টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি ও বৈষম্য নয়

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২১, ০২:২৭ এএম

করোনার ভ্যাকসিন বা টিকা প্রয়োগের যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। রাতের শেষে ভোরের সূর্য উঠলে যেমন অন্ধকার দূর হয়ে যায়, তেমনি প্রত্যাশা ছিল মহামারীজনিত সংকট যত তীব্রই হোক না কেন তার একটা সমাধান বিজ্ঞানের গবেষণার পথে বের হবেই। মানুষ তার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে এটা বারবার। কারণ এই মহাবিশ্বে কোনো কিছুই তো নিয়মের বাইরে ঘটে না। মানুষ যতক্ষণ নিয়মটা জানতে পারে না ততক্ষণ অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে সান্ত্বনা পেতে চায়। কিন্তু অতীত ইতিহাস বলে অদৃষ্টের ওপর নির্ভর করে বসে থাকেনি বলে মানুষ সমস্যার কারণ জানতে পেরেছে এবং সমাধান করতে পেরেছে। কলেরা, বসন্ত, প্লেগ মহামারীর মতো অনেক সংকট মোকাবিলা করেছে মানুষ বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে।

করোনা মহামারী সারা বিশ্বের মানুষকে হতচকিত করে দিয়েছিল। প্রায় ১০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হওয়া ও ২০ লাখ মানুষের মৃত্যুর খবরের পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা যখন করোনার জিনোম আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন, তখন থেকে টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। ২৫৬টির বেশি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছে বিশ্বব্যাপী। এদের মধ্যে ৬০টি গবেষণা সফল করে ট্রায়াল চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। আর বড় বড় ছয়টি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে টিকা বাজারে নিয়ে এসেছে। ফলে সারা পৃথিবীর মানুষ ভাবছে করোনা সংকটের অন্ধকার কাটতে আর খুব বেশি দেরি নেই। তবে কিছু বিভ্রান্তিও ছড়িয়ে পড়ছে, প্রধানত টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ভ্যাকসিন একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। ফলে এ-সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করতে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ সমন্বয়ে জাতীয় কমিটি করে মানুষকে সচেতন করা দরকার।

টিকা আসার আগে থেকেই টিকা সংরক্ষণ, সরবরাহ ও টিকা প্রদানের প্রস্তুতি, বেসরকারি পর্যায়ে টিকার দাম নিয়ে চলছে বিভিন্নমুখী আলোচনা। অতীতের ব্যর্থতা বা বেদনার কথা কেউ মনে রাখতে না চাইলেও অতীতের যুক্তিসংগত পর্যালোচনা না করে বর্তমানকে ভালোভাবে কেউ মোকাবিলা করতে পারে না। তাই হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালো না লাগলেও অতীতের পর্যালোচনা বর্তমান সংকটকে মোকাবিলা করার জন্যই প্রয়োজন। করোনার শুরু থেকেই অত্যন্ত অপ্রতুল পরীক্ষার কারণে এ দেশের বিশেষজ্ঞরা (সরকার গঠিত টেকনিক্যাল কমিটিসহ) বলেছেন, ‘আমরা আসলে আমাদের দেশের করোনার সার্বিক পরিস্থিতি বুঝতে পারছি না। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে সবচেয়ে কম পরীক্ষা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য হচ্ছে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য ভারত টেস্ট করছে ১ লাখ ৩৬ হাজার, নেপাল করছে ৬৭ হাজার, পাকিস্তান করছে ৩৩ হাজার। আর বাংলাদেশে করা হয়েছে মাত্র ২১ হাজার। এই দুর্বলতার কথা ভুলে গেলে চলবে না। পাশাপাশি এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, খরচের কথা ভেবে সাধারণ মানুষ করোনা টেস্ট করতে আগ্রহী হয়নি। দাম দিয়ে টিকা কিনতে হবে জানলে তারা টিকা নিতেও চাইবে না।’

টিকা নিয়ে অন্য যে প্রশ্নটা সবার মধ্যে আছে তা হলো সবাইকে একসঙ্গে দেওয়ার মতো এত টিকা বাংলাদেশ কি পাবে? টিকা কারা পাবে, কখন পাবে এই বিবেচনা কীভাবে করা হবে?

সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে পাওয়া যাবে মাসে ৫০ লাখ করে তিন কোটি টিকা। এই টিকা দেওয়া যাবে দেড় কোটি মানুষকে। ভারত থেকে শুভেচ্ছা হিসেবে পাওয়া ২০ লাখ ডোজ দেওয়া যাবে ১০ লাখ মানুষকে। এ ক্ষেত্রে কারা আগে পাবে তা নির্ধারণ করে সরকার তিন ধাপে টিকা দেওয়ার কথা বলেছে। প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে যে তিন শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আসবে, তারা হচ্ছেন সব ধরনের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজকর্মী, যারা কভিড মোকাবিলায় সরাসরি জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, নার্স এবং মিডওয়াইফারি পেশায় নিয়োজিত কর্মী, মেডিকেল ও প্যাথলজি ল্যাবকর্মীরা, পেশাদার স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, সাইকোথেরাপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা, মেডিসিন পার্সোনেল, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুলেন্সচালক মিলে ৩ লাখ ৩২ হাজার জন। সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, যারা স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ধাপে কাজ করে কিন্তু সরাসরি কভিড-১৯ মোকাবিলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা কর্মী, ক্ল্যারিক, বাণিজ্যকর্মী, লন্ড্রিকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য গাড়ির চালক এমন ১ লাখ ২০ হাজার জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এ ছাড়া ২ লাখ ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা, ৫ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি ফ্রন্ট লাইনে কাজ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যেমন পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, আনসার, ভিডিপি সদস্য, ৩ লাখ ৬০ হাজার অন্যান্য বাহিনী যেমন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও প্রেসিডেন্ট গার্ডের সদস্য, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ৫০ হাজার কর্মকর্তা, ফ্রন্ট লাইনে কাজ করা সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মী ৫০ হাজার জনকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে।

এই ধাপে আরও যারা ভ্যাকসিন পাবেন তারা হচ্ছেন জনপ্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা কর্মী, ধর্মীয় নেতা, দাফন ও সৎকারে নিয়োজিত কর্মী, ওয়াসা, ডেসা, তিতাস ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, স্থল, সমুদ্র ও বিমানবন্দর কর্র্তৃপক্ষ, প্রবাসী শ্রমিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মী, ব্যাংককর্মী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম রয়েছেন এমন রোগী, রোহিঙ্গা ও বাফার, জরুরি ও মহামারি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মী।

প্রথম ধাপের দ্বিতীয় পর্যায়ে টিকা দেওয়া হবে ৬০ বছর বা এর চেয়ে বয়স্ক নাগরিকদের। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম ধাপে ৫৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী নাগরিক, বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষ, শিক্ষক এবং সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী, প্রথম পর্যায়ে বাদ পড়া মিডিয়াকর্মী, দুর্গম এলাকায় বসবাসরত মানুষ, আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য, গণপরিবহন কর্মী, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ওষুধের দোকানের কর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, যৌনকর্মী ও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যরা।

তৃতীয় পর্যায়ের দুটি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপে যাদের টিকা দেওয়ায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তাদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী যারা আগের ধাপে টিকা পাননি, গর্ভবতী নারী, অন্যান্য সরকারি কর্মচারী, অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী কর্মী, অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, রপ্তানি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দরকর্মী, কয়েদি ও কারাগারকর্মী, শহরের বস্তিবাসী বা ভাসমান জনগোষ্ঠী, কৃষি ও খাদ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত কর্মী, ডরমিটরির বাসিন্দা, গৃহহীন জনগোষ্ঠী, অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মী, বাদ পড়া গণপরিবহন কর্মী, বাদ পড়া ৫০-৫৪ বছর বয়সী নাগরিক, জরুরি ও মহামারী ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা। তৃতীয় পর্যায়ের শেষ ধাপে যারা টিকা পাবেন তারা হচ্ছেন অন্য ধাপে বাদ পড়া যুব জনগোষ্ঠী, শিশু ও স্কুলগামী শিক্ষার্থী এবং এর আগের সব ধাপে বাদ পড়া জনগোষ্ঠী।

সব মিলিয়ে ৮০ শতাংশ জনগণকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে ১৯২ দিন সময় লাগবে বলে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোয় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচি চলবে। সরকারি ছুটির দিনে বিশেষ পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত কিছু টিকাদান কেন্দ্রে সন্ধ্যায় টিকা দেওয়া হবে।

মনে রাখা দরকার, ঢাকা মহানগরের একজন পরিবহন শ্রমিক দিনে গড়ে ৫০০ যাত্রীর সংস্পর্শে আসে, রিকশাচালক দিনে ৪০ জন যাত্রীর সঙ্গে লেনদেন করে, সিএনজিচালক, হকার, ক্ষুদ্র চা দোকানদার, বাসাবাড়ির গৃহকর্মী, হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মচারী, কাঁচাবাজারের দোকানদার, বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহকারী এই স্তরের শ্রমজীবী মানুষও সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যতম উৎস হতে পারে। ফলে তাদের টিকা দেওয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা দরকার। এ ছাড়া স্কুল-কলেজ খুললে দারোয়ানের পাশ দিয়ে ঢুকবে শত শত ছাত্র ছাত্রী, বিভিন্ন বাড়ি ও অফিসে চাকরি করা সিকিউরিটি গার্ড প্রতিদিন অনেক মানুষের সংস্পর্শে আসে। এদের টিকা দিলে সবাই নিরাপদ থাকবে। তাই এদের টিকা দেওয়ার অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখতে হবে।

৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হলে ২৮ কোটি ডোজ টিকা দরকার হবে। এই টিকা আসবে কোথা থেকে এবং কী দামে? আমরা জানি, বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে। অক্সফোর্ডের সঙ্গে সরকারিভাবে চুক্তি করে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে টিকা উৎপাদন করলে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেত এবং টিকার দাম দুই ডলারের বেশি হতো না। কিংবা সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে সরাসরি কিনলে ২৮ কোটি ডোজ টিকা সাত হাজার কোটি টাকায় কেনা যাবে। পরিবহন, সংরক্ষণ বাবদ আরও তিন হাজার কোটি টাকা খরচ ধরলে ১০ হাজার কোটি টাকায় সব মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব। এই টাকা খরচের সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। তাই টিকা নিয়ে ব্যবসা বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা করতে দেওয়া উচিত নয়।

করোনার আঘাতে ৪২ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে। টিকা কেনার টাকা কোথায় তাদের? ফলে তারা টিকা নিতে পারবে না। তাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে টিকা এনে বিনামূল্যে তা দেওয়ার ব্যবস্থা না করলে টিকা নিয়ে ব্যবসা আর বৈষম্য দুটোই বাড়বে। করোনা যেহেতু মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় তাই টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কাউকে বাদ দিলে বা কেউ বাদ পড়লে করোনা সংক্রমণের বিপদ কমবে না।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত