কাশেম গুন্ডার নেতৃত্বে হামলা হাতুড়িপেটা-কোপে জখম ৩

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৩:৫০ এএম

ঝিনাইদহের মহেশপুরে নিরীহ এক পরিবারের তিন সদস্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করেছে সন্ত্রাসীরা। গত বৃহস্পতিবার রাতে কাজীর বেড় গ্রামে কাশেম গুণ্ডা নামে পরিচিত স্থানীয় আবুল কাশেমের নির্দেশে তার লোকজন ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওই হামলা চালায়। আর এজন্য এলাকার দুই শিশুর মধ্যে ঝগড়ার সুযোগ নেয় কাশেম ‘গুণ্ডা’। তার বাহিনীর লোকজন রাতের আঁধারে ওঁৎ পেতে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিরীহ ওই পরিবারটির তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে কোপায়।

কাশেম বাহিনীর হামলায় আহতরা হলেন, কাজীর বেড় গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাইয়ের ছেলে হুমায়ন কবির ওরফে রানা (৩৮), তার চাচা মতিয়ার রহমান (৬০) ও চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম (২৭)। এদের মধ্যে রানার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি দু’জন মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।

হামলার ঘটনায় ‘সন্ত্রাসী’ আবুল কাশেমকে প্রধান করে ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে মহেশপুর থানায় মামলা হয়েছে। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো, প্রধান আসামি আবুল কাশেমের ছেলে হৃদয় (২৩) ও গ্রামের প্রয়াত ইদার বক্সের ছেলে ইকরামুল ইসলাম (৫৩)। ঘটনার পর কাশেমসহ বাকি আসামিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে বলে জানিয়েছে গ্রামবাসী।

কাজীর বেড় গ্রামের একাধিক বাসিন্দা এবং হামলার শিকার পরিবারটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাশেম বাহিনীর হামলায় আহত হুমায়ন কবির রানার ছেলে রোহানের (৮) সঙ্গে প্রতিবেশী খোরশেদ আলমের ছেলে তামিম (৭) গত বৃহস্পতিবার বাড়ির পাশে খেলা করছিল। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া ও হাতাহাতি হয়। এ খবর জানতে পেরে রানা ঘটনাস্থলে গিয়ে তামিমকে বাড়ি যেতে বলে রোহানকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফেরেন। দুই শিশুর ঝগড়া সেখানেই শেষ হলেও এর সুযোগ নেয় কাশেম ‘গুণ্ডা’। তিনি সামান্য ওই ঘটনাকে পুঁজি করে রানা ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার ছক কষেন। এরই অংশ হিসেবে রানা পাশর্^বর্তী জিন্নানগর বাজার থেকে নিজ গ্রাম কাজীর বেড় ফেরার পথে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরপর ইটের সলিং নামক স্থানে পৌঁছলে সেখানে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা কাশেম বাহিনীর সদস্যরা তার ওপর হামলে পড়ে। তারা রানাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর পাশাপাশি হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে থাকে। এ খবর তার বাড়িতে পৌঁছলে চাচা মতিয়ার রহমান ও চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে যাওয়ামাত্র তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। এ সময় মতিয়ার রহমানের বাম হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দিলে তিনি গুরুতর জখম হন। আর সাইফুলের পেটে কোপ লাগে। এতে তিনিও গুরুতর আহত হন।

আহত রানার বড় ভাই মামুন সুলতান টিংকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুদের গোলমালের ঘটনা ছোট্ট হলেও সন্ত্রাসীরা সেটাকে বড় করে এই হামলা চালিয়েছে। আমাদের গ্রামের বাসিন্দা সন্ত্রাসী আবুল কাশেমের নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার ঘটনায় আবুল কাশেমকে প্রধান আসামি করে মহেশপুর থানায় একটি মামলা করেছি। আমার পরিবারের সদস্যদের ওপর নৃশংস এই হামলার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

আর শুধু এ ঘটনা নয়, এলাকায় বহুল সমালোচিত আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে মানব পাচার, গরু চোরাচালান, জমি দখল, মাদক কারবার ও সুদে টাকা খাটানোসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে কাজীর বেড় গ্রামবাসী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

গ্রামের বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাশেম এলাকায় জমি দখল ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এমনকি সে বিশ বছর আগে গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের জমিও দখল করে। পরে আমরা গ্রামবাসী মিলে অনেক চেষ্টা করে সেই জমি উদ্ধার করি। এছাড়া কাশেম একসময় গ্রামের আব্দুল আজিজের বসতবাড়িও জোর করে দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু গ্রামবাসীর বাধার মুখে তার সেই প্রচেষ্টা শেষমেশ সফল হয়নি।’

নাজিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘কাশেম মানব পাচারসহ (টাকার বিনিময়ে সীমান্তে ভারতীয় ও বাংলাদেশি নাগরিকদের অবৈধ পারাপার) আরও অনেক অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। সে তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া কেটে ভারত থেকে গরু নিয়ে আসার কারবার করে। সে চিহ্নিত সন্ত্রাসী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। অনেক অপকর্ম করলেও ভয়ে কেউ তার প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ প্রতিবাদ করতে গেলে কাশেম ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী সেই ব্যক্তির ওপর হামলে পড়ে।’

আবুল কাশেমের অপরাধমূলক কিছু কর্মকাণ্ডের তথ্য দেশ রূপান্তরকে দিয়েছেন মহেশপুরের সাত নম্বর কাজীর বেড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রানা ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আবুল কাশেম এর আগে নকল আজিজ বিড়ির ব্যবসা করে কিছু টাকার মালিক হন। সেই টাকার গরমে এলাকায় প্রভাব তৈরির চেষ্টায় লিপ্ত আছেন। সাধারণ মানুষ তার কাছে জিম্মি।’

আবুল কাশেম এলাকায় সুদে টাকা খাটানোর কারবার চালান জানিয়ে চেয়ারম্যান সেলিম রেজা আরও বলেন, ‘তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সুদে ব্যবসা (সুদে টাকা খাটানো) করে আসছেন। আর এই সুদে ব্যবসার টাকা উত্তোলনের জন্য তিনি মাসিক বেতনে বেশকিছু লোক নিয়োগ দেন। যাদের কাছ থেকে তিনি নিয়োগের আগে সিকিউরিটি মানি হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকেন। কিন্তু দুই তিন মাস কাজ করার পরে সেই লোকগুলোকে বাদ দিয়ে দেন। পরে বাদপড়া লোকগুলো তাদের সিকিউরিটির টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়।’

ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম রেজার মতো ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় অন্য অধিকাংশ নেতাও ‘সন্ত্রাসী’ আবুল কাশেমের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। তাদেরই একজন সাত নম্বর কাজীর বেড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুজ্জামান তরফদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবুল কাশেম নিজের স্বার্থের জন্য তার ভাই-ভাস্তে এবং তার সমমনোভাবাপন্ন লোকজন নিয়ে এলাকায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করে থাকে। আর এগুলো করার কারণ হচ্ছে, ওইসব ঝামেলা গ্যাঞ্জাম বাধিয়ে দিয়ে পরে তা মীমাংসার নামে টাকা কামানো। এছাড়া তিনি এলাকার কাউকে পরোয়া করতে চান না। আবুল কাশেমের কাজকর্মও ভালো না, তিনি আসলে নিজেও ভালো না।’

এদিকে আবুল কাশেম ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. শাফিকুল আজম খাঁন চঞ্চলের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে তার নাম ভাঙিয়ে এলাকায় কারও কোনো অপকর্ম করার সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন সাংসদ শাফিকুল আজম খাঁন চঞ্চল। তিনি গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেখানে (কাজীর বেড় গ্রাম) আমাদের দলেরই দু’পক্ষের মধ্যে ঘটনা ঘটেছে। আমি পুলিশকে এ ব্যাপারে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলে দিয়েছি। আর আমার নাম ভাঙানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ আমি কখনো কোনো অনৈতিক কাজকে প্রশ্রয় দিই না। যে কারণে যারা মেরেছে তারা আমার কাছে আসার সাহস পায়নি। তবে যারা মার খেয়েছে তাদের লোকজন এসেছিল। আমি তখনই ওসিকে ব্যবস্থা নিতে বলে দিয়েছি। পুলিশ ইতিমধ্যে হামলায় জড়িতদের দু’জনকে গ্রেপ্তারও করেছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাজীর বেড় গ্রামের ঘটনার পর আহত রানার ভাই বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। আমরা ইতিমধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

সুবিচার চেয়ে ফেইসবুকে আহত রানার ভাইয়ের পোস্ট : নিজের পরিবারের সদস্যদের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় সুবিচার কামনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে একটি হৃদয়স্পর্শী পোস্ট দিয়েছেন গুরুতর আহত রানার বড় ভাই মামুন সুলতান টিংকু। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘কাশেম ভ্যারাইটিজের কাশেম বাহিনীর কুখ্যাত গুণ্ডা কাশেম, তার ছেলে হৃদয়, আলম স্বপন, হজরত, আলিমন, নয়নসহ আরও অনেকের ধারালো ছুরি ও হাতুড়ির আঘাতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে আমার ছোট ভাই রানা। তাদের এই নির্মম নির্যাতনের জন্য সরকার ও প্রশাসনের নিকট বিচার চাই। তাদের কর্মকাণ্ডে এলাকার লোক অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। তাদের গুণ্ডা বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারে না। আমি প্রশাসনের কাছে এবং আপনার কাছে বিচার চাই।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত