ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট ব্যবহার করে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁও ও রামপুরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও জোনাল টিম। গ্রেপ্তাররা হলেন মো. আল-আমিন ওরফে জমিল শরীফ (৩৪), খ ম হাসান ইমাম ওরফে বিদ্যুৎ (৪৭), মো. আবদুল্লাহ আল শহীদ (৪১), রেজাউল ইসলাম (৩৮) ও শাহ জাহান (৩৯)। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে একটি ব্যক্তিগত কার উদ্ধার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার পুরনো মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, চক্রের হোতা আল-আমিন ও বিদ্যুৎ। তাদের গ্রেপ্তার অন্যরা সহযোগিতা করতেন। এনআইডি প্রদানকারী কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন শাহ জাহান। তিনি এনআইডি কর্র্তৃপক্ষের নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সার্ভার ব্যবহার করেছেন। এ চক্রের প্রতারণার মূল অংশ হচ্ছে এনআইডি সার্ভার ‘ম্যানুপুলেট’ করা। গ্রাহকের এনআইডি সঠিক কি না যাচাই করতে তা অনেক সময় ক্রস চেক করে ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ। আর সেই সঠিকের জায়গাটিই বেঠিক হয়ে আছে। চক্রটি রাজধানীতে এক-দুই মাসের জন্য বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে অফিস বানিয়ে কখনো ক্রেতা আবার কখনো বিক্রেতা সেজে প্রতারণা করত। তারা ইতিমধ্যে ১১টি ব্যাংক ও লিজিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আরও কিছু প্রতারকচক্র একইভাবে প্রতারণা করে যাচ্ছে। এ চক্রের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) অফিসের নিম্নপর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মচারী। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি শাখা এ ধরনের কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ৪৪ জনকে চাকরিচ্যুত করেছে। এই প্রতারকদের হাত থেকে বাঁচতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রদানকারী শাখাকে আওর বেশি সতর্ক হওয়ার আহব্বান জানিয়ে ডিবি কর্মকর্তারা বলেছেন, ঋণ দেওয়ার আগে অবশ্যই ক্রস চেক করতে হবে। আর ব্যাংকের কেউ এসব প্রতারকচক্রের সঙ্গে জড়িত কি না সে বিষয়েও অনুসন্ধান করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গত বছর ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর খিলগাঁও থানায় এবং গত ১৩ ডিসেম্বর পল্টন থানায় আলাদা দুটি মামলা হয়। মামলা দুটি তদন্ত শুরু করে ডিবির মতিঝিল বিভাগ। পরে এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ওই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে বিপ্লব নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার বিপ্লব আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার দেওয়া তথ্যমতে খিলগাঁও ও রামপুরা এলাকা থেকে অন্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বুধবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার প্রতারকরা প্রথমে ব্যাংকে গিয়ে ফ্ল্যাট কেনার জন্য লোনের বিষয়ে ব্যাংকের লোকজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে। তখন ব্যাংক কর্মকর্তারা ফ্ল্যাট ভিজিট করার বিষয়ে জানান। প্রতারকরা ভিজিটের জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাট দেখায়। ফ্ল্যাট বিক্রির সাইনবোর্ড দেখে প্রতারকরা আগে থেকেই তা ঠিক করে রাখে। কৌশলে প্রতারক দল ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে তার এনআইডি কার্ড এবং ফ্ল্যাটের কাগজপত্রের ফটোকপি চায়। সরল বিশ্বাসে ফ্ল্যাট মালিক এনআইডি ও ফ্ল্যাটের কাগজপত্র দিয়ে দেন। পরে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ ফ্ল্যাট ভিজিটে গেলে তারা সবকিছু সঠিক দেখতে পান। এরপর প্রতারকরা নির্বাচন কমিশন অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীর মাধ্যমে ফ্ল্যাট মালিকের দেওয়া এনআইডির হুবহু নকল করে শুধু ছবি পরিবর্তন করে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে। এ ভুয়া এনআইডি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে বা সার্ভারে সার্চ দিলে ব্যাংক কর্মকর্তারা তা সঠিক দেখতে পান। একই সঙ্গে প্রতারকরা এক থেকে দুই মাসের জন্য একটি অফিস ভাড়া করে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওই অফিস ভিজিটের জন্য নিয়ে যায়। ব্যাংক কর্মকর্তারা ভিজিটে গিয়ে গোছানো অফিসে সবকিছু সঠিক আছে দেখতে পান। ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন করার দিন ব্যাংকের লোক উপস্থিত থাকেন। ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ এনআইডি সার্ভারে এনআইডি এবং তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট সঠিক পাওয়ায় ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন হওয়ার এক থেকে দুদিন পর পে-অর্ডারের মাধ্যমে গ্রেপ্তার হওয়া প্রতারকদের ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণের টাকা পরিশোধ করে দেয়। প্রতারকরা যখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে না তখন ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ তাদের দেওয়া এনআইডি কার্ডের তথ্য সার্ভারে অনুসন্ধান করলে তৈরি করা ভুয়া এনআইডি কার্ডের কোনো তথ্য দেখতে পান না। তখন ব্যাংক কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন যে তারা প্রতারিত হয়েছেন।
