গত ৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে ‘গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ’ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশিষ্ট নয় ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ এই সম্মান দেওয়া হবে। তাদের মধ্যে সংস্কৃতি অঙ্গনের দুজন পাচ্ছেন স্বাধীনতা পদক। তারা হলেন নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান ও সংগীতকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার দেশের অন্যতম সেরা গীতিকার। স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম নিয়ে অনেক কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি। একাধারে তিনি চলচ্চিত্র লেখা, পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন। ২০০২ সালেই একুশে পদক লাভ করেছেন তিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে দেওয়া হয় বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল। পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি জানাতে গিয়ে গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘ভালোবেসে কাজ করেছি। সেই ভালোলাগার কাজটি মানুষকে আনন্দ দিয়েছে, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেছে। সেই কাজের জন্য দেশের সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়াটা সত্যিই আনন্দের। সরকার ও দেশের মানুষের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। নিজের চোখে আমার এই প্রাপ্তির আনন্দ দেখতে পাচ্ছি পরিবারের সবার মধ্যে। এটা সবচেয়ে ভালোলাগার অনুভূতি। আমি এখনও কাজ করি। মৃত্যুর আগে কিছু কাজ রেখে যেতে পারছি, যা এই প্রজন্ম হোক বা নতুন প্রজন্ম-কাউকে না কাউকে উদ্বুদ্ধ করবে। এটাইতো মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বড় স্বার্থকতা। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। যেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ থেকে কাজ করে যেতে পারি।’ দীর্ঘদিনের পথচলায় কোনো অপ্রাপ্তি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে জীবনের বিচার করি না। আমি আমার কর্মটা করে গেছি। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। দেশ আমাকে সম্মান দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। তবে এটা সত্য আমার আজকের অবস্থানের নেপথ্যে আমার স্ত্রী জোহরা গাজীর অবদান অপরিসীম। তার প্রতি আমি ঋণী।’
২০ হাজারের বেশি গান রচনা করেছেন মাজহারুল আনোয়ার। তার লেখা কালজয়ী গান ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদায়ক হিসেবে বিবিসি বাংলার তৈরি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় ১৩তম স্থান লাভ করে। আরও কালজয়ী কিছু গান শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে একবার যেতে দেনা, একতারা তুই দেশের কথা, আমায় যদি প্রশ্ন করে, সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে মাগো আর তোমাকে, এই মন তোমাকে দিলাম, শুধু গান গেয়ে পরিচয়, সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠে আছেন আমার মোক্তার, রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে তুমি আরেকবার আসিয়া, আঞ্জুমান আরার কণ্ঠে আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল।
আতাউর রহমান একাধারে অভিনেতা, মঞ্চ নির্দেশক এবং লেখক। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী মঞ্চনাটক আন্দোলনের অগ্রদূত। মঞ্চনাটকে তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০১ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে। তিনি স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করলেন এভাবে, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর আর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণে নিজের পরিণত বয়সে এই পুরস্কার পেয়েছি, এটা কয়েকগুণ আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি একাত্তরের ৭মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় রেসকোর্সেই উপস্থিত ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নানা স্মৃতি রয়েছে। যাই হোক, জীবদ্দশায় পুরস্কার পেয়েছি, আমার সারা জীবনের পরিশ্রম ও কাজকে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দিয়েছে, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে। কেননা, আমি মরণোত্তর পদকে বিশ্বাস করি না। এই পদক নোবেল জয়ের চেয়ে আমার কাছে বেশি মূল্যবান। নোয়াখালীর গ্রামে বড় হওয়া একটি ছেলেকে দেশের মানুষ ভালোবাসা দিয়েছে তাই এ পুরস্কার আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দেশকে খুব ভালোবেসেছি আজীবন। কাজের সুবাদে বিশ্বের নানা দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু কখনোই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার বাসনা জাগেনি মনে। আমার দৃষ্টিতে এ দেশ অনেক সুন্দর। এখানের মানুষের মধ্যে প্রেম আর সম্প্রীতির অভাব নেই। এখনো মানুষ খাবার ভাগ করে খায়। আমরা যে ঢাকা দেখে বড় হয়েছি তা হয়তো নেই, কিন্তু দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যেসব গ্রামে থাকে, সেই গ্রামগুলো আজও খুব সহজ সরল। সবচেয়ে ঘনবসতির দেশে অল্পসংখ্যক লোক খারাপ হলে ক্ষতি নেই। দেশের অগ্রগতিও চোখে পড়ার মতো। করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারী দমনে সরকারের প্রশংসা না করে পারি না। ইতিমধ্যে আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশের তকমা পেয়েছে। বিশ্বাস করি শিল্প-সংস্কৃতির জাগরণে দেশের ধমার্ন্ধতা, কুসংস্কার ও অপশক্তির পতন হবে।’
আতাউর রহমান এখনো অভিনয়, নির্দেশনা ও লেখালেখিতে সক্রিয়। এবারের বইমেলায় প্রকাশ হবে ‘আসব ফিরে চিরদিনের সেই আমি’ বইটি। এটি মূলত রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘জেলখানার রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বই তিনটির ওপরে একটি বইয়ের কাজ শেষের দিকে। সর্বশেষ মঞ্চে নির্দেশনা দিয়েছেন শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ নাটকটি। অভিনয় করছেন অপি করিমের সঙ্গে ‘ডিয়ার লায়ার’ নাটকটিতে। তার নির্দেশিত নাটকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় নাটক প্রসঙ্গে আতাউর রহমান বলেন, ‘ওয়েটিং ফর গডো, ঈর্ষা ও ট্রায়াল অব ক্রেসিডা নাটক তিনটি আমার খুব বেশি প্রিয়।’
