টিকার খুদে বার্তা পেতে দেরি, উৎকণ্ঠায় মানুষ

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০২:২৬ এএম

নিবন্ধন করেও টিকার খুদে বার্তা পেতে দেরি হচ্ছে। কেন্দ্র বিশেষে ৭-১০ দিনেও টিকার তারিখের খুদে বার্তা পৌঁছায়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ দিনও পার হয়ে গেছে। কবে নাগাদ এসব নিবন্ধিত মানুষ টিকার তারিখের খুদে বার্তা পাবেন, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ।

বিশেষ করে রাজধানীর পাঁচ-ছয়টি কেন্দ্রের খুদে বার্তা পেতে বেশি দেরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এ ছাড়া উত্তরার ইউটিলিটি-২ পপুলেশন সার্ভিসসহ এমন কিছু কেন্দ্র থেকে খুদেবার্তা পেতে দেরি হচ্ছে।

এ মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকার দেশে কভিড-১৯ টিকা বিনামূল্যে প্রয়োগ শুরুর পর নিবন্ধিত হলে খুদেবার্তা না পেলেও কেন্দ্রে গিয়ে টিকা দেওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু ভিড় বেড়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রে নিবন্ধন ও খুদেবার্তা পাওয়ার আগে টিকা দেওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে নিবন্ধন করেও টিকার খুদেবার্তা না পেয়ে অনেকে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন। আদৌ তারা টিকা পাবেন কি না, সে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেকে। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, যত আগে টিকা নিতে পারবেন, তত আগে তারা নিজেদের ও পরিবারকে সুরক্ষা করতে পারবেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা ও নিবন্ধনের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে সারা দেশে নিবন্ধন জটের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হিসাব থেকে দেখা গেছে, প্রতিদিনই টিকার সঙ্গে নিবন্ধনের ব্যবধান বাড়ছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে মোট নিবন্ধন হয়েছে ১৭ লাখ ৪০ হাজার। টিকা পেয়েছেন ৯ লাখ ৬ হাজার ৩৩ জন। সেদিন নিবন্ধন করেও টিকা পাননি ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৭ জন। পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি নিবন্ধিত ২০ লাখ ১৬ হাজার মানুষের মধ্যে টিকা পেয়েছেন ১১ লাখ ৩২ হাজার ৭১১ জন। এদিন টিকার চেয়ে নিবন্ধনের সংখ্যা বেশি ছিল আগের দিনের চেয়ে ৪৬ হাজার ৩২২টি। এর পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি মোট নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল ২২ লাখ ৬২ হাজার ৭৯৩টি ও টিকা পেয়েছেন ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৩ জন। এদিন নিবন্ধিত ৯ লাখ ৩১ হাজার ৮০ জন টিকার বাইরে ছিলেন। সর্বশেষ গতকাল মোট নিবন্ধন হয়েছে ২৫ লাখ ৪৯ হাজার, কিন্তু টিকা নিয়েছেন মোট ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৬৮ জন। এদিন টিকার সঙ্গে নিবন্ধনের ব্যবধান আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৯ লাখ ৬২ হাজার ৬৩২ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও টিকাদান কেন্দ্র হাসপাতালের কর্মকর্তারা নিবন্ধন করেও টিকার খুদেবার্তা না পাওয়ার কারণ হিসেবে কোনো কোনো হাসপাতালে নিবন্ধনের অতিরিক্ত চাপের কথা বলছেন। তাদের মতে, এসব কেন্দ্রে দৈনিক টিকা দেওয়ার সক্ষমতার তুলনায় নিবন্ধন বেশি হচ্ছে। ফলে সক্ষমতা অনুযায়ী টিকা দিতে গিয়ে অনেক নিবন্ধিত মানুষ পিছিয়ে পড়ছে।

এসব কর্মকর্তা অবশ্য সবাই টিকা পাবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। তারা বলেছেন, একটু ধৈর্য ধরতে হবে। আগে-পরে সবাই টিকা পাবেন।

এসব কর্মকর্তা নিবন্ধনের ব্যাপারে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যেসব হাসপাতালে চাপ বেশি, সেখানে নিবন্ধন না করে যেখানে চাপ কম, সেখানে নিবন্ধন করলে আগে টিকা পাবেন। সব কেন্দ্রে একইভাবে ও সমান দক্ষতার সঙ্গে টিকা দেওয়া হচ্ছে।

টিকা নিতে নিবন্ধন করেও খুদেবার্তা না পেয়ে যারা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন, তাদের আশ্বস্ত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল বুধবার ঢাকা ডেন্টাল কলেজে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি টিকাদান কেন্দ্রের দৈনিক টিকাদানের একটি সক্ষমতা ঠিক করা আছে। কিন্তু প্রতিদিন নিবন্ধন হচ্ছে এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে অনেকের মোবাইলে টিকা দেওয়ার দিন তারিখ জানিয়ে এসএমএস যেতে দেরি হচ্ছে। করোনাভাইরাসের টিকা নিতে নিবন্ধন করেছেন, এমন সবাই মোবাইলে এসএমএস পাবেন।

এসময় মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা যখন শুরু করলাম, তখন নিবন্ধনের সংখ্যা কম ছিল। যারা টিকা নিতে আসতেন, এমন মানুষের সংখ্যাও কম ছিল। এখন নিবন্ধন অনেক হয়ে গেছে। যেখানে প্রতিদিন ১ হাজার জনকে টিকা দেওয়ার ক্ষমতা আছে, সেখানে প্রতিদিন ৩ হাজার জনের নিবন্ধন হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দেরি হবে। এ কারণে সময় নিয়ে তারিখ দিচ্ছে। যারা এসএমএস পাননি এখনো, তারাও এসএমএস পেয়ে যাবেন।

উৎকণ্ঠা বাড়ছে : রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রিনা ইসলাম টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন গত ১১ ফেব্রুয়ারি। তারা কেন্দ্র পছন্দ করেছেন উত্তরার পপুলেশন সার্ভিস-২। কিন্তু গতকাল সাত দিনেও তাদের মোবাইলে খুদেবার্তা আসেনি। সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিদিন অফিস করতে হয়। উদ্বেগে থাকি। টিকা নিতে পারলে সুরক্ষা পেতাম। একইভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও করোনার সম্মুখসারির গণমাধ্যমকর্মী সৈয়দ আহমেদ অটল নিবন্ধন করেছেন ৮ ফেব্রুয়ারি। তিনি বয়স্ক সাধারণ নাগরিকের তালিকায় নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত তার কাছে কোনো খুদেবার্তা আসেনি। বাধ্য হয়ে তিনি গতকাল তার নির্ধারিত কেন্দ্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ অনুরোধ করে টিকা নিয়েছেন। অপর সম্মুখসারির গণমাধ্যমকর্মী ৪০ বছর ঊর্ধ্ব শাহাদাত পারভেজ নিবন্ধন করেছেন গত ৯ ফেব্রুয়ারি। তার কেন্দ্র শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তিনি খুদেবার্তা পাননি।

খুদেবার্তা না পাওয়ার কারণ কী : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, যেসব কেন্দ্রে নিবন্ধন বেশি হয়েছে, সেখানকার লোকজন এসএমএস পাচ্ছে না। তারা পেছনে পড়েছে। তবে পেয়ে যাবে। এ জন্য আটকে আছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক ও মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসএমএস না পাওয়ার বিষয়টা সেন্টারের ওপর নির্ভর করে। যেমনবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ১৫-২৫ হাজার করে নিবন্ধন। এসব কেন্দ্রে যে-ই নিবন্ধন করুক, তিনি কিন্তু ৮-১০ দিনের মধ্যে টিকার তারিখ পাবেন না। প্রতিদিন ১৫শ থেকে দুই হাজারের বেশি টিকা দিতে পারে না। আবার যারা চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতাল বা আজিমপুর মেটার্নিটিতে নিবন্ধন করে, সেখানে সিরিয়াল কম। নিবন্ধন করার ১-২ দিনের মধ্যেই এসএমএস পেয়ে যায়। নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট হাসপাতালেও ১-২ দিনের মধ্যেই টিকার তারিখ পেয়ে যাচ্ছে। ওখানে অত চাপ নেই। এই কারণে সিরিয়ালের জায়গায় তারিখটা আগে পরে হয়ে যাচ্ছে। যারা কেন্দ্রের চাপ বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্র পছন্দ করেছে, তারা এসএমএস পেয়ে যাচ্ছে। আর যারা চাপ বেশি এমন কেন্দ্রে করেছে, তাদের এসএমএস আটকে গেছে।

সমাধান কীজানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, টিকা সবাই পাবে। পর্যায়ক্রমে পাবে। তবে কিছুটা দেরি হবে। কারণ নিবন্ধন জমে গেছে।

চাপের কারণে খুদেবার্তা পেতে দেরি হচ্ছে : এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. জুলফিকার আহমেদ আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত নিবন্ধন পেয়েছি ৩৫ হাজার। সুতরাং কেউ যদি আশা করে আমরা নিবন্ধনকারীকে আগামীকাল বা পরশু টিকার তারিখ দিয়ে দেব, সেটা সম্ভব নয়। ৫-১০টা হাসপাতাল মিলে দেবে ৩৫ হাজার। আর আমরা একাই দেব ৩৫ হাজার। আগামীকাল দেখব নিবন্ধন ৪০ হাজার হয়ে গেছে। সুতরাং আমরা চাহিদা অনুযায়ী টিকা দিতে সময় লাগছে। জনগণকে ধৈর্য ধরতে হবে। সবাই এসএমএস পাবে এবং এসএমএস প্রাপ্তিসাপেক্ষে সবাই যেন টিকা নিতে আসে।

সমাধান কীজানতে চাইলে এই পরিচালক বলেন, বিএসএমএমইউ যে কারণে সবাইকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে, অন্য কেন্দ্রগুলোকেও সেই চেষ্টা করতে হবে। আরেকটা জিনিস মনে হয় যে, এসএমএসের জন্য যে অপেক্ষা করতে হবে, সেটাও প্রচার করার দরকার আছে। অনেকে ভাবছে এসএমএস আসবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে। এই অনিশ্চয়তার কারণেও অনেকের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। জনগণকে বলতে হবে ধৈর্য হারাবেন না। কোনো কোনো সেন্টারের ওপর চাপ বেশি পড়ছে। আপনারা ধীরে ধীরে এসএমএস পাবেন এবং এসএমএস প্রাপ্তিসাপেক্ষে কেন্দ্রে আসেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত