বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ‘বিতর্কমুক্ত’ কমিটিতে ফের বিতর্কিত ব্যক্তিরাই স্থান পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কমিটিতে সদ্য স্থান পাওয়াদের মধ্যে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, মামলার আসামি, মাদক কারবারি, অছাত্র ও গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত বয়সের বেশি ব্যক্তিরা রয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে। নতুন পদ পাওয়া ৮ জনের বিরুদ্ধে সংগঠনবিরোধী এসব অভিযোগ উঠেছে। তবে সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটিতে সদ্য স্থান পাওয়া সহ-সভাপতি দেবাশীষ সিদ্ধার্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার হয়েছিলেন। একই অভিযোগে তাকে ছাত্রলীগ থেকেও আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুনাহার হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জিয়াসমিন শান্তা সহ-সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর ও হলের সামনের দোকান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। শান্তা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের ‘ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু টাওয়ার এলাকায় রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী দাসকে মারধর করেন শান্তা। ওই ঘটনায় জিয়াসমিন শান্তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ফাল্গুনী দাস। বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের ফরিদা পারভীনকে সহ-সভাপতি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মারধর ও হলের দোকান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে কয়েকটি পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশ হয়েছিল।
কমিটিতে সদ্য সহ-সভাপতির পদ পাওয়া সুব্রত হালদার বাপ্পির বিরুদ্ধে ডাকাতি-ছিনতাইয়ের সংঘবদ্ধ একটি চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থানার একটি ছিনতাই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এমন তথ্য পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিআইবি)। যা গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদকের পদ পেয়েছেন ইন্দ্রনীল দেব শর্মা রনি। বর্তমানে তার বয়স ৩৪ বছর। কিন্তু ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ৫-এর ক উপধারায় বলা হয়েছে, অনূর্ধ্ব ২৮ বছর বয়সী বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃক স্বীকৃত যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র বা ছাত্রী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রাথমিক সদস্য পদ পেতে পারেন। ইন্দ্রনীল দেব শর্মা রনির এসএসসির মার্কশিটে জন্মতারিখ দেওয়া রয়েছে ২২ জুন ১৯৮৭ সাল। সে হিসেবে তার বয়স ৩৩ বছর ৭ মাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ছাত্রলীগ নেতা আল আমীন রহমান। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাসদ ছাত্রলীগের গবেষণা ও প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তাকে দেওয়া হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক সম্পাদকের পদ। এছাড়াও ঢাবির অধীন সাত কলেজ আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে ছাত্রী উত্ত্যক্ত ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মহসীন হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানীর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগ আছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও হলে চাঁদাবাজি করার অভিযোগ রয়েছে।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শোভন-রাব্বানী কমিটি দেওয়ার পর আমরা আন্দোলন করেছিলাম বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার জন্য। কিন্তু শূন্যপদ পূরণ করে যে কমিটি দেওয়া হলো সেখানে আবার বিতর্কিতদের আনা হলো। এটা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র পরিপন্থী।’
বিতর্কিতদের বিষয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যতগুলো অভিযোগ এসেছে এগুলো সঠিক নয়। যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সেগুলো মীমাংসা করা হবে। যার বিরুদ্ধে বেশি বয়সের অভিযোগ তিনি আমাদের রানিং কমিটির নেতা ছিলেন। তাকে নতুন করে বাইরে থেকে আনা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি চক্র আছে যারা এসব মিথ্যা অভিযোগ করে বেড়াচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য কমিটিকে বিতর্কিত করা। আমরা সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এই কমিটি করেছি।’
২০১৯ সালের ১১ মে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ৩০১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করেন। একই বছর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে শোভন-রাব্বানীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তখন জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ১ নম্বর সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ভারপ্রাপ্ত হন। তারা ২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর বিভিন্ন অভিযোগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে ৩২ জনকে অব্যাহতি দেন। এর দীর্ঘদিন পর গত রবিবার শূন্যপদে ৬৮ জনকে পদায়ন করা হয়েছে।
