ফ্লাইট নেই অথচ ৪০০ যাত্রীর কাছে টিকিট বিক্রি!

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২১, ০২:১৮ এএম

কাতার থেকে এক মাস আগে ফিরতি পথের টিকিট (রিটার্ন টিকিট) কেটে দেশে ফেরেন কুমিল্লার মোহাম্মদ আলম। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ছিল তার ফেরার তারিখ। যথারীতি পাঁচ ঘণ্টা আগে তিনি নিজের মালামাল ও টিকিট নিয়ে হাজির হন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে গিয়ে কাতার এয়ারের চেক-ইন কোন কাউন্টারে করা হচ্ছে তা দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে জানতে চান প্রবাসী মোহাম্মদ আলম। কিন্তু তাকে সদুত্তর দিতে পারেননি কেউই। এ পরিস্থিতিতে গলদঘর্ম হয়ে এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে ছুটতে থাকেন তিনি। এক পর্যায়ে সব কাউন্টার ঘোরা হয়ে গেলেও আদৌ সেদিন বিকেলে কাতার এয়ারের কোনো ফ্লাইট আছে কি না তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউই। তখন হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে কনকর্স হলের চেয়ারে বসে পড়েন  মোহাম্মদ আলম। আর ঘটনাক্রমে তখনই চলছিল সামনের খোলা জায়গায় বিমানবন্দরে যাত্রীদের সমস্যার কথা জানতে আয়োজিত গণশুনানি। যেখানে আলমের মতো এমন আরও বেশকজন ভুক্তভোগী যাত্রী অংশ নেন। তারা সবাই জানান, কীভাবে এয়ারলাইনসগুলোর অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার শিকার হয়ে বিমানবন্দরে ভবঘুরের মতো ঘুরতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু আলম একা নন। তার মতোই আরও দুইশ যাত্রী কাতার এয়ারের ফ্লাইটের কনফার্ম টিকিট নিয়ে বিমানবন্দরে গিয়ে হয়রানির শিকার হন।

যাত্রীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবার কাতার এয়ারের কোনো ফ্লাইটই ছিল না। তবু তাদের টিকিট দেওয়া হয়েছে সেদিনের। কেন এমন তুঘলকি কাণ্ড? তাৎক্ষণিক যাত্রীদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা যায়, কাতার এয়ারের টিকিট বিক্রি করা হয়েছে দায়সারাভাবে। সঠিকভাবে প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে যাত্রীদের অনেকটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেই গছিয়ে দেওয়া হয় বৃহস্পতিবারের টিকিট। একইভাবে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন ইতিহাদ ও এয়ার এরাবিয়ার যাত্রীরাও। এই দুই এয়ারলাইনসেরও কমপক্ষে দুইশ যাত্রী বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারেনসেদিন তাদের ফ্লাইট নেই। ইতিহাদের ফ্লাইটের সময় পিছিয়েছে, এরাবিয়ারও একই অবস্থা।

ওই তিনটি এয়ারলাইনস কেন যাত্রীদের নিয়ে এতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য দেখানোর সাহস পেল তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান। গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএস তৌহিদুল ইসলাম এবং এয়ারলাইনস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দিলারা। তাদের যেসব ট্রাভেলস এজেন্সি ভুক্তভোগী যাত্রীদের কাছে এয়ারলাইনসগুলোর টিকিট বিক্রি করেছে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বেবিচক চেয়ারম্যান। আর যদি যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে সরাসরি এয়ারলাইনসগুলোর বিরুদ্ধেই আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

ওই তিনটি এয়ারলাইনসের দায়িত্বহীনতার শিকার হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জানা যায় প্রকৃত ঘটনা। তারা অভিযোগ করে বলেন, দোহা থেকে যখন ট্রাভেলস এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট কাটা হয় তখনই কনফার্ম করা ছিল ফেরার তারিখ। কিন্তু দেশে ফেরার পর তাদের কাছে আর কোনো বার্তা বা অন্য কোনো তথ্য আসেনি। এতে তারা নিশ্চিতই ছিলেন যে, কনফার্ম টিকিটের তারিখ ঠিকই আছে। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছে তারা গণশুনানিতে অংশ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, বৃহস্পতিবার বিকেলে কোনো ফ্লাইটই নেই। তাদের প্রশ্ন, যদি এয়ারলাইনস কর্র্তৃপক্ষ আগেই জানিয়ে দিত তাহলে এত দূর থেকে এত আগে বিমানবন্দরে এসে এভাবে দুর্ভোগের শিকার হতে হতো না।

এত যাত্রী দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হওয়ার পরও কেন কাতার ও ইতিহাদের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত হয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি তা জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপনারা দেখতে পাবেন এবার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কোনো ছাড় নয়। নিরীহ যাত্রীদের সঙ্গে এহেন আচরণ কিছুতেই সহ্য করা হবে না।’

বৃহস্পতিবারের গণশুনানিতে উপস্থিত বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএস তৌহিদুল ইসলাম ভুক্তভোগী যাত্রী ও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কাতার ও ইতিহাদ কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে আটকে পড়া যাত্রীদের পরবর্তী ফ্লাইটে (সেদিন রাত ও ভোরে) অবশ্যই গন্তব্যে পাঠানো হবে এবং বিমানবন্দরেই তাদের থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, ‘যাত্রীসেবার মান নিশ্চিতে এয়ারলাইনসগুলোর আন্তরিকতায় ঘাটতি রয়েছে। যাত্রীদের এমন হয়রানি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা রীতিমতো অন্যায়। কাতার এয়ারওয়েজের কাছে এ ব্যাপারে কৈফিয়ত চাওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্টের লাইসেনস বাতিলের সুপারিশ করা হবে।’

বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে খুব শিগগিরই ‘মে আই হেল্প ইউ’ নামে একটি ডেস্ক চালু করা হবে জানিয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘বিমানযাত্রীদেরও টিকিট করার সময় দেওয়া ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর ঠিকঠাকমতো দেওয়া হয়েছে কি না তা সচেতনভাবে দেখে নেওয়া এবং বিমানবন্দরে আসার আগে আরেকবার ফ্লাইট সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া উচিত।’ এছাড়া যাত্রীদের ভোগান্তি দূর করতে এয়ারলাইনসগুলোর কর্মীদের ফ্লাইট শুরুর নির্ধারিত সময় ৪ ঘণ্টার আরও আগে থেকেই সহায়তা সেবা দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাতার, ইতিহাদ ও এয়ার এরাবিয়ার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ এর আগেও একাধিকবার উঠেছে। বারবার একই অপরাধ করে তারা পার পেয়ে যাবে, এমনটির আর সুযোগ নেই। বিশেষ করে প্রবাসী কর্মজীবী শ্রমিকদের সঙ্গে বারবার এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য এবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোকে কারণ দর্শানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত