মসলা গবেষণায় কৃষি অর্থনীতির সম্ভাবনার দুয়ার

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২১, ১১:২৬ পিএম
প্রশ্ন হলো দেশের এই মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা ফল আমরা কতটা কাজে লাগাচ্ছি। এসব গবেষণা মাঠে প্রয়োগে সরকার মনোযোগী হলে মসলা চাষে স্বনির্ভরতা অর্জন করে এমনকি মসলা রপ্তানি করাও সম্ভব। এটা করা গেলে জাতীয় কৃষি অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনবে, বাঁচবে আমাদের আমদানি খরচ। এজন্য দরকার শুধু পরিকল্পিত ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা

সত্যেন সেন রচিত ‘মসলার যুদ্ধ’ বইটি ১৯৬৯ সালে মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বলছেন ‘কালিকটের বন্দর নিমেষ মাত্র বিশ্রাম পায় না’। অর্থাৎ এই বন্দরে আরব বণিক, হিন্দু বণিক, গুজরাটের মুসলিম বণিক, চীনা বণিকদের পদচারণায় এতটাই মুখরিত থাকত যে, দিবারাত্রি সর্বক্ষণই কালিকট বন্দর কর্মব্যস্ত থাকত। সময়টা ছিল ১৪৮৮ সাল। প্রচুর ব্যস্ত এই বন্দর ছিল এই ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য আশীর্বাদ। আর এক সময় বিশ্ববাণিজ্যের তথা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যের প্রথম ও প্রধান পণ্য ছিল মসলা।

১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস মসলার খোঁজে বেরিয়ে আমেরিকা আবিষ্কার করেন। যুগে যুগে মসলা নিয়ে অনেক যুদ্ধের গল্প প্রচলিত আছে। প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল ভারতবর্ষে। পর্তুগিজদের সঙ্গে কালিকটের রাজার যুদ্ধ। এই মসলার খোঁজেই ভাস্কো দ্যা গামা একদিন জাহাজ নোঙর করেন ভারতের কেরালা উপকূলে। এক সময় ভারতবর্ষে আরব বণিকদের মসলার ব্যবসা ছিল একচেটিয়া। কিন্তু ভাস্কো দ্যা গামার কারণে আরব বণিকদের আধিপত্য কমতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেই ব্যবসা চলে আসে পর্তুগিজদের হাতে। প্রায় দেড়শ বছর পর্যন্ত মসলার বাণিজ্য তাদের হাতেই ছিল। ফলে তারা ইউরোপে একচেটিয়া মসলার ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

একচেটিয়া বাণিজ্যের কারণে পর্তুগিজরা মসলার দাম তখন এতই বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, ডাচ বা ওলন্দাজ বণিকদের মনে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠছিল। ফলে ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে তারা ভারতবর্ষে যাত্রা করে এবং ভারতবর্ষে মসলার ব্যবসার জন্য তারা ‘ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করে। পরে ১৬২৯ সালের দিকে এই কোম্পানি জাকার্তা অধিকার করে এবং মসলার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় মসলা উৎপাদন শুরু করে। মসলার খোঁজে প্রথমে পর্তুগিজ, তারপর ওলন্দাজ এবং সর্বশেষ ইংরেজরা ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশ করে। পর্তুগিজদের সরিয়ে ওলন্দাজরা মসলার উৎপাদন শুরু করার পর তারা মসলার দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ইংল্যান্ডেও সে সময় মসলার প্রচুর চাহিদা থাকায় ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা প্রাচ্যের মসলার বাজারে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য, সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রিটেনে লবঙ্গের দাম ছিল প্রায় সোনার দামের সমান। যার ফলে ইংরেজদের বিখ্যাত ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ তখন মসলার বাণিজ্যে নেমে পডে। কোম্পানির প্রথম জাহাজ এই উদ্দেশে প্রাচ্যের দিকে যাত্রা করে ১৬০১ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি। তারা ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সুরাটে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে অনুমতি আদায় করে নিয়ে প্রথম বাণিজ্য ঘাঁটি স্থাপন করে। ইংরেজরা ঠিক করেছিল ভারতবর্ষ থেকে বস্ত্রের ব্যবসা করবে এবং প্রাপ্ত মুনাফা দিয়ে মসলার ব্যবসা করবে।

‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে মসলার বাণিজ্য শুরু করলেও ওলন্দাজদের চাপে তারা সেখানে বেশিদিন টিকতে পারেনি। মাত্র ১৪ বছর পরেই ইন্দোনেশিয়া ছেড়ে তাদের বেরিয়ে আসতে হয়। তারপর তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সীমাবদ্ধ ছিল ভারতবর্ষের মধ্যেই। তাদের মসলার বাণিজ্য এখানেই শেষ হয়। এরপর ইংরেজরা ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল।

সত্যেন সেন বর্ণিত দুনিয়াব্যাপী মসলা যুদ্ধের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু মসলার চাহিদা কমেনি বরং বেড়েছে। প্রাচ্যের প্রাচীন সভ্যতা বাংলাতে মসলার ইতিহাসও অনেক পুরনো। বাঙালিরা যুগ যুগ ধরেই খাবারে স্বাদ আনয়নের জন্য রান্নায় মসলা ব্যবহার করে থাকে। খাবারে স্বাদ, মান, ঘ্রাণ, রং, সংরক্ষণ ক্ষমতা, ইত্যাদি বৃদ্ধি অথবা পরিবর্তনকারী যে কোনো উদ্ভিদ বা উদ্ভিদের অংশকে (ফুল, ফল, বীজ, কুঁড়ি, পাতা, বাকল, শেকড় ইত্যাদি) মসলা বলা হয়। এসব মসলার রয়েছে নানাবিধ ঔষধি গুণ যা বিভিন্ন রোগ নিরাময়েও সাহায্য করে। মসলা নিয়ে গবেষণা দেশের কৃষি গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিএআরআই (BARI)) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের বৃহত্তম ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের ফসল নিয়ে গবেষণা করা হয়। যেমন দানাশস্য, কন্দাল, ডাল, তৈলবীজ, সবজি, ফল, মসলা, ফুল ইত্যাদি উচ্চ ফলনশীল জাত। প্রতিষ্ঠানটি মৃত্তিকা এবং শস্য ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই এবং পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, পানি এবং সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, খামার পদ্ধতির উন্নয়ন, শস্য সংগ্রহ-উত্তর প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং আর্থসামাজিক সংশ্লিষ্ট উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন এবং পরিমাণ নির্ধারণ বিষয়ে গবেষণা করে থাকে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে ৭টি কেন্দ্রের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র মসলা গবেষণা কেন্দ্র। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত স্থায়ী প্রকৃতির একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই মসলা গবেষণা কেন্দ্র। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৮ কিমি উত্তরে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের পাশে শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নে এটা অবস্থিত। এই মসলা কেন্দ্রের মোট আয়তন ২৭ দশমিক ৬৯ হেক্টর। অত্র কেন্দ্রের ৭টি ডিসিপ্লিন উদ্ভিদ প্রজনন, কৃষিতত্ত্ব, কীটতত্ত্ব, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব, মৃত্তিকা ও পানি সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষি প্রকৌশল ও ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থাপনা। আর গবেষণা ফলাফল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অত্র কেন্দ্রের তিনটি আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে গাজীপুর, মাগুরা ও কুমিল্লায়। আর পাঁচটি উপকেন্দ্র রয়েছে লালমনিরহাট, ফরিদপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার ও খাগড়াছাড়িতে। বর্তমানে মসলা গবেষণা কেন্দ্রে প্রায় চুয়াল্লিশটি দেশি-বিদেশি মসলা ফসলের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ১১৩টি মসলা ফসল চাষ করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে মোট আবাদযোগ্য জমির মাত্র ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ (৪ দশমিক ২০ মিলিয়ন হেক্টর) জমিতে ৩০ ধরনের মসলা ফসল চাষ হয়। এভাবে বাংলাদেশে প্রায় ২৬ দশমিক ৭৩ লাখ টন মসলা উৎপাদিত হয়, যা পৃথিবীর মোট উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ। কিন্তু আমরা ৫০টিরও বেশি মসলা ব্যবহার করে থাকি এবং প্রতি বছর ১০ দশমিক ১৫ লাখ টন মসলা বিদেশ থেকে আমদানি করি। দেশের মাথাপিছু মসলা ব্যবহারের হার ৫৪ গ্রাম (বিবিএস, ২০২০)।

বাংলাদেশে মসলার আমদানি নির্ভরতা হ্রাস, মসলার উৎপাদন বৃদ্ধি, জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ তথা মসলা জাতীয় ফসলের গবেষণা জোরদারকরণের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতায় এই মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে। এই ইনস্টিটিউটে ৪৪টিরও বেশি মসলা ফসল ও ২০০-এর অধিক ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করে এখন পর্যন্ত ২২টি ফসলের ৪৭টি উচ্চ ফলনশীল ও রোগবালাই সহিষ্ণু এবং সারা দেশে চাষযোগ্য জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, সংরক্ষণ ও মান সংযোজক পণ্য (আচার, পাউডার) উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মারাত্মক জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ যথাক্রমে ১৭, ৭ দশমিক ১ এবং ০ দশমিক ৩৫ টন কার্বন বৈশি^ক পরিবেশে যোগ করে। কিন্তু পৃথিবীর মোট কার্বন নির্গমনের মাত্র ০ দশমিক ৩৫ শতাংশের জন্য বাংলাদেশ দায়ী (INDC, 2015) হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে এক নম্বর অবস্থানে রয়েছি আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঝুঁকির কারণে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুহারা হতে পারে (Baillat,2018)। কারণ আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে এবং ২০৮০ সালের মধ্যে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ২ ফিট বেড়ে যেতে পারে (The Guardian, 2015)। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে মসলা বিষয়ক গবেষণা ও মসলা উৎপাদনে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পথকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। মৃত্তিকা সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ছাড়া দেশের প্রায় ১০০ ভাগ মসলা ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। 

আমাদের দেশে দেখা যায় যে, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, ধনিয়া, হলুদ, কালোজিরা মসলার ব্যবহার বেশি। দেশে প্রতি বছর মসলার চাহিদা ৫৩ দশমিক ৯১ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে উৎপাদিত হচ্ছে ৩৫ দশমিক ৩২ লাখ মেট্রিক টন। ফলে প্রতি বছর মসলার ঘাটতি থেকে যায় ১৮ দশমিক ৫৯ লাখ মেট্রিক টন। উল্লেখ্য, দেশের ৪ দশমিক ২০ লাখ হেক্টর জমিতে এই মসলা চাষ করা হয়। তবুও আমদানি করতে হয়। ফলে রাষ্ট্রের আমদানি ব্যয় বাড়ে।

প্রশ্ন হলো দেশের এই মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা ফল আমরা কতটা কাজে লাগাচ্ছি। এসব গবেষণা মাঠে প্রয়োগে সরকার মনোযোগী হলে মসলা চাষে স্বনির্ভরতা অর্জন করে এমনকি মসলা রপ্তানি করাও সম্ভব। এটা করা গেলে জাতীয় কৃষি অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনবে, বাঁচবে আমাদের আমদানি খরচ। এজন্য দরকার শুধু পরিকল্পিত ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত