এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে রেহমান সোবহান

সংখ্যার সঙ্গে বাস্তবজীবনেও উন্নতি হতে হবে

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২১, ০২:১৬ এএম

২০২৬ সালে সংখ্যার বিচারে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হবে। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাস্তবজীবনের সংগতিপূর্ণ উত্তরণ প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। গতকাল বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংলাপে তিনি একথা বলেন।

‘এলডিসি থেকে উত্তরণ : গতিশীল উত্তরণের কৌশল’ শীর্ষক এই সংলাপে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২৬ সালে মোট ১২টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হতে জাতিসংঘের সুপারিশ পেয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ শুল্ক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। কারণ ভিয়েতনাম, নেপাল, ভুটানের মতো দেশগুলোর একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) রয়েছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশকে তার রপ্তানির প্রায় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারাতে হতে পারে। বাংলাদেশকে তার বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখেও পড়তে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক চুক্তি করার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

সিপিডি উদাহরণ দিয়ে বলেছে, ভিয়েতনাম দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কারণে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় ইতিমধ্যে শুল্প মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি না হলে এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশকে এসব বাজারে শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করতে হবে। ২০২৬ সালের পর এই শুল্কের পরিমাণ অনেক গুণ বেড়ে যাবে। সিপিডি বলছে, রপ্তানির পাশাপাশি আমদানিতেও খরচ বৃদ্ধি পাবে।

সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যাতে প্রতিযোগিতাসক্ষম হতে পারে। ওষুধ খাতের চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা দরকার। তাই এখন থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে হবে।’ প্রস্তুতির অভাব তুলে ধরে একটি উদাহরণ দেন রেহমান সোবহান। তিনি আরও বলেন, ২০০৮ সালে ওষুধশিল্পের এপিআই পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এখনো তা শেষ হয়নি। অথচ এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে স্থানীয় বাজারেও ওষুধের দাম বাড়তে পারে।

অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৬ সালে সকালে উঠে যেন এমন মনে না হয়, অনেক কিছুই করা হয়নি। তাহলে বিপাকে পড়তে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি, ওষুধ খাতসহ বিভিন্ন খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। স্থানীয় বাজারে শুধু ইনুসলিনের দাম আট গুণ বাড়তে পারে।

একই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে বের হলে একদিকে চ্যালেঞ্জ আছে, অন্যদিকে সুযোগ বাড়বে। তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণকালের মধ্যে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পগুলো শেষ হয়ে যাবে, যা ব্যবসায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। তাই এলডিসি উত্তরণের ফলে যে ক্ষতি হবে, তা কাটানো সহজ হবে।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হকের মতে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এখনই কৌশল ঠিক করতে হবে। এলডিসি থেকে বের হলে অর্থায়নের কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তা তুলে ধরেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়। তিনি বলেন, জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ মিলবে না। এ ছাড়া অন্য বিদেশি ঋণ পাওয়ার খরচ বাড়বে। তিনি পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগের অর্থ আনাকে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সভাপতি মতিন চৌধুরী, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর টমো পৌতিয়ানেন প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জাতিসংঘের কমিটি ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের নাম সুপারিশ করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হয়ে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত