প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার মান

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:০৯ পিএম

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৫ শতাংশ শিশু বাংলাই পড়তে পারে না। ইংরেজি এবং গণিতের অবস্থা আরও শোচনীয়। বিশ্বব্যাংকের জরিপের ফল সম্পর্কে মন্তব্য না করেও বলা যায় বিষয়টি উদ্বেগের। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ ও স্পষ্টভাবে বাংলা না পড়তে পারা দেখার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার নিজেরও হয়েছে; আবার বিপরীত চিত্রও রয়েছে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর মানসিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো, কোনো একটি ঘটনা বা তথ্য গুছিয়ে ব্যাখ্যা করার দক্ষতা অর্জন, অনুসন্ধিৎসু মনোভাব কিংবা জানার আগ্রহ তৈরি করা এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা। পরিতাপের বিষয় হলো, প্রাথমিকের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই কোনো কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না। সে বইয়ের ভাষায় মুখস্থ বলতে পারে কিন্তু নিজের ভাষায় বলতে পারে না। পাঠ্যবইয়ে বর্ণিত বিষয়কে ব্যাখ্যার জন্য উদাহরণ হিসেবে অন্য কোনো জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়ের অবতারণা না করার ফলে শিশুর চিন্তা-ভাবনার পরিসর সীমিত থেকে যায়।

প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের কথা বাদ দিয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ডিগ্রিধারীদের কথা বলা যেতে পারে। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রশ্ন ছিল একজন আদর্শ ম্যানেজারের বৈশিষ্ট্য কী? ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান আপনি কীভাবে শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগাবেন? দুঃখজনক হলেও সত্য যে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি উত্তর পাওয়া যায়নি বেশিরভাগের কাছ থেকেই। ‘একটি আদর্শ উদ্ভিদের কয়টি অংশ থাকে’ প্রশ্নটি উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে স্নাতকোত্তর প্রার্থীর জন্য অপমানজনক হওয়ার কথা। আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনি ‘পারি না’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তেমনি অর্থনীতি বিষয়ের স্নাতকোত্তর যদি ‘ঘাটতি বাজেট কী’ তা না জানেন তাহলে কোথাও সমস্যা রয়েছে বলে ধরে নিতেই হবে। পরীক্ষা পাসের জন্য নির্ধারিত গুটিকয়েক প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা কিংবা চাকরি বাজারের চাহিদার সঙ্গে কারিকুলামের যোগসূত্র না থাকার বিষয়টি এখানে প্রণিধানযোগ্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিযুক্ত এইসব শিক্ষকের কাছ থেকে কতটুকু ভালো শিক্ষাদান আশা করা যায়? এর সঙ্গে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা যোগ হলে প্রত্যাশার পারদ আরও নিম্নমুখী হয়ে যায়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য পর পর দুই বছর মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা ছিল আমার এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। প্রথম বছরের তুলনায় দ্বিতীয় বছরে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির অনেক বিষয়ে (যেমন বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, ইংরেজি, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, হিসাব বিজ্ঞান, ভূগোল, কৃষি-অর্থনীতি, ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং) অধ্যয়ন করা চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা ছিল উল্লেখ করার মতো। নেত্রকোনা জেলায় ২০১৯ সালে ৩২,১৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ৭৩৩ জন উত্তীর্ণ হলেও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ৬৭০ জন। এই ৬৭০ জনের মধ্যে ৩৩ শতাংশ স্নাতকোত্তর, ৪১ শতাংশ সম্মানসহ স্নাতক, মাত্র ৭ শতাংশ স্নাতক (পাস কোর্স) এবং ১৯ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক কিংবা সমমান। আরও একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এদের মধ্যে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রায় ৫৪ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজ থেকে পাস করা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এইসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী চাকরি প্রবণতার (মৌখিক পরীক্ষার সময় উদ্ঘাটিত) কারণগুলো হলো প্রথমত: একটি বড় অংশের চাকরির বয়স শেষ হওয়া, দ্বিতীয়ত: দারিদ্র্য কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন, তৃতীয়ত: বর্তমান পে-স্কেল, চতুর্থ: প্রচলিত সামাজিক ধারণায় ছোট চাকরি হলেও শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা,  পঞ্চম: তুলনামূলকভাবে পরিশ্রম কম এবং পরিবারে অধিকতর সময় বিনিয়োগের সুযোগ। এ ছাড়া, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই চাকরিযোগ মৌলিক চাহিদা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করে এবং উন্নয়ন ও উৎকর্ষের সুযোগ সৃষ্টি করেএমন প্রত্যাশাও রয়েছে। বাংলাদেশের বিকাশমান প্রাইভেট সেক্টর থাকলেও অদ্যাবধি পাবলিক সেক্টরই সবচেয়ে বড় ‘উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদ’ ক্রেতা। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত নিয়োগ বিষয়টিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেধাবী এই তরুণদের ধরে রাখা আবশ্যক। কিন্তু কীভাবে? এ ক্ষেত্রে ১৯৫৯ সালে প্রদত্ত হার্জবার্গ মহাশয়ের দু’শর্ত নীতি খুবই প্রাসঙ্গিক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির ক্ষেত্রে অসন্তুষ্টিসমূহ (dissatisfiers)  দূর করতে হবে। অর্থাৎ সরকারি নীতি, কর্মপরিবেশ, তত্ত্বাবধান, সহকর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক, বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ইত্যাদি সহায়ক হতে হবে। স্বীকৃত যে, সকল সরকারি চাকরির মতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও চাকরির নিরাপত্তা রয়েছে, বেতন স্কেল আগের তুলনায় যথেষ্ট ভালো। কর্মস্থলের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতকরণে রয়েছে নানাবিধ উদ্যোগ। এগুলোর মধ্যে শিক্ষাঙ্গনের পরিচ্ছন্নতা, ভবনের উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষের ডিজিটাইজেশন ও সজ্জিতকরণ এবং শিক্ষা-উপকরণের ব্যবহার অন্যতম। সরকারি এই নীতি ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন স্ব-প্রেষণা ও উদ্যমী তরুণ শিক্ষক এবং শিক্ষকতার প্রতি ভালোবাসা। তবে, অল্প শিক্ষিত বনাম উচ্চ শিক্ষিত এবং সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত বনাম জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের আত্মীকরণকৃত শিক্ষক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়নের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। বিগত অভিজ্ঞতায় আত্মীকরণকৃত শিক্ষকদের মধ্যে স্ব-প্রেষণার খুবই অভাব পরিলক্ষিত হয়। মেধাবীরা যেখানে তাদের দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিদ্যালয়ের এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করতে চায়; সেখানে অন্যরা তাদের এই ঘাটতিগুলো পূরণ করতে চায় অনৈতিক প্রভাব, রাজনৈতিক সংশ্রব ও অবস্থানগত সুবিধার মাধ্যমে। বিপরীতমুখী দুই শ্রেণির মধ্যে এই সংঘাত ‘বৈপরীত্য দ্বন্দ্বের’ (antagonistic contradiction)  প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

উক্ত প্রেক্ষাপটে নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা বন্ধ করে বরংবিদ্যমান স্কুলের শ্রেণিকক্ষ এবং সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প। এর সঙ্গে কিছু প্রেষণা যোগ করা গেলে মেধাবী তরুণদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিতে অধিকতর হারে আকৃষ্ট করা ও ধরে রাখা যাবে। শিক্ষকদের মধ্যে ভালো কাজের/অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কৃত করার একটি প্রথা ইতিমধ্যে চালু রয়েছে। একইসঙ্গে ক্যারিয়ার প্লানিংয়ের মাধ্যমে উচ্চপদে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। আনুষঙ্গিক কিছু সুযোগ-সুবিধা ও প্রেষণার মাধ্যমে কর্ম-সন্তুষ্টি তৈরি করা গেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উৎপাদন (output)  হবে আরও মানসম্পন্ন। বিদ্যালয়ের আকর্ষণীয় পরিবেশ আকৃষ্ট করবে মেধাবীদের এবং বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আমাদের একটি কারিগরি উল্লম্ফন  (technological jump) প্রয়োজন। এ জন্য দরকার একটি বিজ্ঞানমনস্ক আগামী প্রজন্ম। অথচ মফঃস্বলের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীর খুবই আকাল এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের অনেক মহাবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। এই তরুণ শিক্ষকদের শুধুমাত্র শিক্ষা প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হলে তাদের প্রতিভার একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যাবে। শিক্ষকদের প্রতিভার অব্যবহৃত এই অংশকে প্রশিক্ষণের দ্বারা শানিত করে এবং কিছু সম্পদ জোগানের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলোকে একটি প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা যেতে পারে। ফলে খুদে শিক্ষার্থীরা পাবে জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা, হয়ে উঠবে অনুসন্ধিৎসু, আত্মবিশ্বাসী এবং বিজ্ঞানমনস্ক। সামগ্রিকভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ।

লেখক সরকারের কর্মকর্তা এবং প্রাবন্ধিক ও গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত