আগে টিকা পাবে ঢাকা ও আশপাশের স্বাস্থ্যকর্মীরা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২১, ০১:৪৬ এএম

বাংলাদেশকে দেওয়া ভারত সরকারের উপহারের করোনা টিকা পৌঁছানো এক দিন পিছিয়েছে। আজ বুধবার ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ ‘কভিশিল্ড’ টিকা দেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু ফ্লাইটের সয়মসূচি পরিবর্তনের কারণে সেই টিকা আগামীকাল বৃহস্পতিবার দেশে আসবে বলে ভারত থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল মঙ্গলবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফ্লাইট শিডিউল না পাওয়ায় ভারত থেকে টিকা আসা এক দিন পিছিয়েছে। ভারত থেকে জানানো হয়েছে, টিকা পাঠানোর জন্য বৃহস্পতিবারের ফ্লাইট পেয়েছে তারা। আগামীকাল বুধবার (আজ) আসার কথা ছিল। সেটা এখন বৃহস্পতিবার আসবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, ভারত থেকে টিকা আসার ফ্লাইটের বিস্তারিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে পাঠানো হয়েছে এবং সে অনুযায়ী আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এই ২০ লাখ টিকা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা।

এ ব্যাপারে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভারতের টিকা চার্টার্ড ফ্লাইটে আসার কথা রয়েছে। সেটার শিডিউল অন্য ফ্লাইটের মতো নয়। এটা কখন আসবে, সেটা স্ক্রিনে উঠবে না।

এর আগে গত সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম জানিয়েছিলেন, আজ বুধবার ভারতের উপহারের ২০ লাখ টিকা আসবে। তবে সে টিকা চুক্তির তিন কোটি টিকার সঙ্গে একসঙ্গে দেওয়া হবে নাকি আগেই দিয়ে দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে গতকাল মঙ্গলবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। গতকাল এ নিয়ে একটি বৈঠকও হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই টিকার ব্যাপারে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আজ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হতে পারে।

কারা পাবেন এই টিকা : ভারতের উপহারের ২০ লাখ টিকা ঢাকা ও ঢাকার আশপাশ এলাকার সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের আগে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, জাতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০ লাখ টিকা ঢাকা ও ঢাকার আশপাশ এলাকায় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ঢাকার বাইরে বাকি অন্যান্য যে জেলা, সেখানে যে তিন কোটি ডোজ আসবে, সেগুলো দেওয়া হবে। এখন যে টিকা আসছে ও ২৫-২৬ জানুয়ারির মধ্যে যে টিকা আসবে, সব একই টিকা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার। একই প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদন করছে। তাই প্রথমে ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় এবং পরে প্রয়োজনবোধে ঢাকার বাইরেও দেওয়া হবে।

এমনকি চুক্তি অনুযায়ী যে তিন কোটি টিকা আসার কথা রয়েছে, সেই টিকার জন্য অপেক্ষা না করে এই ২০ লাখ টিকা আগেই দিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা ও ঢাকা সিটি করপোরেশন অঞ্চল এবং এর আশপাশে দেওয়া হবে। এখানে লোক বেশি। ওয়ার্কিং জনসংখ্যা বেশি। অপেক্ষা করে তো লাভ নেই। একই টিকা। পর্যায়ক্রমে সবাই পাবে। এটা আগে দিতে পারলে টিকা দেওয়ার কাজটাও এগিয়ে থাকবে।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকার জন্য যে তালিকা করা হচ্ছে, সেই অগ্রাধিকার তালিকা ধরেই এই ২০ লাখ টিকা দেওয়া হবে। তালিকা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে দেওয়া হবে আনুপাতিক হারে। পাশাপাশি বয়সভিত্তিক জনগোষ্ঠীর যে তালিকা, সেটা আগেই শুরু করা হবে। ষাট বছরের ঊর্ধ্বে যে জনসংখ্যা, এই টিকা দিয়ে তাদের অনেকটাই পূরণ করা যাবে। এই টিকা স্বাস্থ্যকর্মীরা পাবেন।

