প্রত্যাবাসন আটকে যাবার শঙ্কা সীমান্তে টহল জোরদার

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:৪১ এএম

মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন দেশটির সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও আটকে যেতে পারে। পাশাপাশি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ খুলতে পারে। তারা এখনই হতাশ না হয়ে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন।

এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। পররাষ্ট্র সচিব গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সীমান্তব্যবস্থা জোরদার করা হবে, এটাই স্বাভাবিক। সম্ভাব্য কোনো অনুপ্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আছে, যা আমাদের জন্য একটি বড় বোঝা। এই পরিস্থিতিতে একজন বাড়তি মানুষও গ্রহণ করার অবস্থায় নেই বাংলাদেশ; বরং আমাদের মূল লক্ষ্য প্রত্যাবাসন। সেই উদ্দেশ্যে আমরা কাজ করছি।’  সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে করা চুক্তির আলোকে দেশটিতে যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে না। যদিও প্রত্যাবাসন ইস্যুতে এই অভ্যুত্থানকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে দেশটি।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ও জরুরি অবস্থা জারির পর সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দেখতে চায় বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা যেহেতু চলমান ছিল, আমরা আশা করছি ধীরে হলেও তার অগ্রগতি হবে। এর জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।’

 সাবেক এই কূটনীতিক আরও বলেন, সেনা অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার বিচার আরও জোরদার হতে পারে। অভিযোগ ছিল দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। এত দিন তারা দেশটির সরকারের পেছনে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু এখন সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা নেওয়ার পর, মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত আর সামরিক বাহিনীর মধ্যে তৃতীয় কেউ থাকল না।’

হুমায়ুন কবির বলেন, তবে মামলার ব্যাপারে চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সেনাবাহিনী সু চির সরকারের ওপর খুশি ছিল না। সেই দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে এই অভ্যুত্থান। সু চি গ্রেপ্তার অবস্থাতেই থাকবেন। সেই অবস্থাতেই তাকে থাকতে হবে। এখন এক বছর থাকবে, দুই বছর থাকবে নাকি চার বছর থাকবে, সেটাই দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, মিয়ানমারে এই পরিবর্তন অত্যন্ত খারাপ। আমরা চাই না কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীরি হাতে থাকুক। মিয়ানমারে ৬০ বছর ধরেই এগুলো চলে আসছে এবং বেশির ভাগ সময়ই তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে। সর্বশেষ তাদের নিয়ন্ত্রণেই আধা বেসামরিক সরকার ছিল। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু বলার নেই। আমাদের তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এ জন্য মিয়ানমারের সরকার পরিবর্তনে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না বলেই আমরা আশা করি।

এদিকে এ ঘটনায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে; বিশেষ করে কিছু রোহিঙ্গা নেতা বলছেন, মিয়ানমারে একের পর এক পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ফের অন্ধকারে ধাবিত হচ্ছে।

কক্সবাজারের উখিয়ার থাইংখালী ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা ছৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী একের পর এক ইস্যু তৈরি করছে। নানা মিথ্যা অভিযোগ তুলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পর তারা নানাভাবে অভ্যন্তরীণ সমস্যা তৈরি করছে। সর্বশেষ অং সান সু চি, প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মূলত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ফের অন্ধকারে চলে গেছে। এতে আমরা খুব হতাশ।’

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের কোনারপাড়া জিরো পয়েন্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও অং সান সু চি একই সুতায় গাঁথা। এতে আমাদের খুশি বা দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। তবে সবচেয়ে খারাপ লাগছে যখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা সামনে আসে, তখন মিয়ানমার সরকার কোনো না কোনো ইস্যু তৈরি করছে।’

মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের ঘটনায় নতুন করে রোহিঙ্গা আসার সম্ভাবনা দেখছেন না টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের জুবাইদা বেগম। তিনি বলেন, ‘সকালে মিয়ানমারে অবস্থানরত আমার এক স্বজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। সে আমাকে সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে জানিয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে কিছু সেনাবাহিনীর গাড়ি টহল দিতে দেখা গেছে। তারা নিরাপদে ও ভালো আছে।’

প্রায় একই কথা বলেছেন আরও বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা। অনেকে এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

এদিকে, মিয়ানমারের সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে কোনো ধরনের প্রভাব পড়েনি বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতিতে মন্তব্য করার মতো কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো সৃষ্টি হয়নি। তবে সীমান্তে বিজিবির সদস্যরা আগে থেকে সতর্ক ছিল, এখনো আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত