যেভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন জহির রায়হান

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:৩৯ পিএম

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে আর কখনোই ফিরে আসেননি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে খ্যাতনামা পরিচালক এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ঔপন্যাসিক জহির রায়হান। তার এবং সেদিন মিরপুরে নিখোঁজ হওয়া অনেক বাঙালি সেনা আর পুলিশ সদস্যের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি কখনো।

১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজার এলাকার নূরী মসজিদের পেছনে নির্মাণকাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করার সময় পাওয়া যায় সিমেন্টের স্ল্যাব দিয়ে ঢাকা একটি কুয়ার মুখ। সেই কুয়ার ভেতরে এবং আশপাশের মাটি থেকে পাওয়া যায় পাঁচটি মাথার খুলি, আর মানুষের দেহের কয়েক শত হাড়। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি কি জহির রায়হান এবং অন্যদের হত্যা করার পর তাদের লাশ এই কুয়াতেই লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? ১৯৯৯ সালে জহির রায়হানের অন্তর্ধান নিয়ে সংবাদপত্রে লেখালেখি হলেও অনেকেই এখনো স্পষ্টভাবে জানেন না বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দেড় মাস পর কী ঘটেছিল মিরপুরে।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের তিন দিন আগে আল-বদর সদস্যরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারকে। ১৬ ডিসেম্বরের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে বড় ভাইকে না পেয়ে অত্যন্ত ভেঙে পড়েছিলেন জহির রায়হান। ঢাকার বিভিন্ন বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবী এবং অন্যদের যে মৃতদেহ বিজয়ের কয়েকদিন পর পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে শহীদুল্লা কায়সারের মৃতদেহ ছিল না। জহির রায়হানের মনে তাই আশা টিকে ছিল যে হয়তো তার বড় ভাই জীবিত আছেন। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের যারা অপহরণ আর হত্যা করেছে তাদের খুঁজে বের করার জন্য জহির রায়হান তখন ঢাকায় একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। সেই সময় কলকাতার সাংবাদিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনায় জহির রায়হান বলেছিলেন, ‘যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকা-ের জন্য দায়ী তারা সাময়িকভাবে গা ঢাকা দিয়েছে বটে, কিন্তু তারা বাইরে কোথাও যায়নি। এই দেশেই আছে। আবার তারা ঐক্যবদ্ধ হতে চেষ্টা করছে। আপনি ভাববেন না, সাম্প্রদায়িক শক্তি চিরদিনের মতো খতম হয়ে গিয়েছে।’ জহির রায়হান সংগ্রহ করেছিলেন বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গোপন লিফলেট, বিভিন্ন দলিল, নাম-ঠিকানা। এদের সম্পর্কে জহির রায়হান বলেছিলেন, ‘তাদের কিছুতেই নিষ্কৃতি দেওয়া হবে না। আই শ্যাল ফাইট আনটু দ্য লাস্ট।’

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায় একটি ফোন আসে। জহির রায়হানের মেজ বোন জানিয়েছিলেন এই ফোনটি করেছিলেন রফিক নামে জহির রায়হানের পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তি যিনি চাকরি করতেন ইউএসআইএস-এ। তিনি জানিয়েছিলেন যে শহীদুল্লা কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে, এবং জহির রায়হান সেখানে গেলে তাকে উদ্ধার করতে পারবেন। কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল বিহারি-অধ্যুষিত মিরপুরে অনেক বুদ্ধিজীবীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। জহির রায়হান তিন দিন আগেও মিরপুর যেতে চেয়েছিলেন। আর, ৩০ জানুয়ারি সকালে এই টেলিফোন আসার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি উতলা হয়ে মিরপুর ছুটে যান। জানা যায়, জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই রফিক আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন। সেই সময় তাকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে প্লেন থেকে নামিয়ে আনা হলেও তিনি পরে দেশত্যাগ করতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাসরত বিহারিদের প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে ছিল। ঢাকার মোহাম্মদপুর আর মিরপুরে বসবাস করত বহুসংখ্যক বিহারি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই মিরপুরে পাকিস্তানপন্থি বিহারিরা নির্যাতন এবং হত্যা করেছে বাঙালিদের। মুক্তিযুদ্ধের পর মিরপুরের নানা স্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে বধ্যভূমি। গোটা মিরপুরজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মানুষের মাথার খুলিসহ মানবদেহের বিভিন্ন অংশ। পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পালিয়ে এসে মিরপুরে আশ্রয় নিয়েছিল অনেক পাকিস্তানপন্থি বিহারি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রায় ২০ হাজার বিহারি নিয়ে তৈরি করেছিল সিভিল আর্মড ফোর্সেস (সিএএফ)। পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করলেও সশস্ত্র এই বিহারিরা ঠিকই তাদের অস্ত্র নিয়ে আশ্রয় নেয় মিরপুরে। অস্ত্রধারী এই বিহারিদের কারণে মুক্তিবাহিনীর তরুণরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর মিরপুরে যেতে পারছিল না। মিরপুরে নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব সেই সময় পালন করছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। কিন্তু মিরপুরের অস্ত্রধারী বিহারিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্ট সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে থাকলেও ১৬ ডিসেম্বরের পর ঢাকার বিহারি-অধ্যুষিত এলাকা মিরপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১০ বিহার রেজিমেন্টকে। এই রেজিমেন্টের সৈনিকদের মতো মিরপুরের পাকিস্তানপন্থি বিহারিদের আদিবাড়িও ছিল ভারতের বিহার রাজ্যে। ফলে, ১০ বিহার রেজিমেন্টের সেনা সদস্যদের আর মিরপুরের বিহারিদের ভাষা আর সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ এক। ধারণা করা যেতে পারে, এই ভাষাগত আর সাংস্কৃতিক নৈকট্যের কারণেই ভারতীয় বাহিনীর এই রেজিমেন্ট মিরপুরের পাকিস্তানপন্থি বিহারিদের প্রতি কঠোর হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার সাত দিন পর মিরপুর এলাকার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন ফকির শফিউদ্দিন। তিনি মিরপুর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিহার রেজিমেন্ট সরানোর জন্য আবেদন করেছিলেন কারণ এই রেজিমেন্টের সেনারা মিরপুরের বিহারিদের স্বগোত্রীয় হওয়ায় এই রেজিমেন্ট সেখানে মোতায়েন থাকা অবস্থায় বাঙালিরা মিরপুরে ফিরে আসার সাহস পাচ্ছিল না। তখন এমনও শোনা গিয়েছিল যে, মিরপুরে বিহারিদের সঙ্গে বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনাও লুকিয়ে আছে।

১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী মিরপুরে নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়, এবং মিরপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব আসে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ৩০ জানুয়ারি বাঙালি পুলিশ সদস্যরা মিরপুরের বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশি করে অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করবে আর বাঙালি সেনা সদস্যরা পুলিশকে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি তৎকালীন ক্যাপ্টেন গোলাম হেলাল মোরশেদ খানের নেতৃত্বে মিরপুরে পাঠানো হয়। ক্যাপ্টেন মোরশেদকে ১০ বিহার রেজিমেন্টের একজন মেজর তখন বলেছিলেন, মিরপুরে সবকিছু ঠিক আছে। তিনি বলেননি যে মিরপুরে বিহারিদের কাছে অনেক অস্ত্র আছে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো অস্ত্র উদ্ধার করেনি। দ্বিতীয় বেঙ্গলের তৎকালীন হাবিলদার ওয়াজেদ আলী মিয়াকেও ১০ বিহার রেজিমেন্টের একজন সুবেদার জানিয়েছিলেন, মিরপুরে কোনো সমস্যা নেই। জানা যায়, মিরপুর থেকে চলে আসার আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছিল যে মিরপুরে কোনো অস্ত্র নেই।

এমন ধারণা নিয়েই ৩০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সকালে পুলিশের তৎকালীন অ্যাডিশনাল এসপি জিয়াউল হক খান লোদীর নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা আর ক্যাপ্টেন মোরশেদের নেতৃত্বে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা মিরপুরে প্রবেশ করেছিলেন। সেদিন সকালেই জহির রায়হান তার বড় ভাইকে উদ্ধারের উদ্দেশ্য নিয়ে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে গিয়েছিলেন মিরপুরে। দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তারা কেবল জহির রায়হানকে সেনা আর পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে যাওয়ার অনুমতি দেন। যখন বাঙালি সেনা আর পুলিশ সদস্যরা মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের পানির ট্যাংক সংলগ্ন এলাকায় যান, জানা যায় জহির রায়হান তখন তাদের সঙ্গে ছিলেন। পুলিশের তৎকালীন ইন্সপেক্টর নবী চৌধুরী জহির রায়হানকে চিনতেন। তিনি দেখেছিলেন, অ্যাডিশনাল এসপি লোদী যখন জিপে করে ১২ নম্বর সেকশনের দিকে যাচ্ছেন তখন তার সঙ্গে জিপে জহির রায়হানও ছিলেন। সেই এলাকায় দায়িত্বরত দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন ল্যান্স নায়েক আমির হোসেনও সেদিন সকালে ১২ নম্বর সেকশনের পানির ট্যাংকের পাশে পুলিশের অফিসারদের সঙ্গে একজন বেসামরিক ব্যক্তিকে কথা বলতে দেখেছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল সেই ব্যক্তি একজন সাংবাদিক যিনি সেনা আর পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সেখানে এসেছেন।

বিহারিদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই এমন তথ্য পাওয়ার কারণে বাঙালি পুলিশ আর সেনা সদস্যরা তাদের ওপর  হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কা সেদিন করেননি। কিন্তু হঠাৎই সকাল ১১টার দিকে চারদিকে ঢং ঢং করে ঘণ্টা পেটানোর মতো আওয়াজ শোনা যায়। সঙ্গে সঙ্গেই মিরপুর ১১ আর ১২ নম্বর সেকশনের সব বাড়ি থেকে হেভি মেশিনগান, লাইট মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র দিয়ে খোলা জায়গায় ঢিলেঢালাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বাঙালি পুলিশ আর সেনা সদস্যদের ওপর ঝঁাঁকে ঝাঁকে গুলিবর্ষণ করা হতে থাকে। আক্রান্ত হলে নিরাপদ স্থান খুঁজে নিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ করার যে নিয়ম তা পালন করার কোনো সুযোগ সেদিন খোলা জায়গায় অসতর্কভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বাঙালি সৈনিকরা পাননি। কিছু বোঝার আগেই ভারী অস্ত্রের গুলির আঘাতে অনেক পুলিশ আর সেনা সদস্য মাটিতে পড়ে যান। এক বাড়ির ছাদ থেকে করা গুলি ক্যাপ্টেন মোরশেদের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লেফটেন্যান্ট সেলিম কামরুল হাসানের বুকে আঘাত করে। ল্যান্স নায়েক আমির হোসেন সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, তাদের সঙ্গে থাকা সেই সাংবাদিকও গুলিবিদ্ধ হয়ে পানির ট্যাংকের দেয়ালের পাশে পড়ে গিয়েছেন। তার পোশাকের বড় অংশ রক্তে ভিজে গিয়েছিল। সেই সময় একশো জনের মতো বিহারি ধারালো অস্ত্র নিয়ে উর্দুতে গালিগালাজ করতে করতে ছুটে এসে মাটিতে পড়ে থাকা বাঙালি পুলিশ আর সেনা সদস্যদের কোপাতে থাকে। এরপর বাঙালিদের দেহগুলো বিহারিরা টেনেহিঁচড়ে বিভিন্ন দিকে নিয়ে যায়।

সেদিন মিরপুরে থাকা দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৭৫ জন সেনাসদস্যের মধ্যে ৪২ জন প্রাণ হারান যারা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মারা গিয়েছিলেন পুলিশের অনেক সদস্য। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুটো ব্যাটালিয়ন মিরপুরে ঢুকে পুরো এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও বেশির ভাগ নিখোঁজ সেনা আর পুলিশ সদস্যদের সন্ধান পায়নি। তিন দিন পর এক ঝিলের ধারে পাওয়া মানবদেহের একটি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযোদ্ধা অফিসার লেফটেন্যান্ট সেলিমের মৃতদেহ বলে শনাক্ত করা হয়। কিন্তু জহির রায়হান এবং অ্যাডিশনাল এসপি জিয়াউল হক খান লোদীসহ আরও অনেক সেনা আর পুলিশ সদস্যের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা যায়, সেদিন প্রাণ হারানো বাঙালিদের লাশ বিহারিরা মিরপুরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন কুয়া, গর্ত, ডোবা, বিলের মধ্যে লুকিয়ে ফেলেছিল।

মিরপুরে অবাঙালিদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই ভারতীয় সেনাবাহিনী সেই এলাকা ছেড়ে আসার আগে এমন কথা বললেও ৩১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মিরপুরে অভিযান চালিয়ে চার ট্রাক ভর্তি অস্ত্র উদ্ধার করেছিল যার মধ্যে হেভি মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্রও ছিল। পুরো মিরপুর অস্ত্রমুক্ত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চারটি ব্যাটালিয়নের দেড় মাস সময় লেগেছিল। অথচ ৩০ জানুয়ারি মাত্র ৭৫ জন সেনা সদস্য পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মিরপুরে গিয়েছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্য সঠিক কি না তা আরও সময় নিয়ে যাচাই করে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে মিরপুরে প্রবেশ করলে ভয়ংকর সেই বিপর্যয় এবং যে অপূরণীয় ক্ষতি সেদিন হয়েছিল তা এড়ানো সম্ভব হতো।

প্রশ্ন তৈরি হয়, ৩০ জানুয়ারি সকালে যে বা যারা জহির রায়হানকে টেলিফোন করে সশস্ত্র বিহারি-অধ্যুষিত মিরপুরে যেতে বলেছিল তারা কি জানত যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী সেদিন সঠিক তথ্য না পেয়েই মিরপুরে প্রবেশ করবে এবং অসতর্ক সেনা আর পুলিশ সদস্যদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাদের হত্যা করা হবে? কোনো চক্র কি সেদিন এই বরেণ্য চলচ্চিত্রকারকে হত্যা করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করেছিল? জহির রায়হানের পুত্র অনল রায়হান ‘পিতার অস্থির সন্ধানে’ নামে একটি লেখায় লিখেছেন : ‘১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রেস ক্লাবে জহির রায়হান এক প্রেস কনফারেন্সে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের পেছনের নীলনকশা উদঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অনেক গোপন ঘটনার নথিপত্র তার কাছে আছে, যা তিনি প্রকাশ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নেওয়া অনেক মন্ত্রীর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়েও তিনি ডকুমেন্টস সংগ্রহ করেছেন বলে কনফারেন্সে বলেছিলেন। এই হুমকিই তার জীবনের জন্য পাল্টা হুমকি হয়েছিল কি না, আজ কে বলবে?’

জহির রায়হানের হত্যাকা- সম্পর্কে যথাযথ অনুসন্ধান কখনোই করা হয়নি বলে কারা তাকে সেই দিন বিপদসংকুল মিরপুরে যেতে বলেছিল তা রহস্যাবৃতই রয়ে গিয়েছে। কোনোদিন এই রহস্যের সমাধান হবে কি না তা আমাদের জানা নেই।

লেখক অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত