২০২১ সাল একইসঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ মুজিববর্ষ উদযাপনের বছর। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও সংগ্রামের কেন্দ্রে ছিল শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বৈষম্যহীণ সমাজ নির্মাণ। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাঙালি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও স্বদেশ নির্মাণে তার অগ্রযাত্রা থমকে গিয়েছিল পঁচাত্তরের আগস্টে তার নির্মম হত্যাকান্ডের কারণে। কিন্তু বাংলাদেশ আবারও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সেকালের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র তকমা কাটিয়ে বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির দেশ। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা দুনিয়াব্যাপীই প্রশংসিত। তবে, একথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, প্রভূত উন্নয়ন সত্ত্বেও দেশের সব মানুষ সমভাবে এই উন্নতির সুফল পাচ্ছে না। দেশে এখনো ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষ রয়ে গেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মুজিববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে দেশের গৃহহীন মানুষদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার যে কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পন্ন করছেন তা যথার্থই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের এক অনন্য স্মারক হয়ে থাকবে।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে ৯ লাখ ঘর বানিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রায় ৭০ হাজার গৃহহীন পরিবারের হাতে পাকাঘরের চাবি তুলে দিয়েছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে ৪৯২ উপজেলায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী গৃহহীনদের মধ্যে সরকারি খরচে তৈরি ঘরগুলো বিতরণ করেন। সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এই প্রক্রিয়ার সমন্বয় করেছেন। পর্যায়ক্রমে মোট ৯ লাখ গৃহহীন পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে এরকম আরও পাকাঘর। মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে পাকাঘর পাওয়া গৃহহীন পরিবারগুলোর সদস্য এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইতে দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রকল্পটির পরিচালক জানিয়েছেন, একইদিনে একসঙ্গে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে বিনা পয়সায় ২ শতাংশ খাসজমির মালিকানা আর দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘর প্রদানের এমন বৃহৎ আশ্রয়ণ কর্মসূচি সারা পৃথিবীতেই এই প্রথম। প্রথম পর্যায়ের এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। একইসঙ্গে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪টি প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য এসব ব্যারাক নির্মাণ করছে। এছাড়া আগামী মাসেই গৃহহীনদের মধ্যে আরও প্রায় ১ লাখ পাকাঘর বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
একটি ঘর শুধু একটি আশ্রয়স্থল নয়, যার কিছুই ছিল না এমন একটি ঘর তার জন্য এটা অবশ্যই আত্মমর্যাদার। খাসজমিতে সরকারের বানিয়ে দেওয়া দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘরগুলোর সামনে একটি বারান্দা, একটি টয়লেট, একটি রান্নাঘর এবং একটি খোলা জায়গা রয়েছে। এসব ঘর বরাদ্দ পাওয়া পরিবারগুলোকে মালামাল পরিবহনের জন্য নগদ ৪ হাজার টাকা করে দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি এই প্রকল্পের আওতায় গৃহহীন পরিবারগুলো বিদ্যুৎসুবিধা এবং সুপেয় পানির নিশ্চয়তা পাবে। সরকারের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের নথি থেকে জানা যায়, ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে ‘আশ্রয়ণ’ নামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ সাল থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর অবধি মোট ৩ লাখ ২০ হাজার ৫২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এদিকে, আশ্রয়ণ প্রকল্প ২০২০ সালে ভূমিহীন ও গৃহহীন মোট ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবারের তালিকা তৈরি করে। এতে দেখা যায়, সারা দেশে ঘরও নেই, জমিও নেই এমন পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬১টি। আর ভিটেমাটি আছে কিন্তু ঘর জরাজীর্ণ কিংবা ঘর নেই এমন পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ ৯২ হাজার ২৬১টি।
সরকারের এই আশ্রয়ণ প্রকল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অতিদরিদ্র মানুষদের সুরক্ষায় ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য হারে বরাদ্দ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জরুরি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। আশা করা যায় এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে একদা ভূমিহীন-গৃহহীন অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। এখন এই পরিবারগুলোকে নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা হলে তা দারিদ্র্য দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
