প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরু হয় চীনের উহান থেকে। নতুন নভেল ধরনের এ ভাইরাসটি যে প্যাথোজেন পরিবারের তার নাম করোনাভাইরাস। যার কারণে এর আগে সার্স ও মার্স ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছিল। সার্সে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯ শতাংশ এবং মার্সে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৩৫ শতাংশ মারা গিয়েছিল। করোনাভাইরাসের যে ধরনটি ইতিমধ্যেই চীনে ২৬ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, সেটি খুবই পরিচিত ও ভীতিকর বলে সেখানকার চিকিৎসকরা উল্লেখ করেন। একপর্যায়ে চীন থেকে এই ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা বলেন, এই ভাইরাস মোকাবিলায় মানবদেহের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ফলে ভাইরাসটির কারণে মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
এরই মধ্যে গত বছরের ৮ মার্চ দেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ঘোষণা করেন, দেশে তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া পর্যবেক্ষণে রয়েছেন দুজন। এরপর ১৮ মার্চ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরীক্ষার কিট তৈরির চেষ্টা করছে গণস্বাস্থ্য-আরএনএ বায়োটেক লিমিটেড। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য-আরএনএ বায়োটেক লিমিটেড কভিড-১৯ শনাক্তে একটি কিট তৈরির শেষ ধাপে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন একটি দল গত ফেব্রুয়ারি থেকে কিট তৈরি ও উৎপাদনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. বিজন কুমার শীল, যিনি ২০০৩ সালে সার্স পিওসি কিট তৈরি করা দলের সদস্য ছিলেন। করোনার পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও সরঞ্জাম প্রস্তুতের শেষ ধাপে রয়েছে দলটি। এতে বিজন কুমার শিল ছাড়াও রয়েছেন ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রঈদ জমির উদ্দিন ও ড. ফিরোজ আহমেদ।
পাশাপাশি কিট উৎপাদন করতে হাইটেক ((BSL 2 Standard স্ট্যান্ডার্ড) ল্যাবের প্রয়োজন হয়। ইতিমধ্যে গণস্বাস্থ্য-আরএনএ বায়োটেক একটি হাইটেক ল্যাব স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন পেলেই আমরা প্রয়োজনীয় উপাদান আমদানি করব। সব মিলিয়ে উৎপাদন করতে আমাদের এক মাস সময়ের প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে আমরা ১০ হাজার ভাইরাস শনাক্তকরণ কিট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। এই কিট ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই ল্যাবটি ‘তৃতীয় (দ্বিতীয়) স্তরের’ বায়োসেফটি হতে হবে।
গত বছরের ১৫ এপ্রিল করোনাভাইরাস শনাক্তে কভিড-১৯ রোগ পরীক্ষার সহজ ও স্বল্পমূল্যের পদ্ধতি উদ্ভাবন করার ঘোষণা দেয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। গণস্বাস্থ্যের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিতে কভিড-১৯ শনাক্ত করার জন্য কিছু উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। সেই উপকরণগুলো ব্যবহার করতে হলে ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন লাগবে। এরপর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে কিট তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা রিএজেন্ট আমদানির অনুমতি দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গণস্বাস্থ্যের পক্ষ থেকে বলা হয়, কিট দিয়ে নমুনা তৈরি করে তা সরকারকে দেওয়া হবে। তখন সরকার তা পরীক্ষা করে দেখবে সেটা কতটুকু কাজ করে। এরপর করোনার কিট তৈরির পর তার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ঈজঙ-এর মাধ্যমে কাজ করার অনুমোদন দেয়।
পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে দ্রুত টেস্ট কিট উদ্ভাবন করে গণস্বাস্থ্য। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেই ক্রেডিট থেকে বঞ্চিত হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। কারণ এরই মধ্যে আমেরিকা-ভারতসহ কয়েকটি দেশ দ্রুত টেস্ট কিটের অনুমোদন দিয়েছে। ওই সব দেশের আগে দ্রুত টেস্ট কিট উদ্ভাবন করেও অনুমোদনের অপেক্ষায় এখনো ঝুলে আছে গণস্বাস্থ্যের কিট। ফলে অন্য দেশে কিট সরবরাহের যে সুযোগ ছিল, সেটিও হাতছাড়া হতে বসেছে।
যেকোনো নতুন গবেষণার প্রায়োগিকভিত্তি নির্ভর করে বিশ্বের স্বীকৃত জার্নালগুলোয় আর্টিকেল প্রকাশ ও বিশ্লেষণের ওপর। তারই ধারাবাহিকতায় আমেরিকার মার্সল্যান্ড প্রেস থেকে প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক সায়েন্স জার্নালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র উদ্ভাবিত কভিড-১৯-এর টেস্টিং পদ্ধতির ওপর আর্টিকেল ছাপে এবং তারা এটিকে স্বীকৃতি দেয়।
এরপর ৩০ এপ্রিল ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গণস্বাস্থ্যকে তাদের উদ্ভাবিত কিটের নমুনার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউ অথবা আইসিডিডিআর.বিতে জমা দেওয়ার অনুমতি দেয়। এরপর ১৩ মে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউকে ২০০ কিট সরবরাহ করে। ১৩ মে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ডা. মুহিব উল্লাহ খন্দকার বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মুনশি ও কিট পরীক্ষা কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহীনা তাবাসসুমের কাছে কিট পৌঁছে দেন। এ সময় বিএসএমএমইউকে ২০০ কিট সরবরাহ করা হয়।
২ মে বিএসএমএমইউ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট পরীক্ষার জন্য ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে। তারপর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ট্রায়ালের জন্য কিট জমা দেয়। অভিযোগ আসে, অত্যন্ত ধীরগতিতে পরীক্ষা চলছে। প্রায় দেড় মাস পর ১৭ জুন বিএসএমএমইউ অ্যান্টিবডি টেস্ট কিট পরীক্ষার রিপোর্ট দেয়। তার আগেই বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষের অ্যান্টিজেন টেস্ট কিটের নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতিতে ত্রুটি ধরা পড়ে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরীক্ষা স্থগিত রাখার আবেদন করে। অল্প সময়ের মধ্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র অ্যান্টিজেন কিটের নমুনা সংগ্রহের ডিভাইস তৈরি করে দেয়। তারপর থেকে অ্যান্টিজেন কিট পরীক্ষা নিয়ে চিঠি চালাচালি চলছে। পরীক্ষা আর শুরু হয়নি।
১৭ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া প্রথার বাইরে এসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘করোনার নমুনা পরীক্ষার জন্য যে র্যাপিড টেস্ট কিট গণস্বাস্থ্য দিয়েছিল পরীক্ষায় সেগুলো কার্যকর বলে প্রমাণ হয়নি। তবে যেসব এলাকায় পিসিআর সুবিধা নেই, সেখানে এটি সহায়ক হতে পারে। এই কিটটি উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের রোগ শনাক্তকরণে কার্যকরী নয়। উপসর্গের প্রথম দুই সপ্তাহে এই কিট ব্যবহার করে শুধু ১১- ৪০ শতাংশ রোগীর রোগ শনাক্তকরণ সম্ভব। তবে যেসব জায়গায় আরটি পিসিআর পদ্ধতি নেই বা যাদের কভিড উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও আরটি পিসিআরে নেগেটিভ এসেছে, তাদের ক্ষেত্রে এই কিট কিছুটা সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।’ তবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র আগেই জানিয়েছিল, এই কিট সংক্রমণ হওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহের পর অ্যান্টিবডি নির্ণয়ে সহায়ক, কখনো বলেনি প্রথম দুই সপ্তাহে এটা ব্যবহার করা যাবে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘গণস্বাস্থ্যের উদ্ভাবিত কিট কভিড রোগের ব্যাপ্তি বা সেরোপ্রিভিলেন্স দেখার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, যে ক্ষেত্রে এই কিটের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ রোগী যাদের আগে কভিড রোগ হয়েছিল তাদের শনাক্তকরণ সম্ভব। এ তথ্য কভিড প্লাজমা বিতরণ, কোয়ারেন্টাইন সমাপ্তির সময় নির্ধারণ এবং লকডাউন উত্তোলনের রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে।’
উপাচার্য বলেন, ‘গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস কর্র্তৃক প্রদত্ত কিট অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারলেও আইজিএম (যা ইনফেকশনের শুরুতে তৈরি হয়) এবং আইজিএইচ (যা ইনফেকশনের বিলম্বিত পর্যায়ে তৈরি হয়) তা আলাদাভাবে পার্থক্য তৈরি করতে পারে না।’ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র আগেই জানিয়েছিল, এটা দুটোকেই একসঙ্গে নির্ণয় করতে পারবে।
মোট ৫০৯টি রক্ত স্যাম্পল পরীক্ষার মাধ্যমে এক মাস সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব মেডিকেলের গঠিত গবেষণা দলের কার্যক্রম শেষ হয় বলে জানান তিনি। গণস্বাস্থ্য ১২ মে প্রথমে ২০০টি কিট দিয়েছিল পরীক্ষার জন্য। যদিও পরে আবার ১৯ মে রক্তের পরিবর্তে রোগীর লালা সংগ্রহের অনুরোধ জানান।
বিএসএমএমইউ তাদের রিপোর্ট ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে জমা দেয়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এই রিপোর্টিংয়ের পর নতুন এক নীতিমালা করে। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সেখানে USFDA-এর Umbrella guideline অনুসরণে অ্যান্টিবডি কিটের মান উন্নয়নের কথা বলা হয় গণস্বাস্থ্যকে। এরপর গণস্বাস্থ্য কিটের মান উন্নয়ন করে। উন্নয়ন করা কিট পুনরায় পরীক্ষার জন্য বলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। অ্যান্টিজেন কিটের বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যে শর্ত দেয় তা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
এতে করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত করোনা অ্যান্টিবডি কিটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কারণ ঔষধ প্রশাসনের নীতিমালার মধ্যে তারা এমন সব শর্ত দিয়ে দিয়েছে, যা আমাদের দেশে পূরণ করা সম্ভব নয়। ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ করে এর পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে আসতে হবে। কারণ, তাদের নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের আইসিডিডিআর,বি বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল, কারও এই পরীক্ষা করার সক্ষমতা নেই। সোজা কথা যুক্তরাষ্ট্রের ঔষধ প্রশাসনের (এফডিএ) টেস্টের যে নতুন নিয়ম-কানুন, সেটাই জাস্ট ফটোকপি করে ঔষধ প্রশাসন আমাদের দিয়ে দিয়েছে।
এদিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট উদ্ভাবনের প্রধান বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। একপর্যায়ে এ সংক্রান্ত জটিলতায় ১৯ সেপ্টেম্বর দেশ ছাড়তে বাধ্য হন ড. বিজন কুমার শীল। যাওয়ার আগে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে তো আমি সব সময়ই আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম। এবার যাওয়ার আগে কেন যেন মনটা খুব বিষণ্ন। খুব কষ্ট অনুভব করছি। আমার ওয়ার্ক পারমিট হবে না, এমন সিদ্ধান্তও কিন্তু জানিয়ে দেওয়া হয়নি। কষ্টের কারণ হয়তো এত মানসম্পন্ন কিট উদ্ভাবন করলাম, এখনো অনুমোদন পেলাম না। ভেতরে ভেতরে একটা ধারণাও হয়তো তৈরি হয়েছিল যে অল্প সময়ের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে যাব।’
গত বছরের জানুয়ারি মাসে এক বছরের ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। ভিসার মেয়াদ জুলাই মাসে শেষ হলে তিনি আরও এক বছরের ট্যুরিস্ট ভিসা পান। কিন্তু এবার শর্ত দেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করতে পারবেন না। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমার জন্য বিদেশি হিসেবে কাজ করার অনুমতির আবেদন আগেই করা হয়েছে। কিন্তু সেই অনুমতি এখনো না দেওয়ায় আমি এখনো ট্যুরিস্ট ভিসায়ই আছি।’
২০০৩ সালে পৃথিবীজুড়ে সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে বিজন কুমার শীল সিঙ্গাপুর গবেষণাগারে কয়েকজন সহকারীকে নিয়ে সার্স ভাইরাস দ্রুত নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। বিজন কুমার গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান বিজ্ঞানী।
লেখক : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি
