পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) ৩৮তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডার পদে ২ হাজার ২০৪ জনকে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করলেও তাদের মধ্য থেকে ৭৫ জনকে নিয়োগ দেয়নি সরকার। অবশিষ্ট ২ হাজার ১২৯ জনকে নিয়োগ দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
ওই ৭৫ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও কেন নিয়োগ পেলেন না তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনে নেগেটিভ (নেতিবাচক) মন্তব্য থাকার কারণে অনেকে নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন চাকরি প্রার্থীর মুক্তিযোদ্ধা সনদে সমস্যা রয়েছে। মেডিকেল প্রতিবেদন না আসার কারণেও কয়েকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
পুলিশের নেতিবাচক মন্তব্যের কারণ কী জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরিও আছে। রাজনৈতিক বিবেচনায়ও কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপত্তি রয়েছে পুলিশের।
বিসিএস হচ্ছে দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এ তিন ধাপে যোগ্যতর হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েও পুলিশি প্রতিবেদনে ‘আপত্তির’ কারণে তারা নিয়োগ পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পিএসসির সুপারিশকৃত প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সুপারিশকৃত প্রার্থীর বিরুদ্ধে যদি রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকে তাহলে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে একমত না হলে নিয়োগ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পরিবারের কোনো সদস্যের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিবারের অন্য সদস্যের নিয়োগ না পাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগবঞ্চিত এক চাকরি প্রার্থী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিএসসির সুপারিশ পেয়েও নিয়োগ না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখের। পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী সবার কাছে হেয় হচ্ছি। চার বছর লেগে থেকে এই পর্যায়ে এসেছি। এই চার বছর আমি অন্য কোনো চাকরিও করিনি। এখন আমার চাকরির আর বয়স নেই। আমাকে টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে।’
গতকাল ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ ২ হাজার ১২৯ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নিয়োগপ্রাপ্তদের আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তী কোনো নির্দেশ না পেলে ওই তারিখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে হবে। নির্ধারিত তারিখে চাকরিতে যোগদান না করলে তিনি চাকরিতে যোগদান করতে সম্মত নন বলে ধরে নিয়ে নিয়োগপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে।
গত বছর ৩০ জুন ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে পিএসসি। এ বিসিএসের জন্য সরকার ২০১৭ সালের ৫ মার্চ পিএসসিকে চাহিদা পাঠায়। একই বছরের ২০ জুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। শুরুতে ২ হাজার ২৪টি পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হলেও পরে আরও ১৮০টি পদ বাড়ানো হয়। এ পদ বাড়াতে গিয়েই সময় বেশি লাগার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারপরও ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪৬৮ জন আবেদন করেন, যা ছিল ওই সময় পর্যন্ত রেকর্ডসংখ্যক আবেদন। ১ মাস ২১ দিন পর প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ হয়। এতে উত্তীর্ণ হন ১৬ হাজার ২৮৬ জন। ২০১৮ সালের আগস্টে এ বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়। ২০১৯ সালের ১ জুলাই লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। সেখানে উত্তীর্ণ হন ৯ হাজার ৮৬২ জন। লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে সময় লেগেছে ১০ মাস। ২৯ জুলাই এ বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়। সাড়ে নয় হাজারের কিছু বেশি প্রার্থীর ভাইভা নিতে সময় লেগেছে সাত মাস। গত বছর ৯ ফেব্রুয়ারি সেই মৌখিক পরীক্ষা শেষ হয়। এরপর ফল প্রকাশের অপেক্ষা শুরু হয়।
২০১৭ সালের মার্চে যে বিসিএসের যাত্রা শুরু সেই বিসিএসের নিয়োগ হলো ২০২১ সালের জানুয়ারিতে এসে। ৩ বছর ৯ মাসে বিসিএস শেষ করার কারণ জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে এ বিসিএসের প্রার্থী চূড়ান্তভাবে বাছাই করতে বিলম্ব হয়েছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশন সুপারিশ করার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে খুব বেশিদিন ধরে আটকে ছিল না। সুপারিশ পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই আমরা পুলিশ ভেরিফিকেশন, মুক্তিযোদ্ধা ও পোষ্যদের সনদ যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ করতে পেরেছি।
পিএসসির প্রতিশ্রুতি হচ্ছে প্রতি বছর একটি বিসিএস আয়োজনের। কিন্তু তা করতে পারছে না তারা। পিএসসির এক সদস্য বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর বিসিএস আয়োজন করতে পারছি না, বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ যখনই দুই বিসিএসের মধ্যে সময়ের ব্যবধান বেড়ে যায় তখন একটা বিশেষ বিসিএস আয়োজন করা হয়। প্রতি বছর বিসিএসের হিসাব করতে হলে বিশেষ বিসিএসও আমলে নিতে হবে। হয়তো বিশেষ বিসিএসগুলোতে পূর্ণ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয় না। কিন্তু বিশেষ বিসিএসগুলোতে এ দেশেরই বেকার ছেলেমেয়েরা চাকরির জন্য আবেদন করছে এবং নিয়োগ পাচ্ছে।’
