চাল আমদানিতে শুল্ক জটিলতা

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:২২ এএম

চালের বাজারে অস্থিরতা শুরু হলে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলোর ওপরও আর্থিক চাপ বাড়তে শুরু করে। কভিড-১৯ মহামারী অব্যাহত থাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়েছে কিংবা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছে। চালের মূল্যবৃদ্ধির আংশিক কারণ সরকারি গুদামে চালের মজুদ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেক কম। এখন দেশি ও বিদেশি উভয় উৎস থেকেই সরকারি মজুদ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সরকার চাল আমদানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েই শুধু বসে নেই, উপরন্তু চালের আমদানি শুল্কও হ্রাস করেছে উল্লেখযোগ্য হারে। কিন্তু ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্তের পরও শুল্কায়নমূল্য ও কম শুল্কে চাল ছাড় দেওয়ার আদেশের কপি নিয়ে জটিলতার কারণে তিন দিন ধরে দিনাজপুরের হিলি বন্দরে বিপুল পরিমাণ চাল আটকে থাকার যে খবর মিলেছে, তা স্বস্তিদায়ক সংবাদ নয়। 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বাজারে চালের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে চাল আমদানির অনুমতির পর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে এ খাদ্যপণ্যের আমদানি শুরু হয়েছে। কিন্তু শুল্কায়নমূল্য ও কম শুল্কে চাল ছাড় দেওয়ার আদেশের কপি নিয়ে জটিলতার কারণে তিন দিন ধরে বন্দরে আটকে আছে ১ হাজার ২৬৯ টন চাল। জানা যায়, বাড়তি শুল্ক আরোপ থাকায় দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকার পর গত শনিবার বন্দর দিয়ে প্রথম চালান হিসেবে আমদানিকারকের তিনটি ট্রাকে ১১২ টন চাল দেশে প্রবেশ করে। পরদিন রবিবার বন্দর দিয়ে আসে ৮২৮ টন চাল।  এছাড়া গত সোমবার বিকেলে বন্দর দিয়ে দেশে এসেছে উল্লিখিত দুই আমদানিকারকের ৩২৯ টন চাল। কিন্তু সব চালই আটকে আছে শুল্কায়নের জটিলতায়।

সরকারি তথ্যানুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে সরকার সাড়ে ৮ লাখ টন আমন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এর মধ্যে রয়েছে দুই লাখ টন ধান, ছয় লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল। গত ৭ নভেম্বর থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২৩ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সরকার ১৩ হাজার ৫৬৭ টন আমন সেদ্ধ চাল, ৪৪৮ টন আতপ চাল এবং ৩০৬ টন আমন ধান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। সব মিলিয়ে চালের আকারে সংগ্রহ হয়েছে ১৪ হাজার ২২৯ টন। মৌসুম শেষে এর পরিমাণ লাখ টন ছাড়াবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর আগে গত বোরো মৌসুমে সরকার ৮ লাখ টন ধান কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু কিনতে পেরেছে মাত্র ২ দশমিক ২ লাখ টন। এবার বোরো মৌসুমে বন্যায় ধান উৎপাদন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেকে আশা করেছিল যে আমন মৌসুমের এ উৎপাদন দিয়ে ঘাটতি মেটানো যাবে। কিন্তু এই মৌসুমেও ধানের ফলন আশানুরূপ না হওয়ায় ঘাটতি পূরণে সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

অপরদিকে জানা যায়, আমন মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে মিলারদের থেকে সরকার চাল কেনার প্রস্তাব দেয়। এই দামে চাল দিলে লোকসান হবে এমন অজুহাতে কোনো মিল মালিক সরকারকে চাল দেয়নি। এমনকি বোরো মৌসুমে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও অধিকাংশ চালকল মালিক সরকারকে চাল দেয়নি। এতে খাদ্য অধিদপ্তরের গুদাম ফাঁকা হতে শুরু করে। এ জন্যই বাজারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোটা-চিকন সব ধরনের চালের দাম। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে সরকার দেড় লাখ টন চাল আমদানি করেছে। আরও ৪ লাখ টন চাল আমদানির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সম্প্রতি অল্প সময়ের ব্যবধানে ভারতে রপ্তানিযোগ্য চালের দাম টনে সর্বোচ্চ ২ ডলার বেড়েছে। এমতাবস্থায় এই বছরে চালের বাজার আরও অস্থিতিশীল হতে পারে এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞসহ অনেকেই। 

মনে রাখতে হবে, বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আট লাখ টন চাল কম উৎপাদন হয়। সেই ঘাটতি পূরণে সরকার চালের আমদানি শুল্ক ২ শতাংশে নামিয়ে আনে। আমদানি হয় ৪২ লাখ টন চাল। এর প্রভাবে অবশ্য পরের বছর ধানের দাম কমে গিয়ে লোকসানে পড়েন কৃষকরা। তাই এবারও সেই সংকটের পুনরাবৃত্তির যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তা যেকোনো উপায়েই রোধ করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে চাল আমদানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার পরও তা যদি শুল্কায়নের জটিলতায় আটকে থাকে, তাহলে চালের বাজার আরও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।  এক্ষেত্রে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করতে হবে।  বেসরকারিভাবে চাল আমদানিকারকদের স্বার্থ যেমন দেখতে হবে, তেমনি তারা যেন বিভিন্ন মূল্যে চাল আমদানি করে চাল নিয়ে তেলেসমাতি না করতে পারে, সেটাও তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে এবং সরকারি গুদামে প্রয়োজনীয় ধান-চাল মজুদ করেই বাজার স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত