প্রবাসে ‘বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২১, ০১:০৩ পিএম

আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা সংস্কৃতি তুলে ধরতে বিভিন্ন দেশে ‘বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা হোক। নিদেনপক্ষে দূতাবাসে সাংস্কৃতিক শাখা স্থাপন করার মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতি তুলে ধরার পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

এমন মতামত কানাডার শিক্ষক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞজনদের। কানাডার বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’-এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগরের সঞ্চালনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রচার হওয়া ‘শওগাত আলী সাগর লাইভ’-এ অংশ নিয়ে তারা এ সব কথা বলেন।

অভিবাসীদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় কানাডা সরকারের যে পৃষ্ঠপোষকতা  আছে, তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলা চর্চাকে গতিশীল করতে তারা আহ্বান জানান।

বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ‘প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এই আলোচনায় অংশ নেন কানাডার আলবার্টার ম্যাকুইয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এইচ এম আশরাফ আলী, সংগীত শিক্ষক ও শিল্পী রনি প্রেন্টিস রয় এবং টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের বাংলার শিক্ষক আরজুমান্দ জলিল।

আলবার্টার এডমন্টনে বাংলা শিক্ষার অন্যতম উদ্যোক্তা ও সংগঠক ড. এইচ এম আশরাফ আলী প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাংলা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, যে ছেলে-মেয়েরা একাধিক ভাষা এবং সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত, শিক্ষাজীবনে তারা অন্যদের চেয়ে ভালো ফলাফল করে। এটি আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি চর্চায় নিবিড় মনোযোগ প্রবাসে ছেলে-মেয়েদের মেধা বিকাশের জন্য বিশেষ সহায়ক।

ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি পৃষ্ঠপোষকতায় কানাডা সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে ড. আশরাফ বলেন, কানাডার প্রতিটি শহরেই বাংলাদেশিদের বাংলা স্কুল খোলা ও বাংলা সংস্কৃতি চর্চায় এগিয়ে আসা উচিত। এ জন্য কানাডা সরকারের নানা ধরনের তহবিল আছে। খরচের জোগান যখন কানাডা সরকার দিচ্ছে, তখন বাংলা চর্চায় আমরা পিছিয়ে থাকবো কেন? তবে সরকারের এই সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশিদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক রনি প্রেন্টিস রয় বলেন, চীন-ভারতসহ বিভিন্ন দেশ তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি বিকাশের জন্য দেশে দেশে পৃথক সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। কানাডায় চাইনিজ কালচারাল সেন্টার, ভারতীয় সংস্কৃতি কেন্দ্র আছে। বাংলাদেশ সরকারও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরনের সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। নিদেনপক্ষে হাইকমিশনগুলোয় সাংস্কৃতিক শাখা  হতে পারে যারা বিদেশে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর উদ্যোগ নেবে।

কানাডার একাধিক শহরে সংগীত শিক্ষা ও কমিউনিটি আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, কানাডায় এখন পর্যন্ত দিবসভিত্তিক সংস্কৃতি চর্চার মধ্যেই আমরা আটকে আছি। এর বাইরে বাংলা সংস্কৃতিকে মূলধারায় নিয়ে যাওয়ার তেমন কাজ হচ্ছে না। এই ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া দরকার।

আরও বলেন, কয়েকটি গান, কবিতা আবৃত্তি শেখার মাধ্যমেই বাংলা সংস্কৃতি চর্চা হয় না, নিজেদের মধ্যে সংস্কৃতিবোধ জাগ্রত না হলে এই দেশে বাংলা সংস্কৃতির জন্য আমরা তেমন কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবো না।

নতুন প্রজন্মকে বাংলা শেখানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে টিডিএসবির বাংলা শিক্ষক লায়লা আরজুমান্দ জলিল বলেন, অনেক বাচ্চাদের মধ্যেই বাংলা ভাষা শেখার যথেষ্ট আগ্রহ আছে। কিন্তু বাংলাদেশের বই দিয়ে তাদের শেখাতে গেলে তারা তেমন আগ্রহ পায় না। ফলে শিক্ষা উপকরণ একটা সমস্যা তৈরি করে।

আরও বলেন টিডিএসবির আওতায় বিভিন্ন স্কুলে বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সব ক্লাসে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।

আরজুমান্দ জলিল বলেন, স্কুল থেকে অভিভাবকদের স্পষ্ট করেই বলে দেওয়া হয়, তোমারা বাচ্চাদের ইংরেজি  শেখানোর চেষ্টা করো না, তোমরা বরং তোমার ভাষা, সংস্কৃতি শেখাও। ঘরে ঘরে অভিভাবকেরা বাচ্চাদের সঙ্গে পুরোপুরি বাংলায় কথা বললে বাচ্চারা সেগুলো সহজেই শিখে ফেলে।

নতুনদেশ-এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর বলেন, নাগরিকদের ট্যাক্সের অর্থে কানাডার ফেডারেল ও প্রভিন্সিয়াল সরকার অভিবাসীদের নিজ নিজ ভাষা সংস্কৃতি চর্চার জন্য তহবিল বরাদ্দ দেয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলা সংস্কৃতিকে মূলধারায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

আরও বলেন, টরন্টোর ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডে বাংলা ক্লাস থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না, মহাদেব চক্রবর্তী নামে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি নিজে অর্থায়ন করে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা কোর্স চালু করেছিলেন। কিন্তু সেটি টিকিয়ে রাখা যায়নি। টরন্টোয় এত বাংলাদেশি বসবাসের পর এই  ধরনের চিত্র কমিউনিটির জন্য লজ্জাজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত