বিচারিক আদালতে ধর্ষণ মামলার একটি রায়ে জন্ম সনদের বরাত দিয়ে বিচারক বলেছেন, ঘটনার সময় অভিযুক্তের বয়স ছিল ১১ বছর এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় তাকে শাস্তি দেওয়া যায় না। আবার একই বিচারক অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে ৯(১) ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন। যদিও এ ধারায় মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন, কারাদন্ড কিংবা অভিযোগ
প্রমাণিত না হলে খালাস এ তিনটি বিধান রয়েছে। গত মঙ্গলবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে বিষয়টি নজরে আসার পর ঝালকাঠির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক শেখ মো. তোফায়েল হাসানকে কারণ দর্শাতে (শোকজ) আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ঝালকাঠিতে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণের ওই মামলায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামি রনি শিকদারের জামিন শুনানিকালে এমন আদেশ দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। আদালতে রনির পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পি।
আইনজীবীরা জানান, বিচারিক আদালতের এমন ঘটনায় তারা হতবাক। তাদের মতে, আইনবহির্ভূতভাবে ওই বিচারক ত্রুটিযুক্ত এ রায় দিয়েছেন। রায়ে যেহেতু বলা হয়েছে, ঘটনার সময় অভিযুক্তের বয়স ছিল ১১ বছর তাই এ মামলার বিচার শিশু আদালতে হওয়াই ছিল যুক্তিযুক্ত। বিচারকের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর যে আদেশটি হয়েছে পূর্ণাঙ্গ আদেশ পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।
ঝালকাঠির নলছিটিতে ২০০৯ সালের ২৭ জুলাই ভুক্তভোগী শিশুর বাবার বসতবাড়িতে ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় থানায় মামলা হয়। এজাহারে রনির বয়স উল্লেখ করা হয় ১৯ বছর। যদিও জন্ম সনদ অনুযায়ী ঘটনার সময় তার বয়স ১১ বছর ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিচারিক আদালতের রায়ে। এ মামলায় জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক শেখ মো. তোফায়েল হাসান ২০২০ সালের ১০ মার্চ রায় দেন। রায়ে আসামি রনি শিকদারকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয় আদালত।
আদালতের রায়ে বলা হয়, ‘সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯(১) ধারায় যুক্তিসঙ্গত সাক্ষ্যের মাধ্যমে অভিযুক্ত রনি শিকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ঘটনার সময় স্বীকৃতমতেই অভিযুক্ত নাবালক ছিল। তদন্ত কর্মকর্তার জব্দকৃত সনদ মোতাবেক অভিযুক্তের জন্ম তারিখ ১৯৯৮ সালের ৮ ডিসেম্বর। সে মতে ঘটনার সময় অভিযুক্তের বয়স ছিল ১১ বছরের কাছাকাছি। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত শিশু বিবেচনায় আইনের সুবিধা লাভের অধিকারী এবং সে কারণে তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় বর্ণিত শাস্তি প্রদান করা যায় না। এমতাবস্থায় অত্র মামলার অভিযুক্তের বয়স, অপরাধের ধরন, ধর্ষণের সামাজিক প্রভাব এবং ঘটনার পারিপাশির্^কতা বিবেচনায় তাকে ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করাই যুক্তিসঙ্গত। অতএব অভিযুক্ত রনি শিকদারকে নারী ও শিশু আইনের ৯(১) ধারায় দোষী সাব্যস্তক্রমে ঘটনার সময় অভিযুক্ত শিশুগণ্যে ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং ৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হলো। তবে, রনি শিকদারের বর্তমান বয়স ২০ বছরের ঊর্ধ্বে হওয়ায় তাকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় বিচারিক আদালত। আদালত বলে, অভিযুক্ত সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে অবস্থান করবে। আইনজীবীর মাধ্যমে সাজা থেকে খালাস চেয়ে আপিল ও জামিনের আবেদন করা হলে গতকাল হাইকোর্ট রনি শিকদারের আপিলের আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করে তাকে জামিনের আদেশ দেয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পি দেশ রূপান্তরকে জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধানও রয়েছে। এ ধারায় বিচার করলে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড কিংবা অভিযোগ প্রমাণ না হলে আসামি খালাস পাবে। ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের কোনো বিধান নেই। তিনি বলেন, ‘বিচারক তার রায়ে একদিকে বলেছেন, ঘটনার সময় অভিযুক্তের বয়স ছিল ১১ বছর এবং নাবালক ছিল। আবার তিনিই তাকে ৯(১) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে সশ্রম কারাদন্ড দিলেন। হাইকোর্টের কাছে বিষয়টি অসংগতিপূর্ণ মনে হয়েছে। যদি ঘটনার সময় ওই বিচারক আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত কাজ করেছেন। যে কারণে ওই বিচারককে শোকজ করে তার বক্তব্য জানতে চেয়েছে আদালত। তবে, কোন তারিখে তার বক্তব্য চেয়েছে সেটি পূর্ণাঙ্গ আদেশ পেলে জানা যাবে।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝালকাঠির বিচারিক আদালতে যে রায়টি হয়েছে সেটি আইনবহির্ভূত রায়। যেখানে আদালত নিজেই বলেছেন যে ঘটনার সময় অভিযুক্তের বয়স ছিল ১১ বছর। সে হিসেবে এ মামলার বিচার শিশু আদালতে হওয়াই ছিল যুক্তিযুক্ত। আর যে ধারায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে সেখানে ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ডের কোনো বিধানও নেই। আমরা এসব যুক্তিতে জামিন চেয়েছিলাম। হাইকোর্ট জামিন মঞ্জুর করেছেন। যে আপিলটি করা হয়েছে তা শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। আমরা আশা করি একই যুক্তিতে আসামি খালাস পাবে।’
