আমি যখন প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি তার তুলনায় পৃথিবী অনেক বদলে গেছে এখন। আমরা এ বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি জানি। মোটের ওপর এক ধরনের সর্বসম্মতিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমস্যাটি নিয়ে। তবে এখনো অনেকে এটা মানতে পারছেন না যে, শুধু কার্বন নিঃসরণই যথেষ্ট নয়, শূন্য নিঃসরণের পথে যেতে হবে। শূন্য মাত্রায় পৌঁছাতে যে পরিমাণ উদ্ভাবন প্রয়োজন, লোকজনকে সেটা মানানো অবশ্য কঠিন। এর মানে হচ্ছে জ্বালানি শিল্প খাতের খোলনলচে পাল্টে দেওয়া, যা কি না বিশ্বের বৃহত্তম ব্যবসা। যে ঘটনাগুলো আমাকে এসব মানতে উৎসাহিত করেছে নিজের নতুন বইটিতে (How to Avoid a Climate Disaster : The Solutions We Have and the Breakthroughs We Need.) সেগুলোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছি। আশা করি এগুলো আবার অন্যদের মানাতে সহায়তা করবে। জলবায়ু আন্দোলন নিয়ে কাজ করে যাওয়া আন্দোলনকর্মীদের আমি শূন্য নিঃসরণের পক্ষে দাবি অব্যাহত রাখতে বলব। তারা যেন এমনভাবে নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যে কাজ করেন যাতে আমরা সঠিক পথে থাকি।
বইটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সংশয়বাদীদের লক্ষ্য করে লেখা হয়নি। তবে আমি অবশ্যই আশা করি এটি তাদের এটা মানতে সহায়তা করবে যে বিশুদ্ধ জ্বালানির জন্য আমাদের বড় ধরনের বিনিয়োগ লাগবে। যে দেশগুলো এ খাতে উদ্ভাবনের জন্য সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করবে সেগুলোয়ই গড়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের নতুন নতুন কোম্পানি। সেই সঙ্গে সেখানেই যাবে সব চাকরি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এ কারণেই এ খাতে বিনিয়োগ হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মানুষ জলবায়ুতে যে পরিমাণ পরিবর্তন আনছে তা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে বিপর্যয়কর পরিণতি হবে এই কঠিন সত্যি কথা না মানলেও, এটি করতে দোষ নেই।
কভিড-১৯ অতিমারী শুধু বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করার ক্ষতির বিষয়ই সামনে নিয়ে আসেনি, এটিও প্রমাণ করেছে যে, দ্রুত বড় ধরনের আচরণগত পরিবর্তনও সম্ভব। করোনা আরও দেখিয়েছে যে, সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নেওয়া নেতারা সম্মানিত হন। এটি আরেকটি জরুরি শিক্ষা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে করোনাকালে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণে তুলনামূলক কম যে হ্রাসটি ঘটেছে (১০ শতাংশ) তা এটিই বলছে যে, বিমানে চড়া বা গাড়ি চালানোর মতো আচরণগত পরিবর্তন যথেষ্ট পরিমাণে ঘটেনি।
কম গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরেকটি শিক্ষা হচ্ছে বিমানে চড়া বা গাড়ি চালানো কমানোই যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রয়োজন বিপুল মাত্রায় উদ্ভাবন যাতে কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই মানুষ বিমানে চড়া বা গাড়ি চালানোসহ বিভিন্নভাবে আজকের যুগের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। এটা আসলে কভিডের প্রতিষেধক তৈরি ও বিতরণের চেয়েও কঠিন কাজ। আর কভিডের প্রতিষেধক তৈরি ও বিতরণ হচ্ছে এ যাবৎকালের বৃহত্তম জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি। তবে এজন্য সরকারগুলোর মধ্যে সব স্তরে এবং পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সঙ্গে একই ধরনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া আমাদের সবাইকে যেমন মুখোশ পরে এবং দূরত্ব বজায় রেখে করোনার ক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, তেমনি প্রতিটি ব্যক্তিকে নিঃসরণ হ্রাসেও ভূমিকা রাখতে হবে। তারা নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে নীতি প্রণয়নের তাগিদ দিতে পারে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ভেজিটেবল বার্গারের মতো কম এবং শূন্য-কার্বন পণ্য কিনে গ্রিন প্রিমিয়াম হ্রাস করতে হতে পারে। এতে এসব ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রতিযোগিতা হবে এবং শেষ পর্যন্ত তা সবুজ পথে হাঁটার খরচও কমাবে।
আমি নিজের চোখে দেখেছি কীভাবে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বিশ্বকে বদলে দিতে পারে। মার্কিন সরকার এবং কোম্পানিগুলোর আয়োজনে পরিচালিত গবেষণা মাইক্রোপ্রসেসর এবং ইন্টারনেটকে বাস্তব রূপ দিয়েছিল। বিষয়টি অসাধারণ মাত্রায় উদ্যোক্তা শক্তির সূচনা ঘটিয়েছিল, যা ব্যক্তিগত কম্পিউটার শিল্পের ভিত গড়ে দেয়। তেমনি, মানব জিন নকশা তৈরির প্রকল্পে মার্কিন সরকারের উদ্যোগ ক্যানসার এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে।
শূন্য নিঃসরণ পর্যায়ে ওঠার কথা যদি বলেন, আমি নিজেই এ নিয়ে বিস্ময়কর সব কাজ দেখছি। কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে আমার তৈরি করা বেসরকারি তহবিল ‘ব্রেকথ্রু এনার্জি ভেঞ্চারস’ কম এবং শূন্য-কার্বন পদ্ধতিতে উৎপাদনের কৌশল বের করতে দুই ডজনেরও বেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। এসব গবেষণার লক্ষ্য সিমেন্ট এবং ইস্পাত তৈরি, প্রচুর পরিমাণে পরিবেশ অনুকূল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চয়, কৃষি ও পশুপালন, বিশ্বজুড়ে মানুষ ও পণ্য পরিবহন এবং আমাদের ভবনগুলোকে প্রয়োজনমতো গরম এবং শীতল করার মতো অনেক কাজ করা। এ ধারণার অনেকগুলোই হয়তো বাস্তবে রূপ নেবে না। তবে যেটুকু হবে তা-ই বিশ্বকে বদলে দিতে পারে।
আপনারা লক্ষ করে থাকবেন, উদ্ভাবন কেবল নতুন ডিভাইস তৈরির ব্যাপার নয়। এটি নতুন নীতিমালা তৈরিরও বিষয় যাতে আমরা যত দ্রুত সম্ভব এই উদ্ভাবনগুলো প্রদর্শন করতে ও বাজারে নিয়ে আসতে পারি। ...ইউরোপীয় ইউনিয়ন (এবং এখন চীনও) এ ধরনের নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।
‘গ্রিন প্রিমিয়াম’কে বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ একটি ত্রুটিযুক্ত জলবায়ু পরিবর্তন প্রণোদনা কাঠামো সংশোধন করার প্রয়াসে অনেক ইউরোপীয় দেশ কার্বন নিঃসরণ, সম্পদের অপচয় এবং দূষণের ওপর করের ব্যবস্থা চালু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের নীতিগুলো কি প্রণোদনা কাঠামোকে অর্থবহ উপায়ে পরিবর্তন করছে? ‘কার্বন সীমানা-সমন্বয়’ প্রক্রিয়াটি কি এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে? আমি বলব, সার্বিক নীতির অংশ হিসেবে কার্বন নিঃসরণের ওপর করা বা এ ধরনের ‘শাস্তি’ আরোপ করা একটি কার্যকর নীতি হবে। এর লক্ষ্য হবে পরিবেশ অনুকূল জ্বালানি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সরবরাহ ও চাহিদা উভয়টি বৃদ্ধি করা। আমি নতুন বইটিতে বিভিন্ন ধরনের আইডিয়া উল্লেখ করেছি। যেমন : সরকারগুলো উদ্ভাবনী উদ্যোগের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য পরিবেশ অনুকূল জ্বালানিবিষয়ক গবেষণায় অর্থায়ন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে পারে। আমি পাঁচ গুণ বৃদ্ধির পক্ষে বলেছি। আর চাহিদার দিকে থাকবে কার্বনের ওপর দাম ধরা ছাড়াও কী পরিমাণ বিদ্যুৎ বা অন্য জ্বালানি অবশ্যই শূন্য কার্বন উৎস থেকে আসতে হবে তার শর্তের মতো কিছু মাপকাঠি। তাই আমাদের প্রযুক্তির পাশাপাশি নীতির ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগ দরকার। অতীতেও আমরা বড় সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি ও নীতির মেলবন্ধন দেখেছি। বইটায় আমি উল্লেখ করেছি বায়ুদূষণ একটা দারুণ উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ বাতাস থেকে বিষাক্ত গ্যাস দূর করায় চমৎকার অবদান রেখেছিল।
আমাদের এখন দরকার সারা বিশ্বের নীতি ও প্রযুক্তিবিষয়ক মেধাকে নিঃসরণ বন্ধের কাজে লাগানো। আমার ‘ব্রেকথ্রু এনার্জি’ টিম বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক লক্ষ্যগুলো পূরণ করার লক্ষ্যে শক্তিশালী নীতিমালা তৈরি ও এর পক্ষে প্রচার চালাতে জোরদার কাজ করছে।
নীতিবিষয়ক সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগ চাই। আমরা বিশ্বের সম্পূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থাকে নজিরবিহীন গতিতে পরিবর্তন করার কথা বলছি। উদ্ভাবনকে মূল্য দেওয়ার মাধ্যমে বাজারে পরিবেশ অনুকূল প্রযুক্তিকে প্রতিযোগিতায় টেকার সুযোগ করে না দেওয়া পর্যন্ত শুধু বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ দিয়ে সাফল্য আসবে না। আর বাজারে সেই পরিবেশ গড়তে সরকারের সহায়তা দরকার।
পরিবেশ অনুকূল জ্বালানি উদ্ভাবনের সঠিক উপায় উদ্ভাবন, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি এবং জ্বালানির রূপ পরিবর্তনের জন্য নীতিনির্ধারকদের সৃজনশীলভাবে ভাবতে হবে। আমার ‘ব্রেকথ্রু এনার্জি’ দল শূন্য নিঃসরণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে কাজ করছে।
লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা, সমাজসেবী
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ‘খালিজ টাইমস’ পত্রিকায়
প্রকাশিত সাক্ষাৎকার থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
