কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের প্রতিবেদন

চাল আলু পেঁয়াজের দাম বেড়েছে সিন্ডিকেটে

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ০২:১৪ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে চাল, পেঁয়াজ ও আলুর মতো নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার নেপথ্য ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। একই সঙ্গে নিত্যপণ্য নিয়ে ব্যবসায়ীদের কারসাজি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে তারা। এছাড়াও পণ্যের উৎপাদন, চাহিদা অনুযায়ী আমদানিতে ব্যর্থতাকেও দায়ী করেছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি এসব পণ্যের দাম ভবিষ্যতে স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। তারা বলেছে, এগুলো বাস্তবায়ন করা হলে পণ্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

রাজধানীর ফার্মগেটে বিএআরসি মিলনায়তনে গতকাল মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এটি উপস্থাপন করেন বিএআরসির গবেষণা দলের সমন্বয়ক ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম। চালের দাম বাড়ার কারণ উপস্থাপন করেন কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের এসএসও আব্দুস সালাম, আলুর দাম বাড়ার কারণ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের অধ্যাপক শেখ আব্দুস সবুর, পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ উপস্থাপন করেন কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান আব্দুর রশীদ। বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ  মোহাম্মদ বখতিয়ারের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক।

অনুষ্ঠানে গবেষকরা বলেন, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময় বাজারে চাল, পেঁয়াজ ও আলুর দামে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এগুলোর দাম বাড়ার কারণ উদঘাটনে বিএআরসি  থেকে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। প্রতিবেদনে চাল, পেঁয়াজ ও আলুর দাম বাড়ার কারণ এবং ভবিষ্যতে এগুলোর মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়।

চাল : প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় সব কৃষকই ধান কাটার প্রথম মাসের মধ্যে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী ধান রেখে বাড়তি অংশ বিক্রি করে দেন। কিন্তু গত বোরো মৌসুমে করোনার কারণে ধান বিক্রির ধরনটি পরিবর্তিত হয়েছে। এ মৌসুমে কৃষকরা তাদের ধান মজুদ থেকে ধীরে ধীরে বিক্রি করেছেন। ফলে বাজারে এর সংকট দেখা দেয়।

এছাড়া সরকার গত মৌসুমে কম চাল সংগ্রহ করেছে, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চাল আমদানি করতে পারেনি। ফলে বাজারে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হয়নি। এতে দাম বেড়েছে।

ধান : বাজারে বড় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের আধিপত্য ও অসম প্রতিযোগিতা রয়েছে। আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনে ঘাটতির আশঙ্কা করা হয়েছে। ধান চাষের ব্যয় ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান মৌসুমি ব্যবসায়ী বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন কমেছে। এসব কারণে ধানের দাম বেড়েছে।

প্রতিবেদনে ধান-চালের মূল্য স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ধান-চাল সংগ্রহ পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করে তা মিলারদের মাধ্যমে চালে পরিণত করা।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বেশির ভাগ ধানই মিলাররা কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। ফলে তারা ইচ্ছেমতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

চিকন ও মোটা দানার চালের জন্য সরকারের পৃথক ন্যূনতম সহায়তা মূল্য (এসএমপি)  ঘোষণা করা। ন্যূনতম ২৫ লাখ টন চাল সংগ্রহ করা এবং মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সংগ্রহ করার সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে করে সরকার বাজারে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

বাফার স্টক হিসেবে সরকার কর্তৃক প্রতি মাসে কমপক্ষে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল মজুদ নিশ্চিত করা। উৎপাদন ব্যয়ের ওপর কমপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা বিবেচনা করে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হলে কৃষকরা লাভবান হবে এবং তারা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করবে।

আলু : ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আলুর মজুদ ও হিমাগার  থেকে আলুর কম সরবরাহ হয়েছে। হিমাগারে মজুদ আলু ঘন ঘন হাতবদল হয়েছে। পাশের কয়েকটি দেশে আলু রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আলুর বিপুল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে ভূমিকা রাখছে। আলুর বাজারে সরকারের সীমিত নিয়ন্ত্রণ ও বাজারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তথ্যের অভাব রয়েছে। বর্ষার  মৌসুমের ব্যাপ্তি দীর্ঘতর হওয়ায় সবজির উৎপাদন কমেছে ও আলুর চাহিদা বেড়েছে। এসব কারণে এর দাম বেড়েছে।

সুপারিশে বলা হয়, কৃষিপণ্যের মূল্য কমিশন স্থাপন ও পরে সর্বাধিক ও সর্বনিম্ন সাপোর্ট মূল্যের ঘোষণা করা, উৎপাদন, চাহিদা, সরবরাহ ও দামের তথ্যাবলিতে অস্পষ্টতা দূর করে এখানে স্বচ্ছতা নিয়ে আসা, হিমাগারে আলুর সংরক্ষণ ও অবমুক্তকরণ সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মধ্যে রাখা, আলুর বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের শনাক্ত করা ও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, আলু ও আলু দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ব্যবস্থা করা, বিদেশের চাহিদা অনুযায়ী আলুর জাতের উন্নয়ন ও যেসব আলু প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহƒত হয় সেসব আলুর জাত উন্নয়নের ব্যবস্থা করা। এতে আলুর উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়বে। ফলে দেশের বাজারে এর মূল্যও স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।

পেঁয়াজ : দেশীয় অসাধু বাণিজ্য সিন্ডিকেট দ্বারা বাজারে কারসাজি। ভারতীয় পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং অতিমাত্রায় ভারতের ওপর পেঁয়াজ আমদানিতে নির্ভরতা। আমদানির জন্য পেঁয়াজের বিকল্প উৎসের সন্ধানে দ্রুত কার্যক্রমের অভাব। গ্রীষ্মকালীন  পেঁয়াজ ও মুড়িকাটা পেঁয়াজের সীমিত উৎপাদনের কারণে এর দাম বেড়েছে।

সুপারিশে বলা হয়, অসাধু বাণিজ্য সিন্ডিকেট শনাক্ত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা, সংকটকালীন পেঁয়াজ আমদানির জন্য দ্রুত একাধিক রপ্তানিকারক দেশের সন্ধান করা, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর  মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা, কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের মাধ্যমে সারা বছর বাজারে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ ও তদারকি করা। এছাড়াও বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও মজুদের অগ্রিম ব্যবস্থাপনা করলে সুফল পাওয়া যাবে।

অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত বছর বোরোর সময়ে ৩৬ টাকা দরে চাল কিনতে চেয়েছিলাম। বাজারে দাম বেশি ছিল। মূলত আগের আমনে গরিব চাষিদের কাছ থেকে ৬ লাখ টন আমন কেনা হয়েছিল। এবার এক টনও কিনতে পারিনি। ৩৬ টাকা দামে কোনো চাষি আমন দেয়নি। এবার মণপ্রতি আমনের দাম ছিল ১ হাজার ৪০ টাকা। কিন্তু ময়েশ্চারের ঝামেলা এড়াতে চাষিরা ভালো দামে বাজারে চাল বিক্রি করে দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত