেঁয়াজ নিয়ে একটি ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর আর কোনো পেঁয়াজ আসেনি। ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানিতে দেশের বাজারে বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর রশীদ।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভোমরা বন্দর দিয়ে গতকাল ৯টি ট্রাকে ২৪২ টন পেঁয়াজ এসেছে। বন্দরের ভারতীয় অংশে ২০-২৫টি ট্রাক অপেক্ষায় রয়েছে। গত মৌসুমে এসব পেঁয়াজের আইপি নেওয়া হয়েছিল।
এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সাতক্ষীরা, হাকিমপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