এ কর্মকর্তা জানান, টিকা দেওয়ার জন্য ঢাকায় ৩০০ কেন্দ্র করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আরবান ডিসপেনসারি, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) টিকাদান কেন্দ্র, ইপিআইয়ের টিকাদান কর্মসূচি কেন্দ্রÑ এসব কেন্দ্রে দেওয়া হবে।

ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যে তালিকা, সেটা ইপিআই টিকাদান কর্মসূচি থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা ফরম পূরণ করছেন। এ তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে চলে আসবে। পরে টিকার জন্য অ্যাপ তৈরি হলে, সেখানে নিবন্ধন শুরু হবে। সেখান থেকেও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাইরে অন্য শ্রেণির জনগোষ্ঠীর তালিকা পাওয়া যাবে। সেখান থেকে বয়সভিত্তিক অগ্রাধিকার তালিকা করা হবে। দেশে এসে পৌঁছানোর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই এই ২০ লাখ টিকা দেওয়া শুরু করা যাবে বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।

টিকা সংরক্ষণ হবে যেভাবে : ভারত থেকে আসা করোনাভাইরাসের টিকা সংরক্ষণের জন্য তিনটি বিকল্প জায়গা ঠিক করে রেখেছে সরকার। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত টিকা বিতরণ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত এক সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি জানান, টিকা রাখার জন্য যে তিন স্থানের কথা সরকার ভাবছে, এর মধ্যে আছে রাজধানীর মহাখালীতে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির প্রধান কার্যালয়, তেজগাঁওয়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির নিজস্ব সংরক্ষণাগার এবং তেজগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার।

করোনাভাইরাসের টিকা ওয়াক ইন কুলে (ছোট ঘরের মধ্যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ) রাখা হয়। ২৯টি জেলায় ওয়াক ইন কুল আছে। আরও ১৮টি জেলায় টিকা সংরক্ষণের জন্য ওয়াক ইন কুল তৈরি হচ্ছে। আরও বেশি টিকা আসার আগেই এগুলো তৈরি হয়ে যাবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করছে। এছাড়া প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আইএলআর (হিমায়িত বাক্সের মধ্যে টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা) আছে। উপজেলায় আইএলআরে টিকা রাখা হবে। আলাদা হিমায়িত বাক্সে টিকা পরিবহন করা হবে।

চুক্তির টিকা আসবে ২৫-২৬ জানুয়ারির মধ্যে : ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি টিকা কিনতে গত নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও সেরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে ছয় মাসে এ টিকা বাংলাদেশ সরকারের কাছে পৌঁছে দেবে বেক্সিমকো। প্রতি টিকার দাম পড়ছে ৫ ডলার। বেক্সিমকো সরকারকে জানায়, জানুয়ারির শেষে অথবা ফেব্রুয়ারির প্রথমে বাংলাদেশে এ টিকা আসা শুরু হবে। কিন্তু গত ৪ জানুয়ারি সেরাম ইনস্টিটিউটের এক কর্মকর্তার বক্তব্যে বাংলাদেশে সময়মতো টিকা পাওয়া নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী আদর পুনাওয়ালার বরাত দিয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট (এসআইআই) বলেছে, তারা আগামী দুই মাসে ভারতে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করবে। তারপরই রপ্তানির উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও সিরাম ইনস্টিটিউটের চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো টিকা পাওয়া নিয়ে নানা ধরনের উদ্বেগ দেখা দেয়।

চুক্তি অনুযায়ী টিকার বাংলাদেশে অনুমোদনের পর থেকে এক মাসের মধ্যে সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশকে টিকা দেওয়া শুরু করবে। কিন্তু সিরাম ইনস্টিটিউট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশ সময়মতো টিকা পাবে কি না তা নিয়ে নানা ধরনের সংশয় ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়। এ নিয়ে ৫ জানুয়ারি দিনভর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের মন্ত্রিপর্র্যায়ে কয়েক দফা আলোচনা করা হয় এবং সরকার সময়মতো টিকা আসার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়।

গতকালও এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৫-২৬ জানুয়ারির মধ্যেই চুক্তির তিন কোটি টিকার মধ্যে প্রথম ৫০ লাখ টিকা আসার কথা রয়েছে। এখনো তারিখ পরিবর্তনের কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি। সুতরাং আমরা আশা করছি টিকা সময়মতোই চলে আসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত