নদী-দখলদার উচ্ছেদে অভিযান জোরদার হোক

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২১, ১০:২৯ পিএম

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের নদ-নদী-জলাশয় বাঁচানোর ক্ষেত্রে একটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির বিবেচনায় ২০১৯ সাল উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে। সে বছর তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’, ‘আইনি ব্যক্তি’ ও ‘আইনি সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ এক যুগান্তকারী ঘটনা। এ রায়ের ফলে দেশের সব নদ-নদী-খাল-বিল-জলাশয়ও পরস্পর সম্পৃক্ত বা একীভূত সত্তা হিসেবে একই সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা পেয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়, পাহাড়, সমুদ্র ও সৈকত-বেলাভূমি এবং বনাঞ্চলকে দেশের জনগণের সম্মিলিত সম্পত্তি বা ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ হিসেবে দেখাশোনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের বলেও উল্লেখ করা হয়। দেশের নদ-নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে উচ্চ আদালতের এই রায়ের পাশাপাশি জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের কর্মতৎপরতাতেও একটা ধারাবাহিক অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৯ এবং ২০২০ সালে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের নদীগুলো দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের দেশের ৬৪ জেলায় নদী দখলদারদের তালিকা প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে, বলাই বাহুল্য দখলদারদের তালিকা প্রকাশ তখনই সার্থক হবে যখন কার্যকর উচ্ছেদ অভিযানের মধ্য দিয়ে তা স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত হবে। 

মঙ্গলবার জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৯ উপস্থাপনের সময় সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে কমিশনের বিদায়ী চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার জানানদেশের ৬৪ জেলায় নদী দখলদারের সংখ্যা প্রায় ৬৩ হাজার। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ৬৪ জেলায় ৫৭ হাজার ৩৯০ জন নদী দখলদারের কাছ থেকে মোট ১৮ হাজার ৫৭৯টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও সক্ষমতা না থাকার কারণে জেলা প্রশাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রত্যাশিত উচ্ছেদ অভিযান চালাতে পারেনি বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এছাড়া করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে গত বছর উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি নদী দখলদার খুলনা বিভাগে। সেখানে সংখ্যাটি ১১ হাজার ২৪৫ জন। নদী দখলদারের সংখ্যা সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে ২ হাজার ৪৪ জন। ঢাকা বিভাগে নদী দখলদারের সংখ্যা ৮ হাজার ৮৯০ জন। ঢাকা জেলায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ইছামতী, বালু, বংশী, গাজীখালী, কালীগঙ্গাসহ ১১টি নদী ও ২০১টি খালের উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে। অন্যদিকে ঢাকা জেলায় নদী দখলদারের সংখ্যা ৬ হাজার ৭৫৮ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জে ৯টি নদী ও ২১৮টি খাল রয়েছে। সেখানে নদী ও খাল দখলদারের সংখ্যা ৭৮৫ জন। মানিকগঞ্জ জেলায় নদীর সংখ্যা ১৬টি আর খাল ১১৭টি; দখলদারের সংখ্যা ১ হাজার ৩৯৯ জন। ফরিদপুর জেলায় ১৩টি নদী ও ১৫টি খাল রয়েছে; দখলদারের সংখ্যা ১ হাজার ৮৩৪ জন। টাঙ্গাইল জেলায় নদী দখলদারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৮৮ জন। ১ হাজার ৪৫৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটিতে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের কার্যাবলি, দেশের নদ-নদী পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ কার্যক্রম, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নদ-নদীর চিহ্নিত সমস্যা ও সমাধানে সুপারিশ, গৃহীত পদক্ষেপ ও অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।

জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের বিদায়ী চেয়ারম্যানে মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজই। আগামীকাল দায়িত্বগ্রহণ করবেন নতুন চেয়ারম্যান। বিদায়ের প্রাক্কালে দেশের ৬৪ জেলার নদী দখলদারদের একটা বিশদ তালিকা প্রকাশ অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনে সফল উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করতে। সে পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করতে যাওয়া অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ এস এম আলী কবীর উত্তরাধিকার সূত্রে উচ্ছেদ অভিযানের দায়িত্ব পেলেন। এক্ষত্রে কয়েকটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন। উচ্চ আদালতের রায়ে স্পারসোর স্যাটেলাইট সার্ভের মাধ্যমে দেশের নদ-নদীগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণ এবং সে সংক্রান্ত ডিজিটাল ডেটাবেজ জেলা-উপজেলা-পৌরসভা-ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অবিলম্বে এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন জরুরি। কেননা নদী-জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণের কাজ বাস্তবায়িত হলে অবৈধ দখলমুক্ত করার কাজে জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নানা সংস্থা ও দপ্তরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সহজ হবে। একইসঙ্গে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, দেশের উচ্চ আদালতে নদীর সীমানা নিয়ে বিরোধ, নদীদূষণ, নদী দখল, নদী ভরাটসহ নানা বিষয়ে ঝুলে থাকা প্রায় পাঁচ লাখ মামলা দ্রুত নিরসনের। পাশাপাশি, নদ-নদী-খাল-বিল-জলাশয়ের প্রাকৃতিক প্রবাহ ও বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হলে এ নিয়ে বিশদ ভৌগোলিক সমীক্ষা পরিচালনা করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার পথে হাঁটতে হবে। কেননা, প্রাকৃতিক প্রবাহ ঠিক না থাকলে দখলদার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে গেলেও নদ-নদী-জলাশয় বাঁচানোর প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত